শিক্ষাপ্রধান খবরবাংলাদেশ

এসএসসি পাস করেও এইচএসসিতে নেই সাড়ে ৫ লাখ, কোথায় হারাচ্ছে শিক্ষার্থীরা?

বিগত দুই বছরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। নবম ও দশম শ্রেণিতেও বেড়েছে ঝরে পড়ার প্রবণতা। শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা, দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রমসহ নানা কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরুর পর গত দুই বছরের একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। ২০২৪ সালে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করা প্রায় সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না।

বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, আগে এসএসসির পর সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ত। কিন্তু এবার মাদ্রাসায় ৪৪ শতাংশ, কারিগরি শিক্ষায় ৫৪ শতাংশ এবং সাধারণ শিক্ষায় ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং আমাদের জন্য বড় প্রশ্ন।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, করোনা-পরবর্তী শিখন ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার আগেই শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন সংকটে পড়েছে। জুলাই আন্দোলন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিক্ষাঙ্গনে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত শ্রেণিমুখী হতে পারেনি। পাশাপাশি দারিদ্র্যের কারণে পরিবারের উপার্জনে যুক্ত হওয়া এবং বাল্যবিয়ের মতো ঘটনাও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বাড়িয়েছে।

সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষার বাইরে

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থী ছিল ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয়নি ২৪ হাজার ৭৮৪ জন। অপরদিকে, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েও প্রায় সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী এইচএসসি’র ফরম পূরণ করেনি।

২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একাদশ শ্রেণিতে ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। তাদের মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন। আর ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন ফরম পূরণ করেনি। অর্থাৎ নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ পরীক্ষার বাইরে চলে গেছে।

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম প্রথম বর্ষে নিবন্ধন করেছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ৭৮ হাজার ২৬৯ জন ফরম পূরণ করেছে। বাকি ৬১ হাজার ৬৬০ জন ফরম পূরণ না করায় পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না। এ বোর্ডে ফরম পূরণ না করার হার ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একাদশ শ্রেণির (ভোকেশনাল) ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। তাদের মধ্যে ফরম পূরণ করেছে ৭৫ হাজার ১৯৭ জন। ফলে ৯০ হাজার ৩৪৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা থেকে ছিটকে গেছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ফরম পূরণ না করা শিক্ষার্থীর হার ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা সব বোর্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ।

সবমিলিয়ে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেও প্রায় সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের প্রায় ৪ লাখ, মাদ্রাসায় ৬১ হাজারের বেশি এবং কারিগরিতে ৯০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে।

করোনা থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা: কেন বাড়ছে ঝরে পড়া

ঝরে পড়ার কারণ জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ঝরে পড়া শুধু দুই বছরের বিষয় নয়। করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাঙ্গনের ক্ষতি ঠিকমতো নিরূপণ করা হয়নি, সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কার্যকর ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। করোনা-পরবর্তী সময় ধরলে প্রায় পাঁচ বছর ধরে আমরা একটি টানা-পোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। প্রথমত, পুরো শিক্ষাঙ্গন করোনা-পরবর্তী ক্ষতি সামাল দিতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, আমরা এমন একটি সময় পার করেছি, যখন ঘন ঘন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করা হয়েছে।’

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর শিক্ষাঙ্গনে মব সন্ত্রাসের কারণে শিক্ষকরা এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে পড়েন। আন্দোলনের মূল চেতনাকে পাশ কাটিয়ে একাংশ শিক্ষার্থীও মব সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাব শিক্ষার পরিবেশে নেতিবাচকভাবে পড়ে।

তিনি বলেন, আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীর আন্দোলনের মুখে ২০২৫ সালে অটোপাস দেওয়া হয়। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি নিয়ে তখন তেমন আলোচনা হয়নি। শুধু শিক্ষার্থীদের শিখন-ঘাটতিই নয়, পুরো শিক্ষাঙ্গনই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। শিক্ষকরা দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার মধ্যে ছিলেন। এর প্রভাব পড়েছে শিক্ষা, সমাজ এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধেও। কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়—এসবও সেই সংকটের অংশ। এই পরিস্থিতি থেকে এখনও পুরোপুরি উত্তরণ ঘটেনি। এরই প্রভাব হিসেবে এখন শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

তিনি আরও বলেন, অনেক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পাস করার পর উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে। আবার ভর্তি হলেও অনেকেই শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। কেউ জীবিকার জন্য কাজ শুরু করে, কেউ নিবন্ধন করেও টেস্ট পরীক্ষার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। আবার অনেকে নিবন্ধন করলেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেয় না। গত তিন-চার বছর ধরে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি শুধু এ বছরের সমস্যা নয়। আমরা বিষয়টিকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিইনি। জাতি হিসেবে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার থেকে সরিয়ে ফেলেছিলাম। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও শিক্ষা সেই অগ্রাধিকার পায়নি। এখন বর্তমান সরকারের সময়ে সেই অবহেলার ফল সামনে আসছে।

দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রমের প্রভাব

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে বাল্যবিয়ের কথা উল্লেখ করেন রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে ১৮ বছরের নিচে বাল্যবিয়ের হার বেড়েছে। অনেকে একে ‘আর্লি ম্যারেজ’ বললেও ১৮ বছরের নিচে হলে সেটি বাল্যবিয়েই।

তিনি বলেন, বাল্যবিয়ে এবং শিশুদের শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়া—দুটিই ঝরে পড়ার বড় কারণ। একইসঙ্গে শিক্ষা এখনও ব্যয়বহুল। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা সম্ভব হয়নি। সরকার উপবৃত্তি, বই, পোশাক, জুতা ও মিড-ডে মিল দিচ্ছে। কিন্তু নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় বহন করা অনেক পরিবারের পক্ষেই সম্ভব হয় না। অথচ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তাই পর্যায়ক্রমে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালুর পরামর্শ দেন তিনি।

সমাধান কী দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় কিছু শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি স্বাভাবিক ঘটনা। তবে গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এই প্রবণতা বেড়েছে। অনেক শিক্ষার্থী বাবা-মায়ের কর্মসংস্থান হারানোর কারণে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির মুখোমুখি হয়েছে। চাকরি বা কাজ হারিয়ে অনেক পরিবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনার মতো বড় শহর ছেড়ে শহরতলি বা গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।

তিনি বলেন, কোভিড-১৯–এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও এখনও কাটেনি। মহামারির সময়ে অনেক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত শিখন অর্জন করতে পারেনি, যার নেতিবাচক প্রভাব এখনও রয়ে গেছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার কারণে অনেক পরিবার মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার ব্যয় বহন করতে পারছে না। ফলে অনেকেই সন্তানদের মাদ্রাসা বা তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে বাধ্য হচ্ছে।

কে এম এনামুল হক বলেন, অনেক শিক্ষার্থী এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে ফরম পূরণ করলেও আর্থিক সংকটের কারণে প্রাইভেট টিউশন, কোচিং কিংবা বিদ্যালয়ের পরীক্ষা প্রস্তুতির অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে পারেনি। আবার অনেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে অন্য এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। ফলে তারা শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। তাঁর মতে, বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা এখনও শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের জন্য কার্যকরভাবে প্রস্তুত করতে পারছে না। ফলে প্রান্তিক পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়াকে বড় ক্ষতি বলে মনে হয় না।

তিনি বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে শুধু শিশুর ইতিবাচক মনন, জাতীয়তাবোধ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ নয়, স্কুল টু ওয়ার্ক ট্রানজিশন বা শিক্ষা থেকে কর্মজীবনে যাওয়ার প্রক্রিয়াকেও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা-সংক্রান্ত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, বিশেষ করে উপবৃত্তি, মেয়েশিশুদের জন্য বিশেষ উপবৃত্তি এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ছাত্র আন্দোলনের সময় অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ফিরতে পারেনি। এর প্রভাব এখনও রয়ে গেছে।

তার ভাষ্য, পড়াশোনার বাইরে চলে গেছে এমন একটি বড় অংশ রয়েছে। টেস্ট পরীক্ষার সময় এসে অনেকেই আর আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে না। ফলে একাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। যদিও সংখ্যাটি খুব বেশি নয়, তবু বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শিক্ষার্থীদের আবার বিদ্যালয়মুখী করা। ‘ব্যাক টু স্কুল’ কর্মসূচিকে কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়, সরকারকে সেটি ভাবতে হবে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension