প্রধান খবরবাংলাদেশ

দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব – টিআইবি

 

জাকির হোসেন  রূপসী বাংলা ঢাকা ডেস্ক:  ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার ও শুদ্ধাচার’ শীর্ষক গবেষনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দশ  বছরে সুশাসন ও শুদ্ধাচার সম্পর্কিত নীতি কাঠামো অনেক সুদৃঢ় হয়েছে। অঙ্গীকারের সঙ্গে বাস্তবায়নের ফারাক অনেক। তারপরও বিশ্লেষণে কিছু ইতিবাচক বিষয় পাওয়া গেছে। কিন্তু যেসব নীতি ও কৌশল প্রণয়ণ করা হয়েছে সেটাতেও ঘাটতি আছে।

এদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখরুজ্জামান বলেন, নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশন করে না। এতে বড় ভূমিকা রাজনৈতিক দলগুলোর। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছাই সুষ্ঠু নির্বাচনের বড় নিয়ামক। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দল ও সব অংশীজনের মধ্যে আস্থাহীনতা রয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ‘নির্বাচন করা অসম্ভব।’ নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল ও অংশীজনেরা সবাই যার যার ভূমিকা পালন করলে তা সম্ভব।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে যত নির্বাচন হয়েছে তার সবগুলোই যে বিতর্কিত ছিল তা বলা যাবে না। যে কয়েকটা নির্বাচন ভালো হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো চেয়েছে বলে তা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, নির্দলীয় সরকারের বিষয়ে বর্তমানে সাংবিধানিক যে অবস্থান রয়েছে সেটা একটি বাস্তবতা। আবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে আস্থাহীনতার বিষয়টিও একটি বাস্তবতা।

‘রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে সুশাসন ও শুদ্ধাচার’ শীর্ষক এক কার্যপত্র প্রকাশ উপলক্ষে  আজ টিআইবির ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। সংসদে সরকারি দলের একচ্ছত্র ভূমিকার চর্চা নিরুৎসাহিত করতে বৈধ ও আগ্রহী সকল দলের কার্যকর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও নির্বাচিত সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের পাশাপাশি দলীয় প্রধান, সরকার প্রধান ও সংসদ নেতা একই ব্যক্তি হবেন না- এমন অঙ্গীকারসহ সুশাসন ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক বেশ কিছু অঙ্গীকার নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর বিবেচনার জন্য সুপারিশ করেছে টিআইবি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

কার্যপত্রটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম। গবেষক দলের অপর তিন সদস্য গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার জুলিয়েট রোজেটি, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাহিদ শারমীন ও মো. শহিদুল ইসলাম এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

গবেষনার পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনসমূহে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া নির্বাচনী ইশতেহারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারসমূহের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পূরণ হলেও কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠা, ন্যায়পাল নিয়োগ, ‘কালো আইন’ বাতিল, জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত রেডিও ও টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার মতো সুশাসন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ অনেক অঙ্গীকার কখনওই পূরণ করা হয় নি। এছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বেশিরভাগ দলের অনেক অঙ্গীকার থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়নে দলগুলোর নির্দিষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতি লক্ষণীয়। একই সাথে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরিপন্থী বাক-স্বাধীনতা ও মানবাধিকার ক্ষুন্ন করার মতো বিতর্কিত বা নিয়ন্ত্রণমূলক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।

১৯৭০ এর নির্বাচনসহ স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে প্রথম থেকে দশম সংসদ নির্বাচনে ঘোষিত ইশতেহারে সুশাসন ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার ও তার প্রেক্ষিতে বাস্তবতা পর্যালোচনা এবং আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সুশাসন ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকার সংক্রান্ত সুপারিশ প্রস্তাবের উদ্দেশ্যে এ কার্যপত্রটি প্রণীত হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে সংগৃহীত ইশতেহারসমূহের পর্যালোচনা ছাড়াও প্রকাশিত বই, প্রবন্ধ, সংবাদ ও সংবাদ পর্যালোচনা থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ, গবেষক, সাবেক নির্বাচন কমিশনার, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও সংবাদমাধ্যম কর্মীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে।

কার্যপত্রে বলা হয়, সংসদ নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া ইশতেহারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার দেশের প্রেক্ষাপটের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। যেমন প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা, নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা এবং দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা মূল অঙ্গীকার হলেও   তৃতীয় সংসদ নির্বাচন অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনসমূহে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, স্বাধীন বিচার বিভাগ, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকার লক্ষণীয়।

আরও পরে ১৯৯০-এর দশকে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা; দলীয় প্রভাব ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন; স্বাধীন বিচার বিভাগ; স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্রীয় রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্র; সব নাগরিকের সমান অধিকার খর্ব করে এমন আইন বাতিল প্রভৃতি অঙ্গীকার লক্ষণীয়। প্রধানত সপ্তম সংসদ নির্বাচনের সময় থেকে বেশিরভাগ দলের ইশতেহারে দুর্নীতি দমন ও সুশাসন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার দেখা যায়, যার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে স্বাধীন দুর্নীতি দমন সংস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার থাকলেও বিপরীতে দুর্নীতির আরও ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বেশিরভাগ দলের বিশেষ কয়েকটি অঙ্গীকারের পুনরাবৃত্তি লক্ষণীয়, যেমন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র ন্যায়পাল নিয়োগের অঙ্গীকার, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির ‘কালো আইন’ বাতিলের অঙ্গীকার, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অঙ্গীকার, বিএনপি’র জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ ও গ্রাম সরকার প্রবর্তনের অঙ্গীকার এবং জাতীয় পার্টির উপজেলা আদালত ও প্রাদেশিক সরকার গঠনের অঙ্গীকার।

অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়নে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রেক্ষিতে প্রথম হিসেবে আগামী সংসদ নির্বাচন বেশি গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা আশা করি, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলো টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের সার্বিক প্রতিফলন, বিশেষ করে অভীষ্ট ১৬ এ সুনির্দিষ্টভাবে অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটিয়ে সুশাসন, সকল স্তরে স্বচ্ছ, কার্যকর ও দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠানের বিকাশ, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কাউকে পেছনে না রেখে উন্নয়ন, মত ও তথ্য প্রকাশের স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়সমূহ নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করবে।’

নির্বাচনী ইশতেহারে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া অঙ্গীকারসমূহের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বাস্তবায়িত হলেও প্রদত্ত অঙ্গীকার ও তা বাস্তবায়নের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান লক্ষণীয় উল্লেখ করে ড. জামান বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জনও বাস্তবে অর্থবহ হয় না, কারণ যে সকল আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতি পরিবর্তন হয়েছে তার কার্যকরতা নিশ্চিতে ঘাটতি অব্যাহত থাকছে। এমন কি কোন কোন ক্ষেত্রে অর্জিত ইতিবাচক পরিবর্তনকে অর্থহীন করে দেওয়া হয় বিপরীতমুখী সংস্কারের মাধ্যমে। খসড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কোন কোন ধারা যেমন তথ্য অধিকার আইনের সাথে সাংঘর্ষিক, তেমনি নিবর্তনমূলক হচ্ছে খসড়া পাবলিক সার্ভিক অ্যাক্ট এর সংশ্লিষ্ট ধারা, যার মাধ্যমে দুদকের ক্ষমতা আরও খর্ব করার প্রয়াস করা হচ্ছে। দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ব্যক্তির পরিচয় ও অবস্থানের ঊর্ধ্বে থেকে পদক্ষেপ গ্রহণের পরিবেশ সৃষ্টির অঙ্গীকার নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর বিবেচনার জন্য উত্থাপিত সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ সরকার গঠনকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দল কর্তৃক পূর্ববর্তী নির্বাচনে দেওয়া অঙ্গীকার কতটুকু পূরণ করেছে সে সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ;

নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন না করতে পারলেও বিরোধী দল হিসেবে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কী ভূমিকা থাকবে তা ইশতেহারে স্পষ্ট করা;

প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্র অনুসরণ করে কর্মপরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন এবং প্রতিবছর তা পর্যালোচনা করা;

এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে গণতন্ত্র ও সুশাসনের বিদ্যমান ঘাটতি পূরণে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারসহ এসব অঙ্গীকার কিভাবে বাস্তবায়িত হবে তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রদান।

এছাড়াও বিরোধী দলকে সংসদীয় কার্যক্রমে আরও বেশি অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া যেমন- ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ, সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটিসহ এক-তৃতীয়াংশ কমিটিতে বিরোধীদলীয় সদস্যকে সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন; সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি; দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সব সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, কমিশনার ও সদস্যসহ সকল নিয়োগ এবং নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, গোষ্ঠীস্বার্থ এবং দলীয় রাজনৈতিক বিবেচনা পরিহার করা ও প্রয়োজনে সংস্কারের সুপারিশ করা হয়।

অপর সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় পেশাদারী উৎকর্ষ ও কার্যকরতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি সমন্বিত ও পরিপূরক কৌশল গ্রহণ এবং সকল অংশীজনের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করা;

কেবলমাত্র যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে জনপ্রশাসনে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন করা; প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ, প্রশাসনসহ সকল সরকারি খাতে আধুনিক কর্মী মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রণোদনা নিশ্চিত করা; পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের প্রতি বৈষম্যমূলক সব আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কার করা; তথ্যের অভিগম্যতাকে বাধাগ্রস্ত করে এমন কোনো আইন প্রণয়ন না করা; এবং তথ্য অধিকার আইনবিরোধী এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পরিপন্থী বিভিন্ন নিবর্তনমূলক উপধারা বাতিল করা।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension