বাংলাদেশ

দেশের মেধা দেশে লাগাতে চায় সরকার

প্রতিবছর উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি তরুণ। তাঁদের বড় একটি অংশ পড়াশোনা শেষে দেশে না ফিরে চাকরি, গবেষণা, ব্যবসা কিংবা স্থায়ী বসতি গড়ে বিদেশেই থেকে যাচ্ছেন।

ফলে পরিবার ও রাষ্ট্রের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা মেধা ও দক্ষ মানবসম্পদের সুফল মিলছে অন্য দেশের অর্থনীতি ও জ্ঞানব্যবস্থায়। এ প্রবণতা মোকাবেলায় এবার শুধু মেধা পাচার ঠেকানোর চেষ্টা নয়, বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের মেধা দেশের কাজে লাগানোর কৌশল নিচ্ছে সরকার। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’ বা ‘মেধা আবর্তন’।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার প্রথমবারের মতো মেধা পাচারকে মেধা আবর্তনে রূপান্তরের কথা ভাবছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভিজিটিং স্কলার, যৌথ গবেষণা এবং বিদেশে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, মেধাবীরা যে কারণে দেশ ছাড়ছেন, সে কারণগুলো না বদলে শুধু দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়ে মেধার স্রোত ঘোরানো সম্ভব কি না।

ইউনেস্কোর এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন ২৪ হাজার ১১২ জন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ হাজার ৭৯৯ জনে।

এক দশকে বিদেশমুখী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১১৯ শতাংশ। শুধু ২০২২ সালেই বিদেশে গিয়েছিলেন ৪৯ হাজার ১৫১ জন। আরেক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই বছর বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজারের বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে দেশটির বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছিলেন ১৭ হাজার ৯৯ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, যা আগের শিক্ষাবর্ষের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি।

এক দশকে এ সংখ্যা বেড়েছে ২৫০ শতাংশের বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশি বেতনের পাশাপাশি উন্নত গবেষণাগার, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, পেশাগত স্বাধীনতা ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন বিদেশমুখী হওয়ার বড় কারণ।

অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী জাহিদ রহমান বলেন, সেখানে গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনে উৎসাহ দেওয়া হয়। এতে শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু করার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, একজন মেধাবী তরুণ কেন দেশ ছাড়ছেন, শুধু সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে হবে না; জানতে হবে, তিনি কেন দেশে ফিরতে চাইছেন না। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ঘাটতিও বড় সমস্যা। প্রতি বছর কতজন শিক্ষার্থী বিদেশে যাচ্ছেন, কতজন পড়াশোনা শেষে ফিরছেন এবং কতজন স্থায়ীভাবে থেকে যাচ্ছেন—এসব তথ্যের সমন্বিত ও হালনাগাদ জাতীয় ডাটাবেজ প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া শিক্ষকদের একটি বড় অংশ দেশে ফেরেন না। বিদেশে যাওয়া মেধাবীদের ফেরাতে হলে দেশে একই ধরনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চীন ও ভারত বিদেশে থাকা নিজেদের মেধাবীদের কাজে লাগাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। গবেষণা অনুদান, প্রণোদনা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সুযোগের পাশাপাশি প্রবাসী গবেষক ও পেশাজীবীদের নেটওয়ার্ক কাজে লাগাচ্ছে দেশ দুটি। বাংলাদেশও একই পথে হাঁটতে চায়। বিদেশে থাকা সবাইকে দেশে ফেরানো সম্ভব না হলেও তাঁদের জ্ঞান, পুঁজি, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দেশের কাজে লাগানোর পথ খুঁজছে সরকার।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension