জাতিসংঘপ্রধান খবরবাংলাদেশ

করোনামুক্ত বিশ্বসহ জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ৬ দফা

শাহ্ জে. চৌধুরী, নিউ ইয়র্ক জাতিসংঘ দপ্তর থেকে : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কোভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, করোনামুক্ত বিশ্ব গড়ে তুলতে মেধাস্বত্ত্ব ছাড়সহ সাশ্রয়ী মূল্যে টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় সময় শুক্রবার বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৩০) প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে ছয়দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন।

শেখ হাসিনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আগের বছরগুলোর মতোই বাংলা ভাষায় তাঁর ভাষণ দেন। এটি বাংলা ভাষায় দেয়া প্রধানমন্ত্রীর ১৮তম ভাষণ। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে প্রথম বাংলায় ভাষণ দেন। প্রধানমন্ত্রীর ১৮তম ভাষণে অগ্রাধিকার পাওয়া অন্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে টেকসই উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ও অসমতা দূরীকরণ।

শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনের নবনির্বাচিত সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় মালদ্বীপের আব্দুল শহিদকে অভিনন্দন জানান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন কোভিড-১৯ বিশ্বজুড়ে অব্যাহতভাবে মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। করোনার নতুন ধরনের মাধ্যমে অনেক দেশ বার বার সংক্রমিত হচ্ছে। এ মহামারিতে গোটা বিশ্বের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বহুপাক্ষিকতাবাদ ও জাতিসংঘ ব্যবস্থার দৃঢ় সমর্থক হিসেবে বাংলাদেশ এই সঙ্কটকালে জাতিসংঘকে আশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখে। সব ধরনের মতভেদ ভুলে গিয়ে আমাদের অবশ্যই ‘অভিন্ন মানবজাতি’ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে; সম্মিলিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সবার জন্য আবারও এক সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ে তুলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বছরটি আমাদের জন্য একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছর আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছি। একইসঙ্গে আমরা আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘‌মুজিববর্ষ’ উদযাপন করছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু এমন একটি বিশ্ব গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অবিচার, আগ্রাসন ও পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি থাকবে না। ৪৭ বছর আগের তাঁর সে আহ্বান আজও সমভাবে প্রযোজ্য। এ জন্য আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের যে কোনো উদ্যোগে সমর্থন ও নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছি। করোনাভাইরাসের টিকার ন্যায্য হিস্যা দাবি, ফিলিস্তিনিদের প্রতি যেকোনো ধরনের অবিচারের বিরুদ্ধে আমাদের দৃঢ় অবস্থান, রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান, জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা- এসব আমাদের বৈশ্বিক অঙ্গীকারের কতিপয় উদাহরণ মাত্র।’

তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল পাঁচটি অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম। জিডিপি-তে আমরা বিশ্বের ৪১তম। গত এক দশকে আমরা দারিদ্র্যের হার ৩১ দশমিক ৫ থেকে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। এ সময়ে আমাদের মাথাপিছু আয় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২,২২৭ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ সর্বকালের সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছি।’

প্রধান তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেন, গত এক দশকে আর্থ-সামাজিক খাতে ও নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। শিশুমৃত্যু হার প্রতি হাজারে ২৩ দশমিক ৬৭-এ কমে এসেছে। প্রতি লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর হার ১৭৩-এ হ্রাস পেয়েছে। মানুষের গড় আয়ু বেড়ে হয়েছে ৭৩ বছর।

তিনি বলেন, ‘অনাদিকাল হতে মানবজাতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি এবং মানবসৃষ্ট নানা সংঘাত ও দুর্যোগ মোকাবিলা করে আসছে। এতদসত্ত্বেও বুকে আশা এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে মানবজাতি এসব পাহাড়সম সমস্যা অতিক্রম করে টিকে রয়েছে। এই মহামারিও এমনি একটি সঙ্কট যেখান থেকে বহু মানুষের টিকে থাকার অনুপ্রেরণামূলক এবং উদারতার উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। দুঃখজনক হলেও এই মহামারি আরও বেশ কিছুদিন স্থায়ী হবে বলে মনে হচ্ছে। সেজন্য এ অভিন্ন শত্রুকে মোকাবিলা করার জন্য অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন আমাদের অনেক বেশি নতুন, অন্তর্ভূক্তিমূলক ও বৈশ্বিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন। সবার জন্য ন্যায়সঙ্গত ও সাশ্রয়ী মূল্যে টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অবিলম্বে টিকা প্রযুক্তি হস্তান্তর টিকার সমতা নিশ্চিত করার একটি উপায় হতে পারে। প্রযুক্তি সহায়তা ও মেধাস্বত্ত্বে ছাড় পেলে বাংলাদেশও ব্যাপক পরিমাণে টিকা তৈরি করতে সক্ষম।’

দ্বিতীয়ত, এ মহামারি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে অধিকমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলোকে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, নিঃসরণের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং টেকসই অভিযোজনের জন্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তির অবাধ হস্তান্তরের আহ্বান।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension