যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের জয়, ভারত-পাকিস্তানের ওপর কী প্রভাব পড়বে

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তানের ওপরও।
ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি এইচ-১বি ভিসা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর নীতিতে কিছুটা পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে পাকিস্তানের করা ব্যবসায়িক ও প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো মার্কিন কংগ্রেসের তদন্তের মুখে পড়তে পারে।

ট্রাম্প ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে থাকলেও কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তার জন্য আইন পাস ও বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন করে তুলবে। ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ও তার পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই ভিন্নভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

ভারতের জন্য কী সুযোগ তৈরি হবে
মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পর নিজের সমর্থকদের কাছে রাজনৈতিক সাফল্য তুলে ধরতে চাইবেন ট্রাম্প।

এ ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি তার অগ্রাধিকারে থাকতে পারে। অন্যদিকে, ভারতও এই পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে বাণিজ্য চুক্তি করার সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে। কয়েক মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো কোনো সমাধান হয়নি। চীন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় ভালো শুল্ক সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা চায় নয়াদিল্লি।
এ ছাড়া বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় ভারতসহ কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে ট্রাম্প প্রশাসন।

এসব দেশ কৌশলগতভাবে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করে মার্কিন অর্থনীতির ক্ষতি করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়গুলোও বাণিজ্য চুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ায় ভারতীয় আলোচকরা কিছুটা সুবিধা পেতে পারেন। চুক্তি করতে ভারতের ওপর চাপও কমতে পারে। তবে এতে দুই দেশের সম্পর্কের সব জটিলতা দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

এ ছাড়া ট্রাম্প নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে শুল্ক আরোপ অব্যাহত রাখতে পারবেন। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস সরাসরি এসব সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবে না। তবে শুল্কের কারণে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষ কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তা খতিয়ে দেখে প্রশাসনের ওপর নীতিগত পরিবর্তনের চাপ বাড়াতে পারবে।

এইচ-১বি ভিসায় কি স্বস্তি পাবে ভারত
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতিতেও কংগ্রেসের ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে। দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচিতে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান ভারতীয় পেশাজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রশাসন এই ভিসার জন্য ১ লাখ ডলারের ফি নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠান মার্কিন কর্মীদের ছাঁটাই করছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের এইচ-১বি ভিসার আবেদন আরো কঠোরভাবে যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ভারতীয় প্রযুক্তি পেশাজীবীদের ওপর। অনুমোদিত এইচ-১বি ভিসার প্রায় চার ভাগের তিন ভাগই ভারতীয় নাগরিকদের দেওয়া হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ট্রাম্পের এই নীতির সমালোচনা করেছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের অনেকে। এখন কংগ্রেসে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগ সীমিত করার অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আরো আলোচনা ও তদন্ত হতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা গুরুত্ব পেতে পারে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পরিবর্তন না এলেও দীর্ঘ মেয়াদে ভারতীয় পেশাজীবীদের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হতে পারে।

তবে ভারতের জন্য সব দিক ইতিবাচক নয়। দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ঐতিহাসিকভাবেই ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে তারা আরো কঠোর অবস্থান নিতে পারে। এতে নয়াদিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে নতুন করে টানাপড়েন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্পের চুক্তি কি তদন্তের মুখে পড়বে
ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। গত দেড় বছরে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে ইসলামাবাদ। এর মধ্যে ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক চুক্তিও রয়েছে।

এর একটি হলো ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যানশিয়ালের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাকিস্তানের সমঝোতা স্মারক। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। এ ছাড়া চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পাওয়ারাসের সঙ্গে চালকবিহীন আকাশযান বা ড্রোন ব্যবস্থার বিষয়ে চুক্তি করে পাকিস্তান।পাকিস্তানের এসব চুক্তিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনির। ট্রাম্প তাকে ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করেছেন।

গত সেপ্টেম্বরে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ উন্নয়নে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ইউএস স্ট্র্যাটেজিক মেটালসের সঙ্গে ৫০ কোটি ডলারের একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষর করে পাকিস্তান। এ ছাড়া নিউ ইয়র্কে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রুজভেল্ট হোটেল সংস্কারের বিষয়েও একটি চুক্তি রয়েছে।

এখন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে এসব চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ট্রাম্পের পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে শেয়ার লেনদেন ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা তদন্তের আওতায় আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের ব্যাবসায়িক লেনদেনও বাড়তি নজরদারির মুখে পড়তে পারে।

এ ধরনের তদন্তে পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের করা চুক্তিগুলোও আলোচনায় আসতে পারে। এতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।

ভারত ও পাকিস্তানের জন্য ভিন্ন সমীকরণ
মার্কিন কংগ্রেসে ক্ষমতার পরিবর্তন ভারত ও পাকিস্তানের জন্য আলাদা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ভারতের সামনে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে নিজেদের শর্ত আদায়ের সুযোগ বাড়তে পারে। এইচ-১বি ভিসা নিয়েও দীর্ঘ মেয়াদে কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মানবাধিকার ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন বাড়তে পারে।

অন্যদিকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে পাকিস্তানের গড়ে তোলা ব্যবসায়িক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কগুলো কংগ্রেসের তদন্তের আওতায় আসার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কেও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension