
৩০ বছর পর প্রথমবার ‘এলিয়েন টেররিস্ট’ আদালত: গ্রিন কার্ডধারী আফগান নারী বহিষ্কার
গোপন প্রমাণে বিচার নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন; জাতীয় নিরাপত্তা বনাম যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন বিতর্ক
হোসনেআরা চৌধুরী:
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির তৈরি হয়েছে। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রায় তিন দশক ধরে নিষ্ক্রিয় থাকা Alien Terrorist Removal Court (ATRC) প্রথমবারের মতো ব্যবহার করে এক আফগান গ্রিন কার্ডধারী নারীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
৪৭ বছর বয়সী নাজিরা হাজি জাদা, যিনি টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থে বসবাস করতেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন, তাকে ‘alien terrorist’ হিসেবে চিহ্নিত করে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন ইসলামিক স্টেট বা আইএস-অনুপ্রাণিত একটি গণহামলার পরিকল্পনা গোপন রাখতে তিনি তার ছেলে ও জামাতাকে সহায়তা করেছিলেন। তবে জাদার বিরুদ্ধে কোনো পৃথক ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়নি। (Reuters)
তিন দশক পর বিশেষ আদালতের প্রথম মামলা
কংগ্রেস ১৯৯৬ সালে সন্ত্রাসবাদে জড়িত বলে বিবেচিত অ-নাগরিকদের দ্রুত বহিষ্কারের জন্য Alien Terrorist Removal Court প্রতিষ্ঠা করে। আদালতটি পাঁচজন ফেডারেল বিচারক নিয়ে গঠিত।
প্রতিষ্ঠার পর আদালতটি কোনো মামলা পরিচালনা করেনি। নাজিরা হাজি জাদার মামলাটিই এর প্রথম কার্যক্রম।
এই বিশেষ আদালতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—জাতীয় নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ্যে আনা সম্ভব নয় এমন classified evidence বা গোপন তথ্যও সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
আইএস-অনুপ্রাণিত হামলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, জাদার ছেলে আবদুল্লাহ হাজি জাদা এবং জামাতা নাসির আহমাদ তাওহেদি ২০২৪ সালের নির্বাচনের দিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি আইএস-অনুপ্রাণিত গণহামলা চালানোর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
দুজনই পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি মামলায় দোষ স্বীকার করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হামলাটি বাস্তবায়নের আগেই পরিকল্পনাটি প্রতিহত করে।
সরকারের অভিযোগ ছিল, নাজিরা জাদা পরিবারের ওই কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতেন এবং তাদের কর্মকাণ্ড গোপন রাখতে সহায়তা করেছিলেন। তবে জাদাকে নিজে কোনো সন্ত্রাসবাদী অপরাধে ফৌজদারি অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়নি। (Reuters)
গোপন প্রমাণ নিয়ে বড় প্রশ্ন
মামলাটির সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো classified evidence-এর ব্যবহার।
সরকারের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু তথ্য প্রকাশ্যে আনা সম্ভব নয়। ফলে এই বিশেষ আদালতের কাঠামোতে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা তার আইনজীবীরা সরকারের ব্যবহৃত সব গোপন প্রমাণ সরাসরি পর্যালোচনা করতে পারেন না।
জাদার আইনজীবীরা এই ব্যবস্থার তীব্র আপত্তি জানান। তাদের বক্তব্য, একজন lawful permanent resident বা গ্রিন কার্ডধারীর বিরুদ্ধে গুরুতর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত প্রমাণের একটি অংশ দেখতে না দেওয়া due process, অর্থাৎ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মৌলিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। (The Washington Post)
প্রতিরক্ষা পক্ষের সাংবিধানিক আপত্তি
জাদার আইনজীবীরা দাবি করেছেন, বহিষ্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সুযোগ থাকলেও গোপন প্রমাণের কারণে তাদের মক্কেলের আত্মপক্ষ সমর্থনের সক্ষমতা সীমিত ছিল।
তারা আরও স্পষ্ট করেছেন, জাদা শেষ পর্যন্ত বহিষ্কারে সম্মতি দিয়েছেন বলে এটিকে Alien Terrorist Removal Court-এর বৈধতার প্রতি তার সমর্থন হিসেবে দেখা উচিত নয়।
গ্রিন কার্ডধারীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
এই মামলার গুরুত্ব শুধু একজন আফগান নারীর বহিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাজিরা জাদা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা, অর্থাৎ গ্রিন কার্ডধারী।
ফলে মামলাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—
জাতীয় নিরাপত্তার অভিযোগে একজন বৈধ স্থায়ী বাসিন্দাকে কতটা গোপন প্রমাণের ভিত্তিতে একটি বিশেষ আদালতের মাধ্যমে বহিষ্কার করা যাবে?
আরও বড় প্রশ্ন হলো, এমন প্রক্রিয়ায় একজন গ্রিন কার্ডধারীর আত্মপক্ষ সমর্থনের সাংবিধানিক অধিকার কতটা কার্যকরভাবে সুরক্ষিত থাকবে।
ভবিষ্যতে একই আদালত আবার ব্যবহার করা হলে এই প্রশ্ন অন্যান্য অ-নাগরিক ও গ্রিন কার্ডধারীদের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত বহিষ্কারে সম্মতি
দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে নাজিরা হাজি জাদা শেষ পর্যন্ত নিজেকে ‘alien terrorist’ হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি মেনে নেন এবং বহিষ্কারের বিরুদ্ধে আপিলের অধিকার ত্যাগ করেন।
২০ আগস্ট আদালত তার বহিষ্কারের আদেশ অনুমোদন করে। পরে তাকে আফগানিস্তানে পাঠানো হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে পুনরায় প্রবেশের ক্ষেত্রে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। (Reuters)
সরকার বলছে জাতীয় নিরাপত্তার সাফল্য
অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ মামলাটিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সরকারের অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে—এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান সব আইনগত ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে।
অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা পক্ষের মূল প্রশ্ন—
জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গোপন প্রমাণ ব্যবহারের সুযোগ কি একজন বৈধ স্থায়ী বাসিন্দার সাংবিধানিক অধিকারকে সীমিত করার পর্যায়ে যেতে পারে?
নতুন নজির, নাকি নতুন আইনি লড়াই?
প্রথম মামলাটি বহিষ্কারে সম্মতির মাধ্যমে শেষ হওয়ায় Alien Terrorist Removal Court-এর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিচারিক পরীক্ষা এখনো হয়নি।
তবে তিন দশক ধরে নিষ্ক্রিয় থাকা এই আদালতের প্রথম ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষমতা এবং একজন অ-নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কোথায় থাকবে, ভবিষ্যতে এই আদালতের ব্যবহার সেই প্রশ্নেরই বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।



