Uncategorized

‘সহমরণ’- সেকাল থেকে একাল

সাজিয়া আফরিন 

স্বামী নামের মানুষটার সাথে যখন তার সখ্যতা হয় নি, তখনও শুধু মনে পরে সানাই আর বাদ্যিতে পুরো বাড়ি উৎসব উৎসব; আর ঐ অনেক বড় মানুষটার পাশে তাকে বসিয়ে অনেক মন্ত্র পাঠ হয়েছিল সেই রাতে। ঘুম ঘুম চোখে হয়েছিল মালা বদল আর শুভদৃষ্টি।

তারপর ছোট্ট মেয়ে মালতী,শ্বশুর বাড়িতে শাঁখা সিঁদুর আর আলতা পায়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াত । মাঝে মাঝে পেয়ারা গাছে উঠে পড়ত,বড়রা ছি ছি বলে জিভ কাটত আর জায়েরা আঁচলে মুখ লুকিয়ে হাসতে হাসতে নামিয়ে নিত। কিন্তু আজ সেই বাড়িতে কান্না আর কষ্টের বন্যা। মালতীর ‘স্বামী’ নামক মানুষটা মারা গেছে।

মালতীকে সবাই আজ খুব সমীহ করছে, কারণ শবযাত্রার সাথে মালতীকে যেতে হবে, এটাই নিয়ম। মালতীও দু একবার শুনেছে এই প্রথার কথা ‘স্বামীর সাথে স্বর্গ যাত্রা।’ সেই নিয়ম অনুসারে প্রথম আর শেষবারের মত স্বামী নামক লোকটার পাশে তার বিছানা হবে আজ। পাশাপাশি সাজানো দুই চিতা। চিতায় কাঠের মাঝে চন্দন কাঠও আছে। একসাথে তাদের দুইজনের আজ স্বর্গযাত্রা। আর তবেই না সে সতীসাদ্ধী নারী।

মালতী চিতায় উঠে স্বর্গে গেছে ঠিকই কিন্তু কেউ তার প্রশ্নভরা চাউনি পড়তে পারে নি,তার আত্ম চিৎকার সেদিন কেউ শোনে নি। সবাই ব্যস্ত তাকে স্বর্গে পাঠাতে।

যাকে সে কখনই কাছ থেকে দেখে নি,যে মেয়েটা বুঝেই ওঠে নি বিয়ে,স্বামী সংসার নামের বিষয়গুলো, তাকে কিনা তার স্বামীর সাথে সহমরণে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে প্রথা নামক নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে।

বাবার অভাবের ঘরে জন্ম বিলকিসের। পিঠাপিঠি আরও ভাইবোন। ছোট বয়েসেই একটু বাড়ন্ত শরীর, দেখতেও খারাপ না। বারো না পেরুতেই বিয়ের প্রস্তাব। দিনমজুর বাবা মেয়েকে পার করতে পারলে যেনো একটু হাফ ছেড়ে বাঁচে। কিন্তু ছেলে পক্ষের চাওয়া যৌতুক দেওয়ার সামর্থ্য নাই। তাই বিনা যৌতুকে পঁয়তাল্লিশ পেরুনো গফুরের সাথে বিলকিসের বিয়ে। বিয়ের পর বয়সের পার্থক্য, মানসিক অমিল আর স্বামীর শারীরিক সমস্যা বিলকিসকে দিশেহারা করে দেয়। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই শুনেছে বিয়ে মেয়েদের একবারই হয়। তাই নিজের চাওয়া পাওয়া ত্যাগ করে গফুরকেই তার জীবন মরণের সাথী ভেবে নিয়েছে বিলকিস।

আর শেফালী? সেতো বিয়ের পরই জেনেছে রহিমের সমস্যার কথা,যার কারণে সে এখনও মা হতে পারে নি; পারবেও না। শেফালী তার মাতৃত্বের স্বাদ নিতে পারে নি রহিমের কারণে তবুও স্বামী, সংসার আঁকড়ে আছে।

মালতী, শেফালী আর বিলকিস দুই সময়ের সহমরণ মেনে নেওয়া চরিত্র। কেউ নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে জলন্ত চিতায় উঠেছে স্বামীর সাথে, আর কেউ নিজের আত্মাকে বাঁচিয়ে রেখে নিজের চাওয়া পাওয়া আর নিজ সত্ত্বা ত্যাগ করেছে। সবকালেই নিরবে সহমরণ মেনে নিচ্ছে আমাদের বিলকিস, শেফালী আর মালতীরা।

কিন্তু এই মেনে নেওয়া যুগে যুগে শুধু মেয়েদের বেলাতেই কেন?!

( ১৮১৩ সালে আইন করা হয় ১৬ বছরের নিচে কোন বিধবা সহমরণে যেতে পারবে না। তার আগে সববয়সী বিধবারাই সহমরণে যেত; কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ অন্যের ইচ্ছায়)

 

সাজিয়া আফরিনঃ উদ্যোক্তা, সমাজকর্মী।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension