
সবজির বাজারে স্বস্তি মিললেও অস্থির নিত্যপণ্যের দাম, দিশাহারা ক্রেতারা
সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে সরবরাহ বাড়ায় সবজির দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে মাছের দাম কমেনি। একই সঙ্গে চড়া ইলিশের বাজার। অন্যদিকে এক মাসে আটা-ময়দার খুচরা দাম বেড়েছে। আর উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় মুরগি ও ডিমের দামও কমছে না। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মিলছে না সাধারণ মানুষের। নিত্যপণ্যের বাজারে লাগামহীন দামের কারণে দিশাহারা মানুষ। সংসারের খরচ সামলাতে একের পর এক প্রয়োজনীয় ব্যয় ছাঁটাই করছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। খাবারের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে প্রয়োজনীয় আমিষ।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, খিলক্ষেত কাঁচাবাজার ও মগবাজার কাঁচাবাজার ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব কথা জানা যায়।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনন্দিন বাজারদরের তথ্যেও আটা-ময়দার দাম বাড়ার চিত্র রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, গত এক মাসে খোলা আটার দাম কেজিতে ৩ টাকা এবং খোলা ও মোড়কজাত ময়দার দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়েছে।
তবে খুচরা বাজারে দাম বেড়েছে আরও বেশি। রাজধানীর তিন বাজারের মুদিদোকানগুলোয় প্রতি কেজি খোলা আটা ৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। এক মাস আগে যা ছিল ৪৫ টাকা। খোলা ময়দার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়। মাসখানেক আগে এ দাম ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা।
বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোড়কজাত ময়দার দামও বেড়েছে। বর্তমানে দুই কেজির এক প্যাকেট ময়দা ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কেজিপ্রতি দাম পড়ছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা। এক মাস আগে এক কেজি মোড়কজাত ময়দা বিক্রি হয়েছে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায়।
কারওয়ান বাজারের মুদি দোকানি জানান, ‘আগে ৫০ কেজির এক বস্তা ময়দা দুই হাজার ৫০০ টাকায় কিনেছি। গত সপ্তাহে দাম বেড়ে হয়েছে দুই হাজার ৮০০ টাকা। পাইকারি ও ডিলার পর্যায়ে আটা-ময়দার দাম বেড়েছে। ফলে আমাকেও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’
এদিকে আটা-ময়দাসহ অন্যান্য কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে সম্প্রতি বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। পরে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ী নেতাদের বৈঠকে বেকারি পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের খরচ যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর রুটি ও বিস্কুটের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
বাজারে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দামও বাড়তি। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেড় মাস আগে এর দাম কেজিতে প্রায় ২০ টাকা কম ছিল। এর আগে অবশ্য ব্রয়লারের দাম ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা কেজিতেও নেমেছিল।
ফার্মের বাদামি রঙের ডিমের এক ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। সাদা ডিম পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১০ টাকা কমে। এ ছাড়া সোনালি মুরগি প্রতি কেজি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা এবং হাইব্রিড বা কালারবার্ড সোনালি ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতাদের দাবি, গত কয়েক মাসে বন্যা, অতিবৃষ্টি ও অতিরিক্ত গরমের কারণে অনেক খামারে ডিম উৎপাদন এবং ব্রয়লার মুরগির সংখ্যা কমেছে। এতে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ায় মুরগি ও ডিমের দাম কমছে না।
মুরগি-ডিমের পাশাপাশি মাছের বাজারেও খুব একটা স্বস্তি নেই। আড়াই থেকে তিন কেজি ওজনের রুই মাছ প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৪২০ টাকা এবং কাতলা ৪২০ থেকে ৪৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
আকারভেদে চাষের পাঙাশ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা এবং পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
তবে অন্যান্য নিত্যপণ্যের তুলনায় সবজির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। বিক্রেতারা জানান, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় সবজির দাম মোটামুটি আগের অবস্থায় রয়েছে। ফলে আটা-ময়দা, মুরগি, ডিম ও মাছের বাড়তি দামের মধ্যে সবজিই আপাতত তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
মালিবাগের বাসিন্দা সরকারি কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, একসময় ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে বাইরে বের হওয়া, রেস্তোরাঁয় খাওয়া কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া একটি স্বাভাবিক বিনোদনের অংশ ছিল। এখন বাড়তি ব্যয়ের ভয়ে এসব থেকেও দূরে থাকতে হচ্ছে। পরিবার নিয়ে বাইরে বের হলেই যাতায়াত, খাবার ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে কয়েক হাজার টাকা ব্যয় হয়ে যায়। মাসের শেষদিকে সেই অর্থটুকুও বড় হয়ে দেখা দেয়। তাই আনন্দের মুহূর্তগুলোও কাটছে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে।
ভোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন কেনাকাটার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ও বিলাসিতার মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি হয়েছে। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, ঘরের সাজসজ্জা কিংবা অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কমিয়ে দিয়েছেন অনেকে। পুরোনো পণ্য যতদিন সম্ভব ব্যবহার করছেন।
বেসরকারি একটি ফার্মের চাকরিজীবী মিজানুর রহমান জানান, আগে মাসে অন্তত একবার পরিবার নিয়ে বাইরে খেতে যেতেন। এখন সেটিও বন্ধ। পোশাক কেনাকাটা ঈদকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। তিনি বলেন, সন্তানদের আবদার থাকলেও সব পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।



