
সাহিত্যের আলোয়, প্রকৃতির ছায়ায়—সফল সমাপ্তি চতুর্থ রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলার
হুমায়ূন কবীর ঢালী, নিউইয়র্ক:
নিউইয়র্কের চেস্টনাট রিজে প্রকৃতির স্নিগ্ধ সবুজে ঘেরা মনোরম পরিবেশে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রসারে কাজ করে যাওয়া সংগঠন বেঙ্গলি ইন্টারন্যাশনাল লিটারারি সোসাইটি (BILS)-এর উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী সফলভাবে অনুষ্ঠিত হলো ‘চতুর্থ রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলা ২০২৬’। ২৮৫ হাংরি হলো রোড, চেস্টনাট রিজ, নিউইয়র্কে আয়োজিত এবারের মেলার মূল স্লোগান ছিল—‘পড়ুন, লিখুন, ভাবুন ও যোগদান করুন।’
অনুষ্ঠানের প্রাক-পর্ব হিসেবে ২৫ জুলাই সকাল থেকেই শুরু হয় নানা আকর্ষণীয় ও ব্যতিক্রমী কর্মসূচি। জ্ঞানা মেলার পরিচালনায় ‘গেট ফিট অ্যান্ড টিয়ানা উইথ জ্ঞানা’ শীর্ষক শরীর শিথিলকরণ ও স্ট্রেচিং, জশ সুকভের সঙ্গে বনের মধ্যে হাইকিং ও মৌমাছি চাষের অভিজ্ঞতা, ওরা সুকভের পরিচালনায় গাছের নিচে হাঁটা যোগা, থ্রিফোল্ড কমিউনিটি ফার্ম টুর এবং পন্ডে সাঁতারের মতো আয়োজন অংশগ্রহণকারীদের প্রকৃতির আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে।
এবারের রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলার প্রধান থিম ছিল ‘শাড়ি’। বাংলাদেশ ও ভারতের নারীদের ঐতিহ্যবাহী এই পোশাকের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প এবং বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এর প্রভাব নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ সেমিনার ও আলোচনা। পাশাপাশি ‘ইন্টারন্যাশনাল মিউজিয়াম অব দ্য শাড়ি’ এবং ‘মাই জার্নি ইন এ শাড়ি টু হিথ্রো এয়ারপোর্ট’ শিরোনামে শাড়িকেন্দ্রিক বিশেষ সেশন ও প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।
দুই দিনব্যাপী এই সাহিত্য উৎসব ও বইমেলায় দেশ-বিদেশের সাহিত্যিক, গবেষক, লেখক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয় পুরো আয়োজন। বিভিন্ন পর্বে অনুষ্ঠিত হয় সাহিত্য পাঠ, মৌলিক কবিতা, গল্প ও ছড়া উপস্থাপনা। সৃজনশীল লেখকদের অংশগ্রহণে আয়োজন করা হয় ‘লাইভ রাইটিং কনটেস্ট’ বা ‘বনের মাঝে লেখার খোঁজে’ শীর্ষক ব্যতিক্রমী প্রতিযোগিতা।
মেলার উদ্বোধনী পর্বে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন অ্যান্ড্রু শ্যান্টজ ও সামিনা খন্দকার। এর ইংরেজি অনুবাদ পরিবেশন করেন ড. অস্মিতা সাহা। এ সময় আমেরিকান জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন প্রথম চক্রবর্তী, অ্যান্ড্রু শ্যান্টজ, শ্যানন ইয়ং ও জন কার্লোস ইয়ং। থ্রিফোল্ড এডুকেশনাল ফাউন্ডেশনের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এরিক সিলবার অনুষ্ঠানের জন্য একটি বিশেষ শুভেচ্ছা বার্তা প্রদান করেন, যা মেলা উপলক্ষে প্রকাশিত স্যুভেনিয়রে স্থান পেয়েছে।
লেখকদের নিজেদের বই প্রদর্শন ও বিক্রয়ের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি এবারের আয়োজনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল অটিজম স্পেকট্রামে থাকা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন লেখকদের জন্য বিশেষ উপস্থাপনার সুযোগ সৃষ্টি করা। Endeavor 21+-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এই উদ্যোগ সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে অন্তর্ভুক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
মেলায় ‘২৫০ ইয়ার্স অব ইস্ট-ওয়েস্ট লিটারারি ডেভেলপমেন্টস’ (250 Years of East-West Literary Developments) শীর্ষক একটি বিশেষ প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন কবি ফকির ইলিয়াস। দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনে বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি, জার্মান ও স্প্যানিশ ভাষায় কবিতা পাঠ ও সাহিত্য আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
সাহিত্য ও আলোচনার পাশাপাশি মেলায় ছিল বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক আয়োজন। বাংলা ও পশ্চিমা সংগীতের মেলবন্ধনে সংগীত পরিবেশনা, তবলা বাদন, নৃত্য, ম্যাজিক শো এবং স্থানীয় জৈব খামারে উৎপাদিত অর্গানিক আমেরিকান খাবারের আয়োজন অংশগ্রহণকারীদের জন্য বাড়তি আনন্দের আবহ তৈরি করে।
প্রবাসের যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে শব্দ, সাহিত্য ও আপনজনের সান্নিধ্যে সময় কাটানোর এই আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত কবি ও পশ্চিমবঙ্গ পোয়েট্রি একাডেমির সাবেক চেয়ারম্যান সুবোধ সরকার। উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোস্তফা সারওয়ার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক ও কবি মোহাম্মদ নূরুল হুদা।
আয়োজনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন আয়োজক ড. ধনঞ্জয় সাহা এবং কনভেনর গিয়ানা মেলা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. মোহাম্মদ মাসুম, কণ্ঠশিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়, কবি ফকির ইলিয়াস, কবি ফারহানা ইলিয়াস তুলি, লেখক-সাংবাদিক শাহ জে চৌধুরী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুল হক, কবি বেনজির সিকদার এবং শিশুসাহিত্যিক হুমায়ূন কবীর ঢালীসহ দেশ-বিদেশ থেকে আগত বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি।
বইয়ের গন্ধ, কবিতার পঙ্ক্তি, সাহিত্য নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা এবং দীর্ঘদিন পর প্রিয় মুখগুলোর সঙ্গে দেখা হওয়ার উষ্ণতায় মুখরিত হয়ে ওঠে দুই দিনের এই আয়োজন। প্রবাসী বাঙালি সাহিত্যপ্রেমীদের হৃদয়ে চতুর্থ রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলা ২০২৬ সৃষ্টি করেছে এক অনিন্দ্য সুন্দর ও দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি।
প্রবাসের মাটিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার এই আলোকিত অভিযাত্রা নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর করবে এবং নতুন ভূগোলে শেকড়ের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে—এমনটাই প্রত্যাশা আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের।
ছবি



































