প্রধান খবরবাংলাদেশরাজনীতি

আজ ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনের ৬২ বছরপূর্তি

আজ ৬ ফেব্রুয়ারি ইতিহাসের অনন্য দলিল মজলুম মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনের ৬২ বছরপূর্তি। এই সম্মেলনে ভাসানী পাকিস্তানী শাসকদের হুশিয়ার করে বলেন, যদি পূর্ব পাকিস্তানে শোষণ অব্যাহত থাকে তবে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানাতে বাধ্য হবেন।

স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এমন এক জীবন রেখে গেছেন, তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে অন্য কোনও নেতার তুলনা আনতে হয় না। তার সময়ে কিংবা তার আগে-পরে যত নেতা এসেছেন, মওলানা ভাসানী সবার থেকেই আলাদা এক চরিত্র। কিংবা বলা যেতে পারে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আদর্শিক জগৎ। যেখানে মিলবে না মহাত্মা গান্ধী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, সুভাষ চন্দ্র বসু অথবা জয়প্রকাশ নারায়ণের মতো কোনো চরিত্র।

ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম এ তৃণমূল রাজনীতিবিদ ও গণআন্দোলনের মহানায়ক ১৯৫৭ সালের ৬-১০ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার কাগমারীতে আহ্বান করেছিলেন ‘আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন’ ও ‘পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলন’। কাগমারী সম্মেলন বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক, যাকে এড়িয়ে অন্য কোনও পথে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস এগুতে পারে না।

মজলুম মানুষের পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠ মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য যে জীবন ব্যয় করেছিলেন, আজ কিংবা আগামীর সব স্বপ্নদ্রষ্টার জন্য সে জীবন অনুসৃত হয়ে থাকবে ব্যতিক্রম স্বপ্নযাত্রায়। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানঘড়া পল্লীতে জন্ম গ্রহণ করেন।

টাঙ্গাইল জেলার কাগমারিতে ১৯৫৭ সালের ৬-১০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন। ৭ ফেব্রুয়ারি কাউন্সিল অধিবেশনে মূল আলোচ্যসূচি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন এবং জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি। কিন্তু সিয়াটো ও সেন্টোর সামরিক চুক্তির প্রতি আওয়ামী লীগ নেতা ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করলে সম্মেলনে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রণ্ট নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোর একুশ দফা প্রতিশ্রুতির অন্যতম ছিল জোটনিরপেক্ষ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। সোহরাওয়ার্দীর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বক্তব্য আওয়ামী লীগের বামপন্থী নেতৃবৃন্দ সমর্থন করেন নি। করতে পারেন নি। এদের পুরোধা ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি (সম্মেলনেরও সভাপতি) মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আওয়ামী লীগের আইনসভার সদস্য ও নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে কাউন্সিল অধিবেশনে মওলানা ভাসানী সোহরাওয়ার্দীর অনুসৃত সামরিক জোটের সমালোচনা করেন। ওই ভাষণে মওলানা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন। সোহরাওয়ার্দী সামরিক জোটের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেন। তিনি পাকিস্তান স্বাক্ষরিত সামরিক চুক্তি এবং কেন্দ্র কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানে আরোপিত অর্থনৈতিক নীতিমালার পক্ষেও রায় দেন।

এখানেই আওয়ামী লীগ আদর্শিক কারণে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে মওলানা ভাসানী নিজের হাতে গড়া রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন।

কবি গবেষক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ তার ‘কাগমারী সম্মেলন : মওলানা ভাসানীর পূর্ব বাংলার স্বাধিকার ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম’ বইতে লিখেছেন, পূর্ববাংলা, পশ্চিম পাকিস্তান, ভারত এবং অন্যান্য দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের উচ্ছ্বসিত অংশগ্রহণে মওলানা ভাসানী যে সাংস্কৃতিক সম্মেলন সফল করেছিলেন সেদিন, বাংলার ইতিহাসেের আগে বা পরে এ রকম মেধা ও বুদ্ধিমত্তার লড়াই আজ পর্যন্ত কেউ দেখাতে পারে নি।

সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন, কাগমারী সম্মেলনের পর ভাসানীর পক্ষে আর আওয়ামী লীগে থাকা সম্ভব হয় নি, যদিও দলের কেন্দ্রীয় নেতারা চান নি তিনি দল ছেড়ে চলে যান। তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, যদিও তাকে পদত্যাগ না করতে তার স্নেহভাজন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান বিশেষভাবে পীড়াপীড়ি করেন।

কাগমারী সম্মেলনের এক ফাঁকে মওলানা ভাসানী গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলেছিলেন- ‘পূর্ব বাংলা একদিন স্বাধীন হবেই। ১২ বছরের মধ্যে পূর্ব বাংলা পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবে।’ আজকের স্বাধীন বাংলা ভাসানীর সেই উচ্চারণের বাস্তব ফসল।

ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির বিরোধিতা করেন। সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে মওলানা ভাসানী শেষ পর্যায়ে রেগে উঠে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘শহীদ, তুমি আজ আমাকে পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি সমর্থন করতে বলছো। তুমি যদি আমাকে বন্দুকের নলের সামনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাস কর, আমি বলব, ‘না’! তুমি যদি আমাকে কামানের সামনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসা কর আমি বলব ‘না না’! তুমি আমাকে যদি আমার কবরে গিয়েও জিজ্ঞাসা কর সেখান থেকে আমি চিৎকার করে বলবো, ‘না না’!’

এই সভায় মওলানা ভাসানী তাঁর বক্তৃতায় অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে বলেন, পূর্ববাংলা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের দ্বারা শোষিত হতে থাকলে পূর্ববঙ্গবাসী তাদের সালামু আলায়কুম জানাতে বাধ্য হবে। এছাড়া কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিলের দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে ১৮ই মার্চ আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছর ২৫শে জুলাই তার নেতৃত্বে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হয়। ন্যাপ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভাসানী প্রকাশ্যে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং এরপর থেকে বামধারার রাজনীতির সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯৫৭’র ৭ অক্টোবর দেশে সামরিক শাসন জারি হলে আইয়ুব খান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সকল রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১২ই অক্টোবর মাওলানা ভাসানীকে কুমুদিনী হাসপাতাল থেকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকায় ৪ বছর ১০ মাস কারারুদ্ধ থাকেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension