অগ্নিঝরা মার্চমুক্তিযুদ্ধস্বাধীনতা

প্রতিরোধ দিবস পালন ক্যান্টনমেন্টে জেনারেল ইয়াহিয়ার বৈঠক

জাকির হোসেন

আজ ২৩ মার্চ, একাত্তরের একটি অগ্নিঝরা দিন। এ দিন পূর্ব বাংলার কোথাও পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা ওড়েনি। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্রলীগ আনুষ্ঠানিকভাবে এদিন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের কবর রচনা করে। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চের লাহোর প্রস্তাবের স্মরণে পাকিস্তানের জাতীয় দিবস ‘পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবস’ প্রত্যাখ্যান করে এদিন স্বাধীন কেন্দ্রীয় বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পূর্ব বাংলায় জাতীয়ভাবে ‘প্রতিরোধ দিবস’ পালন করে। অন্যদিকে এইদিন ন্যাপ (ভাসানী) ‘স্বাধীন পূর্ব বাংলা’ দিবস পালন করে। ‘প্রতিরোধ দিবস’ ও ‘স্বাধীন পূর্ব বাংলা’ উপলক্ষে এদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয় অসংখ্য মিছিল, সশস্ত্র কুজকাওয়াজ। সভা ও সমাবেশে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয় মুক্তি সংগ্রামের দুর্জয় শপথ।
 
স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্রলীগের তত্ত্বাবধায়নে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যে গঠিত ‘জয় বাংলা বাহিনী’ এদিন পল্টন ময়দানে লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে পূর্ণ সামরিক কায়দায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। ‘জয় বাংলা বাহিনী’র প্রধান কামরুল আলম খান খসরুর (পরবর্তীতে ‘ওরা ১১ জন’ চলচ্চিত্রের অভিনেতা) .২২ বোর রাইফেলের ‘গান স্যালুট’-এর সঙ্গে ‘জয় বাংলা বাহিনী’র উপ প্রধান হাসানুল হক ইনু (বর্তমানে জাসদ সভাপতি ও সংসদ সদস্য) আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ‘জয় বাংলা বাহিনী’র নারী ও পুরুষ কন্টিজেন্টের সদস্যরা নকল রাইফেল নিয়ে মার্চ পাস্ট করে পতাকার প্রতি সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানান। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতা আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাজাহান সিরাজ মার্চ পাস্টে অভিবাদন গ্রহণ করেন। এ সময় মাইকে বেজে ওঠে ‘আমার সোনার বাংলা’। এরপর ‘জয় বাংলা বাহিনী’ রাজপথে সামরিক কায়দায় মার্চ পাস্ট করে ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যায়। সেখানে বঙ্গবন্ধুর হাতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তুলে দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু পতাকাটি নিজ বাসভবনে উত্তোলন করেন।
 
পাকিস্তান প্রস্তাবের ৩১তম দিবসে এদিন রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের সর্বত্র গাঢ় সবুজ জমিনে লাল বৃত্তের মধ্যে বাংলাদেশের সোনালী মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়। সংগ্রামের সূতিকাগার রাজধানী ঢাকা নগরী এদিন পতাকার নগরীতে পরিনত হয়। শহরের প্রতিটি যানবাহন, দোকানপাট, সরকারি-আধাসরকারি-বেসরকারি ভবন এবং ঘরে ঘরে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ ছাড়া সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, বেতার কেন্দ্র, বিএনআর, জিপিও ভবন এবং কতিপয় বিদেশী দূতাবাসেও স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। এমনি কি পিপিপি চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকার যে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান নিয়েছিলেন সেখানেও স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ানো হয়।
 
বিদ্রোহী বাংলার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদিন ভোর পাঁচটায় নিজ বাসভবনের শীর্ষে ‘বাংলাদেশের পতাকা’ উত্তোলনের মাধ্যমে প্রতিরোধ দিবসের সূচনা করেন। এ উপলক্ষে নিজ বাসভবনে আগত জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমরা রক্ত দিতে প্রস্তুত রয়েছি। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি আত্মার একটি আত্মাও জীবিত থাকা পর্যন্ত দাবি আদায়ের সংগ্রাম চলবে।’ দেশবাসীর উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সংগ্রাম পরিচালনার দায়িত্ব আমার উপর ন্যাস্ত করতে হবে। সেই ভালো সিপাহসালার যিনি কম রক্তপাতে সফলতা অর্জন করতে পারেন। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে এদিন ঢাকা টেলিভিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টেলিভিশন সম্প্রচার বন্ধ করে দেন, যাতে পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শন করতে না হয়। রেডিওতে বারবার জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাজানো হয়।
 
এদিন বিকালে পশ্চিম পাকিস্তানের ছয়জন পার্লামেন্টারী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে প্রায় নব্বই মিনিট বৈঠক করেন। এ ছয় নেতা হচ্ছেন কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান মিয়া মমতাজ দৌলতানা, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান খান আবদুল ওয়ালী খান, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম প্রধান মাওলানা শাহ আহমেদ নূরানী, পশ্চিম পাকিস্তান ন্যাপের সাধারণ সম্পদক গাউস বখশ বেজেঞ্জো, পাঞ্জাব কাউন্সিল লীগের সভাপতি সরদার শওকত হায়াত এবং জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুফতি মাহমুদ। এ বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খোন্দকার মোস্তাক আহমদ, তাজউদ্দিন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু এবং প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যেও এদিন (২৩মার্চ, মঙ্গলবার) দ্বিতীয় দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রেসিডেন্টের যে আলাপ-আলোচনা শুরু হয় তার ভিত্তিতেই উপদেষ্টা পরিষদ আলোচনা করেন। এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে। এই উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন এবং প্রেসিডেন্টের পক্ষে বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াস, লে. জেনারেল এসজিএমএম পীরজাদা, এমএম আহমদ ও কর্নেল হাসান উপস্থিত ছিলেন।
 
এদিকে আলোচনার আড়ালে পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের দমন করতে ভয়ংকর পরিকল্পনা আঁটছিল। পিপলস পার্টির প্রধান জেডএ ভুট্টো এদিন রাতে তার দলীয় লোকজনদের নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠক করেন। আর অপারেশন সার্চ লাইট সফল করতে জেনারেল ইয়াহিয়া খান এদিন প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে বৈঠক করেন। ১৫ মার্চ ঢাকা আসার পর এই প্রথম জেনারেল ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে আসেন। এদিন বেলা ১১টায় তিনি ক্যান্টনমেন্টের পথে প্রেসিডেন্ট ভবন ত্যাগ করেন এবং বিকাল চারটায় প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রত্যাবর্তন করেন। অন্যদিকে প্রতিবাদে উদ্দীপ্ত জনতা এদিন গর্জে উঠেছিল সমুদ্রের মতো। প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল দেশব্যাপী। অসহযোগ আন্দোলনের ২১ দিন পার হওয়ার পর প্রতিটি পত্রিকায় মুদ্রিত হয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নির্ধারিত বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার প্রতিকৃতি।
 
পরদিন ২৪ মার্চ (বুধবার) প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা এসব ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। এদিন সংবাদ জঙ্গী জনতার মিছিলে মিছিলে আন্দোলিত ঢাকা: মুক্তি সংগ্রামের দুর্জয় সপথ’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৫ কলামে প্রকাশ করে। সংবাদে-এ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত অন্যন্য সংবাদগুলোর শিরোনাম ছিল, ‘২/১ দিনের মধ্যে উভয় অঞ্চলের প্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর ও মার্শাল ল’ প্রত্যাহার’, ‘ওয়ালী বেজেঞ্জো ও মুফতি মাহমুদের যুক্ত বিবৃতি: এক ইউনিট পুনরুজ্জীবনের চক্রান্তের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারী’, ‘প্রতিরোধ দিবস’, প্রেসিডেন্টের সহিত পাঁচ পশ্চিম পাকিস্তানী নেতার বৈঠক’ ইত্যাদি।
 
আজাদ এদিন ‘বাংলাদেশের পতাকা উড়াইয়া বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা: দাবির প্রশ্নে আপোষ নাই’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৬ কলামে প্রকাশ করে। এছাড়া আজাদ এদিন ‘প: পাকিস্তানী নেতাদের সহিত বঙ্গবন্ধুর বৈঠক’, ‘প্রতিরোধ দিবসে জনতার ঘোষণা: আর লাহোর প্রস্তাব নয়- এবার স্বাধীন বাংলা’ ‘ক্যান্টনমেন্টে প্রেসিডেন্ট’, ‘উপদেষ্টা পর্যয়ে আলোচনা’, ‘মুফতি মাহমুদ ও ইয়াহিয়া খানের বিবৃতি’, ‘আজ লেখক সংগ্রাম শিবিরে উদ্যোগে সেমিনার’ শিরোনামে কয়েকটি খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। আর ইত্তেফাক এদিন ‘আমরা শুনছি ঐ, মাভৈ: মাভৈ: মাভৈ:’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৭ কলামে প্রকাশ করে। এ ছাড়াও ইত্তেফাকে এদিন ‘৭১-এর তেইশে মার্চের সুর:’, ‘কর্মপন্থা নির্ধারণের ভার আমার উপর ছাড়িয়া দিন: মুজিব’, ‘মি: ভুট্টো ও তার দোসররা জানিয়া রাখুন’ ‘ক্ষমতা হস্তান্তর ও সামরিক শাসন প্রত্যাহার প্রসঙ্গে’, ‘আজ মুজিব ইয়াহিয়া বৈঠকের সম্ভাবনা’, ‘শেখ মুজিবের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের বৈঠক’, ‘উপদেষ্টা পর্যায়ে বৈঠক’ শিরোনামে কয়েকটি খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়।
২৪ মার্চ দৈনিক আজাদে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো:
 
‘বাংলাদেশের পতাকা’ উড়াইয়া বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা দাবির প্রসঙ্গে আপোস নাই
 
স্টাফ রিপোর্টার: বিদ্রোহী বাংলার মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান গতকাল মঙ্গলবার ‘বাংলাদেশের পতাকা’ উড়াইয়া ২৩ মার্চ উদযাপন করেন। এই উপলক্ষে নিজ বাসভবনে আগত সংগ্রামী জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ শেখ মুজিব বলেন, ‘আমরা রক্ত দিতে প্রস্তুত রহিয়াছি। বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি আত্মার একটি আত্মাও জীবিত থাকা পর্যন্ত দাবি আদায়ের সংগ্রাম চলিবে।’ গতকাল ভোর পাঁচটায় স্বীয় বাসভবনের শীর্ষে বঙ্গবন্ধু নিজে ও প্রাঙ্গণে জাতীয় শ্রমিক লীগের জনাব আবদুল মান্নান ‘বাংলাদেশের পতাকা’ উত্তোলনের মাধ্যমে ২৩শে মার্চ প্রতিরোধ দিবসের সূচনা করেন। বেলা ১২টায় নিজ বাসভবন প্রাঙ্গণে বত্রিশ নম্বর সড়কে আগত মিছিলের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা নিশ্চয়ই শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালাইতে চাই। কিন্তু তাহার অর্থ এই নয় যে, কোনো আক্রমণ আমরা সহ্য করিব।’
 
দেশবাসীর উদ্দেশে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘সংগ্রাম পরিচালনার দায়িত্ব আমার উপর অর্পণ করিতে হইবে। সেই ভালো সিপাহসালার যিনি কম রক্তপাতে সফলতা অর্জন করিতে পারেন। তিনি বলেন, ২২ দিনের অসহযোগ আন্দোলনে ক্ষমতাসীন চক্রের মাজা ভাঙিয়া গিয়াছে, অধিকার যে আমাদের প্রতিষ্ঠিত হইবে সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত। বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের দাবির প্রশ্নে কোনো আপোস নাই। তাহারা আজ ঐক্যবদ্ধ। তাই বিশে^র কোনো শক্তিই তাহাদের দাবাইয়া রাখিতে পারিবে না। মা-বোনেরাও আজ সংগ্রামের রাস্তায় নামিয়া আসিয়াছে। আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, ‘বাংলাদেশে যাহাতে একটিও শোষণকারী থাকিতে না পারে, সেই জন্য ব্যাপক আন্দোলন অব্যাহত রাখা হইবে।
(আজাদ: ২৪ মার্চ, বুধবার-১৯৭১)
 
পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের সহিত বঙ্গবন্ধুর বৈঠক
 
স্টাফ রিপোর্টার: পশ্চিম পাকিস্তানের ছয়জন পার্লামেন্টারী নেতা গতকাল বিকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাহার বাসভবনে প্রায় নব্বই মিনিটকাল স্থায়ী বৈঠকে মিলিত হন। এই ছয় নেতা হইতেছেন কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান মিয়া মমতাজ দৌলতানা, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান খান আবদুল ওয়ালী খান, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম প্রধান মাওলানা শাহ আহমেদ নূরানী, পশ্চিম পাকিস্তান ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ও নির্যাতিত বেলুচ নেতা জনাব গাউস বখশ বেজেঞ্জো, পাঞ্জাব কাউন্সিল লীগের সভাপতি সরদার শওকত হায়াত এবং জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুফতি মাহমুদ। নেতৃবৃন্দের এই বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খোন্দকার মোস্তাক আহমদ, জনাব তাজউদ্দিন আহমদ ও ডক্টর কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পর মিয়া মোহাম্মদ দৌলতানা অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন যে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট সম্পর্কেই তাহাদের আলোচনা হইয়াছে। ইহা শেখ সাহেবের সহিত পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের আলোচনার অগ্রগতিরই একটি অংশ মাত্র।…ন্যাপ প্রধান ওয়ালী খান সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান আলোচনায় তাহারা আশাবাদী। তাহার এই মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান স্মিত মুখে বলিয়া উঠেন, ‘আপনি মঙ্গলের জন্য আশা করিতে পারেন; কিন্তু স্মরণ রাখবেন, অমঙ্গলের জন্যও প্রস্তুত থাকিতে হইবে।’
(আজাদ:২৪ মার্চ, বুধবার-১৯৭১)
 
প্রতিরোধ দিবসের জনসভায় ঘোষণা আর লাহোর প্রস্তাব নয়- এবার স্বাধীন বাংলা
স্টাফ রিপোর্টার : প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বায়তুল মোকাররমের এক গণসমাবেশে বক্তাগণ চ‚ড়ান্ত ও সার্বিক স্বাধীনতা অর্জনের উদ্দেশ্যে সাড়ে ৭ কোটি বাঙালিকে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের জন্য ঘরে ঘরে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বাণ জানান। তাহারা বাংলাদেশকে উপনিবেশবাদী শোষণ হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত করিয়া একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের আপোসহীন সংগ্রামের কথা ঘোষণা করেন। জাতীয় শ্রমিক লীগের নেতা জনাব মোঃ শাহজাহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গণসমাবেশে বক্তৃতা করেন জনাব আ স ম আবদুর রব, জনাব নূরে আলম সিদ্দিকী, জনাব আবদুল কুদ্দুস মাখন, জনাব তোফায়েল আহমদ প্রমুখ।
(আজাদ: ২৪ মার্চ, বুধবার-১৯৭১)
 
ক্যান্টনমেন্টে প্রেসিডেন্ট
স্টাফ রিপোর্টার: জেনারেল ইয়াহিয়া খান গতকাল মঙ্গলবার প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টাকাল কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে অতিবাহিত করেন। তবে এই ব্যাপারে সামরিক কর্তৃপক্ষের নিকট কোনো ঘোষণা পাওয়া যায় নাই। গত ১৫ মার্চ ঢাকা আগমনের পর জানা মতে এই প্রথম জেনারেল ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে আসেন। গতকাল বেলা ১১টায় তিনি ক্যান্টনমেন্টের পথে প্রেসিডেন্ট ভবন ত্যাগ করেন এবং আবার বিকাল চারটায় স্বীয় ভবনে প্রত্যাবর্তন করেন।
(আজাদ: ২৪ মার্চ, বুধবার-১৯৭১)
 
উপদেষ্টা পর্যায়ে আলোচনা
স্টাফ রিপোর্টার : শেখ মুজিব এবং প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার দ্বিতীয় দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী ছিল। আলোচনার পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব তাজউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত প্রেসিডেন্টের যে আলাপ-আলোচনা শুরু হয় তাহার ভিত্তিতেই উপদেষ্টা পরিষদ আলোচনা করেন। এই আলোচনা অব্যাহত থাকিবে। এই উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জনাব তাজউদ্দিন আহমদ ও ডক্টর কামাল হোসেন এবং প্রেসিডেন্টের পক্ষে বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াস, লে. জেনারেল এসজিএমএম পীরজাদা, জনাব এমএম আহমদ ও কর্নেল হাসান উপস্থিত ছিলেন।
(আজাদ: ২৪ মার্চ, বুধবার-১৯৭১)
 
ভুট্টোর দলের সারারাত বৈঠক
ঢাকা ২৩ মার্চ। পিপলস পার্টির প্রধান জনাব জেডএ ভুট্টো গতরাতে তাহার দলীয় লোকজনদের দীর্ঘ রাত্রব্যাপী এক বৈঠকে দেশের বর্তমান সঙ্কট নিরসনের উদ্দেশ্যে শেখ মুজিব ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ব্যাপক মতৈক্য ও বুঝাপড়ার শর্তসমূহ বিবেচনা করেন। পিপিপি মহল আজ অপরাহ্নে বলেন যে, জনাব ভুট্টো আজ সকালে পুনরায় তাহার লোকজনদের সহিত বৈঠক করেন। জনাব ভুট্টো ইহা ছাড়া প্রেসিডেন্ট ভবনে লে. জেনারেল পীরজাদার সহিত ৭৫ মিনিটব্যাপী এক বৈঠকে মিলিত হন। পরে সাংবাদিকদের তিনি জানান যে, আজ তাহার প্রেসিডেন্টের সহিত সাক্ষাতের সম্ভাবনা নাই। কতদিন তিনি ঢাকায় অবস্থান করিবেন এই মর্মে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন যে, যতদিন প্রয়োজন তিনি ঢাকায় থাকিবেন। এপিপি (আজাদ:২৪ মার্চ, বুধবার-১৯৭১)
 
ঘরে ঘরে বাংলার পতাকা
স্টাফ রিপোর্টার : পাকিস্তান প্রস্তাবের ৩১তম দিবসে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকাসহ প্রদেশের সর্বত্র গাঢ় সবুজ জমিনে লাল বৃত্তের মধ্যে বাংলাদেশের সোনালী মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়। সংগ্রামের সূতিকাগার রাজধানী ঢাকা নগরী যেন গতকাল পতাকার নগরীতে পরিণত হইয়াছিল। শহরের প্রতিটি যানবাহন, দোকানপাট, সরকারি-আধাসরকারি-বেসরকারি ভবনে স্বাধীন বাংলার এই পতাকা উত্তোলন করা হয়। ইহা ছাড়া সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, বেতার কেন্দ্র, বিএনআর, জিপিও ভবন এবং এই সঙ্গে কতিপয় বিদেশী দূতাবাসেও স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। উল্লেখযোগ্য যে, গতকাল মঙ্গলবারও স্বাধীন বাংলার পতাকার সহিত ঘরে ঘরে কালো পতাকা উড়িতে থাকে। গত ২১ দিন যাবৎ এই কালো পতাকা আমাদের শোকের বারতা বহন করিয়া চলিয়াছে। উল্লেখযোগ্য যে, পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টো বর্তমানে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান করিতেছেন। সেই হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালেও গতকাল স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়।
(আজাদ: ২৪ মার্চ, বুধবার-১৯৭১)
 
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension