
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: আভিজাত্য আর র্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা চার পরাশক্তির স্বপ্নের সেমিফাইনাল
হুমায়ূন কবীর ঢালী:
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল তার গৌরবময় ইতিহাসে এক নতুন ও অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বিশ্বকাপের দীর্ঘ পথচলায় এই প্রথমবারের মতো বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্তক সংস্থা ফিফা (FIFA) বিশ্ব র্যাংকিংয়ের শীর্ষ চার দল একসঙ্গে সেমিফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। বর্তমান বিশ্ব র্যাংকিংয়ের এক নম্বর দল স্পেন, দুই নম্বর দল আর্জেন্টিনা, তিন নম্বর দল ফ্রান্স এবং চার নম্বর দল ইংল্যান্ড—মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছে। ফুটবল ইতিহাসে আভিজাত্য আর বর্তমান ফর্মের এমন নিখুঁত মেলবন্ধন এর আগে কখনো দেখেনি বিশ্ববাসী।
বিবিসি নিউজের এক বিশেষ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শীর্ষ চার পরাশক্তির এই সেমিফাইনালে ওঠার পেছনে মাঠের অনবদ্য পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ফিফার একটি কৌশলী ও যুগান্তকারী নিয়মের বড় ভূমিকা রয়েছে। ২০২৬ সালের ৪৮ দলের এই বর্ধিত বিশ্বকাপে নকআউট পর্বের জটিলতা এড়াতে এবং টুর্নার্মেন্টের উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে ফিফা ড্রয়ের নিয়মে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। বিশ্ব ফুটবলের গভর্নিং বডি শীর্ষ চার দলকে ড্রয়ের চারটি ভিন্ন ‘কোয়াড্রেন্টে’ বা গ্রুপে এমনভাবে বিভক্ত করে দেয়, যাতে সেমিফাইনালের আগে কোনোভাবেই তারা একে অপরের মুখোমুখি না হতে পারে। তবে এই সমীকরণ সফল করার জন্য দলগুলোকে অবশ্যই নিজ নিজ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হতে হতো এবং তারা প্রত্যেকেই অত্যন্ত দাপটের সাথে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বে পা রাখে। ফিফা এই পদক্ষেপকে “প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য” রক্ষা এবং সেমিফাইনালের জন্য “দুটি পৃথক পথ” তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার ফলে কোয়ার্টার ফাইনাল বা তার আগেই কোনো বড় পরাশক্তির বিদায় নেওয়ার ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
র্যাংকিংয়ের শীর্ষস্থান অর্জনের পাশাপাশি এই সেমিফাইনালিস্টরা আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। টিবিএস রিপোর্টের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বকাপের দীর্ঘ আসরের ইতিহাসে এটি মাত্র তৃতীয় ঘটনা, যেখানে সেমিফাইনালের চারটি দলই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। এর আগে কেবল ১৯৭০ এবং ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে এমন গৌরবময় দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে লড়েছিল ব্রাজিল, ইতালি, উরুগুয়ে এবং পশ্চিম জার্মানি। ঠিক ২০ বছর পর, ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে ইতালি, আর্জেন্টিনা, পশ্চিম জার্মানি এবং ইংল্যান্ড শেষ চারে জায়গা করে নেয়। এরপর দীর্ঘ ৩৬ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে ২০২৬ বিশ্বকাপে আবার চার সাবেক চ্যাম্পিয়নের একচেটিয়া আধিপত্য ফিরে এলো।
এই চার দলের ঘরে রয়েছে সর্বমোট ৭টি বিশ্বকাপ শিরোপা, যার মধ্যে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সর্বোচ্চ ৩ বার (১৯৭৮, ১৯৮৬, ২০২২), ফ্রান্স ২ বার (১৯৯৮, ২০১৮), স্পেন ১ বার (২০১০) এবং ইংল্যান্ড ১ বার (১৯৬৬) শিরোপা জিতেছে। ১৯৯০ সালের পর আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড এবারই প্রথম একই সাথে আরেকটি সম্পূর্ণ সাবেক চ্যাম্পিয়নদের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। এই ঐতিহাসিক ড্র বিন্যাসের ফলে ফুটবলপ্রেমীরা পেতে যাচ্ছেন স্বপ্নের দুটি সেমিফাইনাল। আগামী মঙ্গলবার প্রথম সেমিফাইনালে ইউরোপের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্স ও স্পেন একে অপরের মুখোমুখি হবে। অন্যদিকে বুধবার দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ঐতিহাসিক দ্বৈরথে মাঠে নামবে লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপের অন্যতম সেরা দল ইংল্যান্ড।
অতীতে অনেক সময়ই দেখা গেছে, র্যাংকিংয়ের শীর্ষ দলগুলো বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব বা নকআউট পর্বের শুরুতেই অঘটনের শিকার হয়ে বিদায় নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০২ সালে ফ্রান্স, ২০১০ সালে ইতালি, ২০১৪ সালে স্পেন, ২০১৮ সালে জার্মানি এবং ২০২২ সালে বেলজিয়াম—শীর্ষ চার র্যাংকিংয়ে থাকা সত্ত্বেও গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হতে ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে ফিফার নতুন পরিকল্পনা এবং দলগুলোর দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা টুর্নামেন্টকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এবারও কোনো এক সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নের হাতেই উঠতে যাচ্ছে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি, আর বিশ্ববাসী সাক্ষী হতে যাচ্ছে শতাব্দীর অন্যতম সেরা ফুটবল রোমাঞ্চের।



