
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য বড় জাতীয় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ : প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা
রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের মানবিক ও জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম।
সোমবার (২৪ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধীন সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ আয়োজিত ‘Challenges of Rohingya Repatriation: International Politics and National Priorities’ শীর্ষক সেমিনারে সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘পরিকল্পনাহীনভাবে নেওয়া এই দায় গত ৯ বছরে বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই বড় বোঝায় পরিণত হয়েছে। কক্সবাজার ও ভাসানচরের ৩৩টি ক্যাম্পে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এসব ক্যাম্পে নিরাপত্তা পরিস্থিতিরও অবনতি হচ্ছে।
’
তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পগুলোতে ছয় থেকে ১১টি সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে। ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক পাচারও অব্যাহত রয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
’
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি তুলে ধরে ড. শামছুল ইসলাম বলেন, ‘আরাকান আর্মি বর্তমানে রাজ্যটির প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।’ রোহিঙ্গাদের প্রতি আরাকান আর্মির মনোভাব মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চেয়েও কঠোর বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অতীত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে এবং নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে রোহিঙ্গা আগমন সংকট নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়ে সমাধান করা হয়েছিল। এতে প্রমাণিত হয়, ধৈর্য ও কৌশলগত দৃঢ়তার সঙ্গে কূটনীতি পরিচালনা করলে ফল পাওয়া সম্ভব।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এগোচ্ছে বলেও জানান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, ‘মানবিক দায়বদ্ধতা, জাতীয় স্বার্থ ও নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার সমন্বয়ে সরকার এ সংকট মোকাবেলা করছে।’
এ ক্ষেত্রে সরকারের ছয় দফা কৌশল তুলে ধরেন তিনি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি, চীন, ভারতসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা; চীন ও ভারতের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা; মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে পৃথকভাবে যোগাযোগ রাখা; ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা; পূর্ব সীমান্তে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং আসিয়ান-ওআইসিকে যুক্ত করে একটি আঞ্চলিক কাঠামো তৈরিতে নেতৃত্ব দেওয়া।
সেমিনারে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ১৫ আগস্ট মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ঘোষণার কথাও উল্লেখ করেন। ওই ঘোষণায় ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য যাচাই করা হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে এটিকে প্রকৃত প্রত্যাবাসনের আন্তরিক উদ্যোগ হিসেবে না দেখে আন্তর্জাতিক চাপ কমানো এবং আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান গণহত্যার মামলা মোকাবেলার কৌশল হিসেবে দেখার কথা বলেন তিনি।



