আন্তর্জাতিক

বিদ্বেষ রুখে ইতিহাস: যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সেনেটর হলেন আব্দুল আল-সায়েদ

রিপাবলিকানদের আরব ও মুসলিমবিদ্বেষী প্রচার কৌশল ব্যর্থ করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান থেকে সেনেটে এই ঐতিহাসিক জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আব্দুল আল-সায়েদ।

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান শিবিরের তীব্র বর্ণবাদী ও মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারের মুখে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান থেকে সেনেট নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আব্দুল আল-সায়েদ।

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সেনেটর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। আগামী ৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেবেন আল-সায়েদ।

মিশিগান রাজ্যে আল-সায়েদের এই জয়ের ফলে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের সুবিধা পেল ডেমোক্র্যাটরা।

তবে আল-সায়েদের সমর্থকদের কাছে এই জয় কেবল আইনসভার একটি আসন জয় করাই নয়, বরং তার চেয়েও বেশি কিছু।

আরব আমেরিকান ইনস্টিটিউটের (এএআই) নির্বাহী পরিচালক মায়া বেরি আল জাজিরা-কে বলেন, রিপাবলিকানরা আরব ও মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারকে এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রধান রাজনৈতিক কৌশল বানিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি বলেন, “ভোটারদের এই অন্ধ বিদ্বেষ প্রত্যাখ্যান আমাদের জন্য অত্যন্ত বড় ঘটনা। আব্দুল নামের প্রতিটি ছেলে, জয়নাব নামের প্রতিটি মেয়ে আর ববি নামের প্রতিটি শিশুর জন্যই এটি এক বিশাল বিষয়। কারণ, দিনশেষে আসল কথা হল, এই দেশ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রকে সমর্থন করে কি না।”

এর আগে গত অগাস্টে অনুষ্ঠিত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রাইমারি নির্বাচনে জয় পান আল-সায়েদ। ওই নির্বাচনে তাকে হারাতে ৩ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করেছিল ইসরায়েলপন্থি প্রভাবশালী লবি গ্রুপ ‘আইপ্যাক’ (এআইপিএসি)।

ইসরায়েলের নীতি ও গাজায় গণহত্যার প্রকাশ্য সমালোচক এল-সায়েদের বিরুদ্ধে এরপর ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা একের পর এক ভিত্তিহীন অপপ্রচার শুরু করে। তাকে এমনকি ‘জিহাদি’ ও ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলেও দাবি করা হয়।

তবে ধর্মীয় বিদ্বেষের মুখেও জনস্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা আল-সায়েদ সাধারণ মানুষের সংকট নিরসনের বিষয়গুলো নিয়েই প্রচারণা চালিয়ে গেছেন।

তার প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল সবার জন্য সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্যসেবা (মেডিকেয়ার ফর অল), নির্বাচনী রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব বন্ধ করা এবং জীবনযাত্রার চড়া ব্যয় কমানো।

তাছাড়া, বিদেশি যুদ্ধের পেছনে তহবিল খরচ না করে স্থানীয় বিষয়গুলোর সমাধানে সেই অর্থ ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।
তবে ভোটের ঠিক আগের দিনগুলোতে বড় ধাক্কা আসে ডেমোক্র্যাট শিবিরের ভেতর থেকেই।

প্রাইমারিতে হেরে যাওয়া কট্টর ইসরায়েলপন্থি ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেনস প্রকাশ্যে রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সকে সমর্থন দেন।

মিশিগানে বিপুলসংখ্যক আরব আমেরিকানের বাস থাকায় রিপাবলিকানরা কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব ভোটারদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে ডেমোক্র্যাটদের ভোট কমাতে চেয়েছিল।

ট্রাম্প প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন, যেসব কৃষ্ণাঙ্গ বা ইহুদি এল-সায়েদকে ভোট দেবে তারা ‘পাগল’। তবে নির্বাচনের প্রাথমিক ফলে দেখা গেছে, ডেট্রয়েটের কৃষ্ণাঙ্গ ভোটাররা বিপুলভাবে এল-সায়েদের পক্ষেই রায় দিয়েছেন।

ডেট্রয়েটের পশ্চিমাঞ্চলে ভোট দেওয়া গ্যারি কলবার্ট নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আল-জাজিরাকে বলেন, “সবাই জানে আসল পাগল কে। তিনি যা খুশি তা-ই বলে বেড়ান।”

ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ক্ষোভ তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প ও তার সঙ্গীরা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্ষতি করছেন। তাদের কোনও দায়বোধ নেই।

দক্ষিণ-পশ্চিম ডেট্রয়েটের অভিবাসী ভোটারদের কাছে ট্রাম্প প্রশাসনের ধরপাকড় নীতির অবসান ঘটানোই ছিল সবচেয়ে বড় বিষয়।

অবৈধ অভিবাসীদের ধরতে ট্রাম্প প্রশাসন দেশজুড়ে রাস্তায় নামিয়ে দেয় অভিবাসন কর্মকর্তাদের (আইসিই)। এসব অভিযানে অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন এবং বেপরোয়া অভিযানের প্রতিবাদকারী মার্কিন নাগরিকসহ বেশ কয়েকজন নিহত হন।

সেখানকার একটি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত শিক্ষক ফ্রাঙ্ক এস্পিনোসা বলেন, “আমাদের এক নম্বর চাওয়া, রাস্তা থেকে আইসিই সরাতে হবে।”

তিনি বলেন, “আমরা বিদেশি যুদ্ধের অবসান চাই। আমার ছাত্ররা চায় তেলের দাম যেন সহনীয় হয়। জ্বালানি তেল থেকে শুরু করে মুদি দোকান, পুরো শহরেই আমরা জিনিসপত্রের দাম নাগালের মধ্যে দেখতে চাই।”

আল-সায়েদের ধর্মীয় ও আরব পরিচয় নিয়ে চলা আক্রমণকে ‘হতাশাজনক’ উল্লেখ করে এস্পিনোসা বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন ডেট্রয়েটবাসী সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে এবং এল-সায়েদকেই ভোট দেবে।

মিশিগানের ডিয়ারবর্ন এলাকাটি ‘আরব আমেরিকার রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। সেখানে অনেকের কাছে এই ভোট ছিল যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক হিসেবে নিজেদের আত্মপরিচয় ও অধিকারের প্রশ্ন। ভোটের দিন সেখানকার ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়।

ইয়েমেনি আমেরিকান কমিউনিটির নেতা আলী বালিদ আলমাকলানি আল জাজিরাকে বলেন, ইসলামবিদ্বেষী প্রচার মুসলিম ও আরবদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে আরও বেশি উৎসাহিত করেছে।

তিনি বলেন, “আমরা এই বিদ্বেষ দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি এবং সামগ্রিকভাবে আমেরিকানরাও এতে বিরক্ত।”

আলমাকলানি বলেন, “আল-সায়েদ স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতি আর সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে এমন বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছেন; অন্যদিকে, প্রতিপক্ষ কেবল ‘সন্ত্রাসবাদ’ আর মুসলিম ব্রাদারহুডের ভিত্তিহীন গল্প ফেঁদেছে।”

রিপাবলিকানদের প্রচারণায় আরব ও মুসলিমদের ‘বহিরাগত’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টার তীব্র সমালোচনা করে ক্ষোভে ফেটে পড়েন ডিয়ারবর্নের স্থানীয় ভোটার মাইক মোহাম্মদ।

যে প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে ভোটগ্রহণ চলছিল, সেটির দিকে আঙুল নির্দেশ করে উত্তপ্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমরা ওদের চেয়েও বেশি আমেরিকান। আমি ওদের যে কারও চেয়ে অনেক বেশি আমেরিকান। আমি এখানেই বড় হয়েছি, এই স্কুলেই পড়াশোনা করেছি।”

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্যালি হাওয়েল বলেন, আল-সায়েদের জয় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আমেরিকানরা রাজনীতিতে পরিবর্তন চান।

তিনি বলেন, “এই পরিবর্তনের অর্থ রাজনীতিতে মুসলিম বিদ্বেষকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা এবং আমেরিকানদের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের জীবনের মূল্যের স্বীকৃতি দেওয়া।”

অধ্যাপক হাওয়েল বলেন, “মিশিগানের আরব কমিউনিটির কাছে এই জয়ের অর্থ হল, তারা সকালে এই বিশ্বাস নিয়ে ঘুম থেকে উঠতে পারবে যে, আমেরিকার রাজনীতিতে তাদের অবদান ও কণ্ঠস্বর অবশেষে স্বীকৃতি পেয়েছে।”

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension