বাংলাদেশ

ক্রসফায়ারের বক্তব্যে আইজিপির অপসারণ চায় টিআইবি

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে ব্যবহারের চেষ্টা করছেন পুলিশপ্রধান। সরকারের অনুমতি নিয়ে ক্রসফায়ারের কথা বলে তিনি বিপজ্জনক বার্তা দিয়েছেন।

এমন বক্তব্য প্রত্যাহার, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহি না হওয়া পর্যন্ত আইজিপিকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

সোমবার এক বিবৃতিতে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ জানিয়ে এ দাবি জানায় সংস্থাটি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেদের ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে পুলিশপ্রধান কি ঘৃণিত ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চাইছেন? সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার পথ খোঁজা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি নয় কি?

তিনি বলেন, পুলিশের দায়িত্ব পেশাদার তদন্ত, অপরাধী শনাক্ত করা এবং গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করা। এর বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ারকে সামনে আনা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধান নয়, বরং পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন। এ দুটি অবস্থান সাংঘর্ষিক। কোনো সরকারের অনুমতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দিতে পারে না। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না।

অতীতের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সিনহা হত্যা মামলায় পুলিশ সদস্যদের দণ্ড, টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হকের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় পরিবারের প্রকাশিত অডিও এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় র‍্যাব কর্মকর্তাদের দণ্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারের ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেয়। এসব ঘটনার পরও পুলিশপ্রধানের বক্তব্য প্রশ্ন তুলেছে, অতীতের অপরাধ থেকে পুলিশ কী শিক্ষা নিয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, পুলিশপ্রধানের এমন বেপরোয়া ও অপরিণামদর্শী বক্তব্য মাঠপর্যায়ে বেআইনি বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যার দায়িত্ব বাহিনীকে আইনের মধ্যে থেকে পরিচালনা করা, তিনিই ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনলে তাঁর দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বিবৃতিতে গত ১৪ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রীর বক্তব্যও স্মরণ করিয়ে দেয় টিআইবি। ওই দিন আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সরকার সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের পথে যাবে না এবং বিদ্যমান আইন দিয়েই সন্ত্রাস দমন সম্ভব। এমন অবস্থানের পরও আইজিপি কেন সরকারের অনুমতিসাপেক্ষে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা সামনে আনছেন, তার ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

টিআইবি বলেছে, পুলিশের বলপ্রয়োগ অবশ্যই আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, জীবন রক্ষায় কঠোরভাবে অনিবার্য পরিস্থিতি ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্রের ইচ্ছাকৃত প্রাণঘাতী ব্যবহার গ্রহণযোগ্য নয়। এ সীমিত সুযোগকে বিচারবহির্ভূত হত্যার অনুমোদন হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অর্থ না পেয়ে পুলিশের সমালোচনা করার অভিযোগ প্রসঙ্গে টিআইবি বলেছে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢালাও অভিযোগ মুক্ত গণমাধ্যমের নজরদারি ও জবাবদিহির ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।

বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গ্রহণ, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া, বক্তব্য প্রত্যাহার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবিও জানিয়েছে সংস্থাটি।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension