আন্তর্জাতিক

রাজা হারাল্ডের মৃত্যুতে শোকাহত নরওয়ে, সিংহাসনে হাকন অষ্টম

নরওয়ের জনপ্রিয় রাজা হারাল্ড পঞ্চমের মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে পুরো দেশে। ৩৫ বছর সিংহাসনে থাকার পর শুক্রবার ভোরে মারা যান তিনি।

তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। তার মৃত্যুর পর ছেলে হাকন অষ্টম নরওয়ের নতুন রাজা হয়েছেন।
হারাল্ডের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানী অসলোর রাজপ্রাসাদের সামনে মানুষের ভিড় জমে। অনেকে ফুল ও জাতীয় পতাকা নিয়ে সেখানে আসেন।

প্রিয় রাজাকে হারানোর শোকে অনেকের চোখে পানি দেখা যায়। স্থানীয় সময় শুক্রবার ভোর ৬টা ৩৫ মিনিটে হারাল্ড মারা যান। আন্তর্জাতিক সময় অনুযায়ী তখন ভোর ৪টা ৩৫ মিনিট। বিরল ধরনের রক্তের সমস্যার চিকিৎসার জন্য তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

পরে হাসপাতালের প্রার্থনাকক্ষ থেকে তার কফিন শোভাযাত্রা করে রাজপ্রাসাদে নেওয়া হয়। নরওয়ের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, শেষবারের মতো রাজাকে দেখতে অসলোর রাস্তায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিলেন।

হারাল্ড পঞ্চমকে নরওয়ের একজন অন্তর্ভুক্তিমূলক, খোলামেলা ও সহানুভূতিশীল রাজা হিসেবে স্মরণ করা হচ্ছে। দেশটির রাজপরিবারকে আধুনিক করে তোলার ক্ষেত্রেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ- সবাই তার দীর্ঘদিনের সেবা এবং দেশের জন্য তিনি যে স্থিতিশীলতা তৈরি করেছিলেন, তা স্মরণ করছেন।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজপরিবারের সদস্যরাও হারাল্ডের মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসও রয়েছেন। চার্লসের মা প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ছিলেন হারাল্ডের দ্বিতীয় চাচাতো বোন। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরে নতুন রাজা হাকনের সঙ্গে দেখা করার পর রাজপ্রাসাদের বাইরে ফুল দেন এবং শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন।
স্টোরে বলেন, নরওয়ের মানুষ এখন ‘শোক ও কৃতজ্ঞতায় একত্রিত’ হয়েছে। টেলিভিশনে দেওয়া এক স্মরণসভায় তিনি বলেন, হারাল্ডের ‘উত্তরাধিকার বেঁচে থাকবে’। মন্ত্রীরাও প্রয়াত রাজাকে স্মরণ করে বক্তব্য দেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নতুন রাজা ও রানি সোনিয়ার প্রতি সমবেদনা জানান। শনিবার হারাল্ড ও রানি সোনিয়ার ৫৮তম বিবাহবার্ষিকী হওয়ার কথা ছিল। হারাল্ডের মৃত্যুতে অসলোর রাজপ্রাসাদের সামনে সাধারণ মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। ইথিওপিয়ায় জন্ম নেওয়া অসলোর বাসিন্দা বিতেয়া তেরফাসা রয়টার্সকে বলেন, তার কাছে হারাল্ড ছিলেন সবকিছু। বিশেষ করে একজন অভিবাসী হিসেবে তিনি রাজার কাছ থেকে নিজের দেশকে আপন করে নেওয়ার অনুভূতি পেয়েছেন। তেরফাসা বলেন, হারাল্ড তাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে নরওয়েই তাদের ঘর। তিনি তাদের ভালোবাসা অনুভব করিয়েছেন। এ কারণে হারাল্ডকে তার এমন এক দাদার মতো মনে হতো, যাকে তিনি কখনো পাননি।

নরওয়ের তারকা ফুটবলার এরলিং হলান্ডও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রয়াত রাজাকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, নরওয়ের জন্য হারাল্ড যা কিছু করেছেন, তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। হালান্ড আরো জানান, গ্রীষ্মের শুরুতে বিশ্বকাপের পর রাজপ্রাসাদে হারাল্ডের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়েছিল তার। সেই সাক্ষাৎকে তিনি সম্মানের বিষয় বলে উল্লেখ করেন। হারাল্ডকে সামরিক সম্মানও জানিয়েছে নরওয়ের সশস্ত্র বাহিনী। শুক্রবার দুপুরে রাজধানী অসলোর কেন্দ্রস্থলে আকরশুস দুর্গ থেকে ২১ বার তোপধ্বনি করা হয়। এরপর হাসপাতালের প্রার্থনাকক্ষ থেকে হারাল্ডের কফিন শববাহী গাড়িতে করে রাজপ্রাসাদে নেওয়া হয়। তার শেষকৃত্যের তারিখ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। এর আগে সাধারণ মানুষ যেন তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারেন, সে জন্য তার মরদেহ রাজপ্রাসাদের প্রার্থনাকক্ষে রাখা হবে। জাতীয় শোক চলাকালে পুরো নরওয়েতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। বিভিন্ন জায়গায় হারাল্ডের ছবি প্রদর্শন করা হবে এবং মোমবাতি জ্বালানো হবে। বিভিন্ন পেশাগত অনুষ্ঠানেও নীরবতা পালন করা হবে। অনেক সামাজিক অনুষ্ঠান বাতিল বা পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি অসলোর মেয়র অ্যান লিন্ডবোয়ের শুক্রবার বিয়ে হওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা পিছিয়ে দিয়েছেন।

হারাল্ডের ছোট ছেলে হাকন অষ্টম এখন নরওয়ের রাজা। তার স্ত্রী মেতে-মারিত এখন রানি। ৫৩ বছর বয়সী হাকন শুক্রবার সরকার ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে বিশেষ রাষ্ট্রীয় পরিষদের বৈঠক করেন। সেখানে তিনি রাজপরিবারের মূলমন্ত্র ‘নরওয়ের জন্য সবকিছু’ ধারণ করে নতুন দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান। আগামী মঙ্গলবার নরওয়ের পার্লামেন্টে শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে তার। এরপর তিনি একটি বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। এটি অনেকটা রাজ্যাভিষেকের সরল সংস্করণের মতো। তবে নরওয়েতে এখন আর আনুষ্ঠানিক রাজ্যাভিষেকের প্রথা নেই। হাকনের ২২ বছর বয়সী মেয়ে ইঙ্গ্রিদ আলেক্সান্দ্রা এখন সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী। শুক্রবার বাবার সঙ্গে তিনি রাজপ্রাসাদে মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করেন। ১৯৯০ সালে নরওয়েতে সিংহাসনের উত্তরাধিকারসংক্রান্ত নিয়ম পরিবর্তন করা হয়। এর ফলে পরিবারের প্রথম সন্তান মেয়ে হলেও সে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হতে পারে। সেই নিয়ম অনুযায়ী ইঙ্গ্রিদ আলেক্সান্দ্রা এখন যুবরাজ্ঞী এবং সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী।

কঠিন এক সময়ে সিংহাসনের দায়িত্ব নিয়েছেন হাকন। চলতি বছর নরওয়ের রাজপরিবারকে একাধিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও কেলেঙ্কারির মুখে পড়তে হয়েছে। বছরের শুরুতে রানি মেতে-মারিতকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। তখন জানা যায়, দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে তার তিন বছরের বন্ধুত্ব ছিল। এ ঘটনায় মেতে-মারিত প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন। পরে তিনি ফুসফুস প্রতিস্থাপন করান। ২০১৮ সাল থেকে তিনি ফুসফুসের একটি জটিল রোগে ভুগছিলেন। ফলে নতুন রাজা হিসেবে সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্ত্রী মেতে-মারিতের দেখাশোনার দায়িত্বও হাকনকে সামলাতে হবে। এদিকে মেতে-মারিতের আগের পক্ষের ছেলে মারিউস বর্গ হইবিকে জুন মাসে ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে হইবি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। হইবি রাজপরিবারের সদস্য নন। তবে হাকন যখন তার মাকে বিয়ে করেন, তখন হইবির বয়স ছিল মাত্র চার বছর। এরপর থেকেই তিনি রাজপরিবারের সঙ্গে বড় হয়েছেন।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হারাল্ডের জনপ্রিয়তা ছিল। তবে নরওয়ের রাজতন্ত্র নিয়ে মানুষের সমর্থন সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে। চলতি বছরের শুরুতে নরওয়ের সংবাদপত্র আফতেনপোস্তেনের জন্য করা এক জরিপে দেখা যায়, রাজতন্ত্রের প্রতি সমর্থন ৫৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২৪ সালে এই সমর্থন ছিল ৭২ শতাংশ। তবে নরওয়ের রাজপরিবার নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বিবিসিকে বলেছেন, নতুন রাজা হাকন নানা প্রশ্ন ও পারিবারিক সমস্যার মুখোমুখি হলেও তিনি দেশটিতে সম্মানিত একজন ব্যক্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাকন পরিশ্রমী এবং দায়িত্বশীল হিসেবে পরিচিত। তাই পরিবারকে ঘিরে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও তিনি সেগুলো সামলে সামনে এগিয়ে যেতে পারবেন বলে তারা মনে করছেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension