বাংলাদেশ

মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের জামায়াত করা অপরাধ: সংসদে ফজলুর রহমান

মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। কোনো শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করলে এটা ডাবল (দ্বিগুণ) অপরাধ। বিএনপির সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের এমন বক্তব্য ঘিরে সংসদে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় দাঁড়িয়ে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের এমপি ফজলুর রহমান জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের দায়মুক্তি আইন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

জামায়াতের সদস্যরা এসময় প্রতিবাদ জানালেও তাদের শরিক দল এনসিপির সদস্যরা নিশ্চুপ ছিলেন। অন্যদিকে বিএনপি দলীয় সদস্যদের কেউ কেউ এসময় ফজলুর রহমানের পক্ষে টেবিল চাপড়ালেও অনেককে আবার উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখতে দেখা যায়।

সংসদের বৈঠকে বেশ কিছুক্ষণ অচলাবস্থার সৃষ্টি হলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ উভয় পক্ষকে নিবৃত্ত করতে এক পর্যায়ে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যান। পরিস্থিতি শান্ত হলে স্পিকার সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, এই আচরণ পুরো জাতি দেখছে। সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে। সংসদ যদি বিধি মোতাবেক না চলে, তাহলে এই সংসদ আর থাকবে না।

সদস্যদের এমন কর্মকাণ্ডে শিশুরাও লজ্জা পাবে বলে মন্তব্য করে স্পিকার বলেন, যারা এরই মধ্যে দাদা হয়ে গিয়েছেন, তাদের নাতিরা হয়তো এখানে গ্যালারিতে বসে দেখছেন। তারা কি ভাববে সংসদ সম্পর্কে?

জুলাই অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনার সমালোচনা করে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেন, এই কথাটা বলাই অন্যায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের তুলনা করা হচ্ছে; প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে কুয়া তুলনা করা।

তিনি বলেন, ‘তারা বলেছিল কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয় নাই। সাতচল্লিশে যুদ্ধ হয়েছে, সেইদিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বলেছিলাম, এই আল বদরের বাচ্চারা, এখনো কিন্তু ফজলুর রহমান জীবিত আছে। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধই সত্য। ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছেন এটাও সত্য। আমরা সেদিন তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম।’

ফজলুর রহমান বলেন, অনেক চক্রান্তের মধ্য দিয়ে নির্বাচন হয়েছে, সেই নির্বাচনে তারা (বিরোধী দল) যা করেছে সেটা কল্পনা করার মতো না। সেই চক্রান্তের ভেতর দিয়ে যখন তারা প্রচার করতে শুরু করল, দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে তারা পাস করবে। আমি ফজলুর রহমান বলেছিলাম, জামায়াত জোট যদি দুই-তৃতীয়াংশ পায়, তাহলে আমি বিষ খাব। তারা কখনো রাজনৈতিক যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারে না। তাদের পূর্বপুরুষ বাংলাদেশ চায় নাই। যতদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার বেঁচে থাকবে, ততদিন রাজাকার এদেশে কখনো জয়লাভ করতে পারবে না।

এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করলে ফজলুর রহমানের জন্য নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যায়। তিনি স্পিকারের কাছে আরও পাঁচ মিনিট সময় চান। স্পিকার তিন মিনিট সময় বাড়িয়ে দেন।

বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান উদ্দেশ্যে ফজলুর রহমান বলেন, ‘তাঁর দলের লোকজন এখানে বসে আছে, তারা আমাকে ‘ফজা পাগলা’ বলে কথা বলে। তারা নাকি সভ্য, তারা ইসলাম…।’ এ সময় সবাই হেসে ওঠেন। ফজলুর রহমান বলেন, (বিরোধী দলীয় নেতা) উনি বলেন আমার দাড়ি পাকা, চোখের সমস্ত চুল পাকা, উনি আমার ১০ বছরের ছোট। আমার বয়স ৭৮ বছর।

ফজলুর রহমান বলেন, বিরোধী দলের নেতা দাবি করেন—তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক এবং শহীদ পরিবারের লোক এবং জামায়াতে ইসলাম করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না। এ সময় জামায়াতের সদস্যরা পুনরায় ব্যাপক হইচই শুরু করেন।

তখন স্পিকার বলেন, ‘উনাকে বলতে দেন। শৃঙ্খলা রক্ষা করুন। সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করুন।’ তখন ফজলুর রহমান বলেন, আমি আবারও বলে রাখলাম, শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করছেন।

এ বক্তব্যের পর জামায়াতের সদস্যরা দাঁড়িয়ে একযোগে হইচই ও প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এ পর্যায়ে ফজলুর রহমান বক্তব্য চালিয়ে যেতে চাইলে বিরোধী দলের সদস্যরা বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেন। ফজলুর রহমান বলেন, তিনি খারাপ কিছু বলেন নাই।

এ সময় স্পিকার ফজলুর রহমানকে বসার এবং একটু অপেক্ষা করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। ফজলুর রহমানের বক্তব্যের সময় জামায়াতও তাদের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, খেলাফত মজলিশের এমপিদের দাঁড়িয়ে হইচই করতে দেখা যায়। সরকারি দলের এমপিদেরও দাঁড়িয়ে হইচই করতে দেখা যায়। এসময় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে সরকার দলীয় এমপিদের দাঁড়াতে ইশারা করলে অনেকেই দাঁড়িয়ে যান। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সবাইকে বসার অনুরোধ করতে দেখা যায়। তবে সংসদে উপস্থিত এনসিপির সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ), আব্দুল্লাহ আল আমিন, আতিকুর রহমান মোজাহিদ চুপচাপ বসে থাকতে দেখা যায়।

হৈচৈ তীব্র আকার ধারণ করলে স্পিকার সদস্যদের বসার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, সামান্য কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি করা ঠিক নয়। প্রত্যেকেরই বাকস্বাধীনতা আছে।

স্পিকার বলেন, ‘সংসদের স্পিকার যখন দাঁড়ায় তখন অবশ্যই সবাই বসে পড়বেন। আমাকে তো আপনারাই স্পিকার বানিয়েছেন। আমি সংসদের অভিভাবক। আমার প্রতি যদি আপনাদের সম্মান না থাকে, তাহলে জাতীয় সংসদের প্রতি মানুষের কোনো রেসপেক্ট থাকবে না আগামী দিনে।’

স্পিকার বলেন, ফজলুর রহমানের বক্তব্যের জবাব দিতে চাইলে বিরোধী দলের সদস্যদের সময় দেওয়া হবে। প্রয়োজনে সময় বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তখন যুক্তি খণ্ডন করবেন। তিনি যদি অসংসদীয় কোনো কথা বলে থাকেন, সেটা পরীক্ষা করে এক্সপাঞ্জ করে দেওয়া হবে। কিন্তু বক্তব্যের সময় তাকে ডিস্টার্ব করবে না।

পরে আবার বক্তব্য শুরু করেন ফজলুর রহমান। এ সময় তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের কথা উল্লেখ করে বলেন, বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকারীদের বলা হয় আল বদর। সে আল বদর কারা আপনারা জানেন। দুর্ভাগ্য, সংসদের প্রথম দিন (১২ মার্চ) এখানে কোনো বাতি ছিল না, তিনি কিছু শুনতে পারেননি। এই সংসদে তাদের ব্যাপারেও শোক প্রস্তাব হয়েছিল। তিনি একা হলেও এর প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু তাঁর দল এটা করছে, তাই তিনি চুপ ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে শোক প্রস্তাব নেওয়ায় এ সংসদ সম্পর্কে আজ না হলেও কাল ইতিহাসে ভুল বার্তা যাবে।

জুলাই আন্দোলন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পুলিশের ব্যাপারে যে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সে পুলিশ ৫ আগস্ট পর্যন্ত এক রকম। কিন্তু ৫ আগস্টের পরে… আমি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলাম, ১৬ ডিসেম্বরের পরে শত শত রাজাকার আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আমি কাউকে হত্যা করিনি, সবাইকে জেলে পাঠিয়ে দিয়েছি। ৫ আগস্টের পরে এত থানা লুট হয়েছে, পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে, তখন তো পুলিশ যুদ্ধ করেনি, তারা তো নিরাপরাধ। এত অস্ত্র গেল কোথায়? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার নেতা। ৫ আগস্টের পরে এত ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো কোন আইনে দায়মুক্তি হওয়ার কথা না। ৫ আগস্টের পরে পুলিশ হত্যা হয়ে থাকলে, থানা লুট হয়ে থাকলে, সেটার জন্য তদন্ত হওয়া উচিত, দোষীদের বিচার হওয়া উচিত।’

ফজলুর রহমানের এই বক্তব্যের সময় সরকার দলের একাধিক সদস্যকে অস্বস্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়। এমনকি কেউ কেউ হাতের ইশারা দিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেন।

জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠনের বিষয়ে ইঙ্গিত করে ফজলুর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মহান কাজ করেছেন। ৭৮ জনকে ২২২ জনের সমান সমান ভাগ দিয়ে কমিটি করেছেন। সিরাজউদ্দৌলা ও মোহাম্মদী বেগ কিন্তু এক না। মোহাম্মদী বেগ কিন্তু সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেছে।’

বিরোধী দলীয় নেতার জবাব
ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পরে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধে নিজের অবদান বলতে আরেকজনের অবদানের ওপর হাতুড়ি পেটানোর অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। তিনি (ফজলুর রহমান) ব্যক্তিগতভাবে আমাকে আহত করেছেন। আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য—এটাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। কোনো মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াত ইসলামী করতে পারে না—বলেছেন। এজন্য কি তাঁকে জিজ্ঞেস করা লাগবে?

তিনি ফজলুর রহমানের এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘আমার আইডেন্টিটি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, এটা গুরুতর অপরাধ। আবার আমার আদর্শ সিলেকশনের ব্যাপারে কথা বলেছেন, এটা বাড়তি অপরাধ করেছেন।’

ফজলুর রহমানের বক্তব্যের অসংসদীয় অংশ এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, এই সংসদকে কার্যকর করতে বর্তমান জ্বালানি অব্যবস্থাপনা সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তিনি (ফজলুর রহমান) এইটাকে শেষ পর্যন্ত কনক্লুশন রাখলেন কি দিয়ে— যার মগজ যেরকম, তার কনক্লুশন সেরকম। তার মতো একজন প্রবীণ ব্যক্তির কাছ থেকে আমি এই ধরনের আচরণ আশা করি না।’

পরে ফজলুর রহমান আবার বক্তব্য দিতে চাইলে স্পিকার তাকে ফ্লোর না দিয়ে বলেন, এখন আর না বললেও চলে। আমরা সংসদ উত্তপ্ত হোক, এটা চাই না। আপনি একটু দয়া করে বসুন।

স্পিকার বলেন, ফজলুর রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন তার মধ্যে যদি অসংসদীয় কোনো কিছু থাকে, সেটা এক্সপাঞ্জ করা হবে। বিরোধী দলের নেতা যে বক্তব্য দিয়েছেন তার মধ্যেও যদি কোনো অসংসদীয় কিছু থাকে, সেটিও এক্সপাঞ্জ করা হবে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension