
এশিয়ার দেশে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ
মশাবাহিত নানা রোগের মধ্যে ডেঙ্গু অন্যতম। ১৯৪৩ সালে জাপানের নাগাসাকিতে অন্য মশাবাহিত রোগ থেকে ডেঙ্গুকে প্রথমবারের মতো আলাদা করা হয়, ঘোষণা করা হয় মারি। ইতোমধ্যে বিশ্বের একশর বেশি দেশে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলেও মশাবাহিত ভাইরাসঘটিত রোগটির প্রকোপ বেশি এশিয়ায়। বিশ্বে ডেঙ্গু আক্রান্তের মোট ৭০ শতাংশ এই মহাদেশে।
বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোয় সাধারণত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। কিন্তু অক্টোবর শেষেও এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত রয়েছে। এ প্রবণতা শুধু বাংলাদেশে নয়, এশিয়ার অন্য দেশেও একই অবস্থা। তবে এবার ডেঙ্গুর বিস্তার ঢাকার বাইরে উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেশি।
শনিবার (২৯ অক্টোবর) পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা) ডেঙ্গুতে দেশে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। গত শুক্রবার মৃত্যু হয়েছিল পাঁচ জনের। গতকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মৃতের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩৪।
শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হালনাগাদ তথ্যে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার একই সময়ে সারা দেশে ৮৬৯ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত চলতি বছর দেশে ৩৬ হাজার ১৩১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
ঢাকা শহরের পর ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি কক্সবাজার জেলায়। এই জেলায় গতকাল পর্যন্ত ১ হাজার ৫৯১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ২৩ জন।
২০২১ সালে দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয় ২৮ হাজার ৪২৯ জন। একই বছর দেশব্যাপী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
চলতি বছর দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের নতুন বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আছে- দেশের ৫০টির বেশি জেলায় ছড়িয়ে পড়া। বিশ্বে শনাক্ত ডেঙ্গুর চারটি ধরনের মধ্যে তিনটিই এখন বাংলাদেশে সক্রিয়। ডেঙ্গুর চারটি ধরন হলোÑডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। ডেন-২ চলতি বছর দেশে এখনও শনাক্ত হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ৭ অক্টোবরের হালনাগাদ অনুযায়ী, পাকিস্তানে চলতি বছর এ পর্যন্ত ২৫ হাজার মানুষের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ৬২ জনের। ৭৪ শতাংশই আক্রান্ত হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসে।
পাকিস্তানে মধ্যজুন থেকে শুরু হওয়া প্রায় এক মাসের বন্যায় ম্যালেরিয়া, জিকা ও পীতজ্বরসহ অন্য মশাবাহিত রোগের সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। দেশটিতে ২০২১ সালে ৪৮ হাজার ৯০৬ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল। মৃত্যু হয়েছিল ১৮৩ জনের।
ভারতেও চলতি বছর ডেঙ্গুর ভয়াবহতা আগের বছরের তুলনায় বেশি। পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ভারতের এ রাজ্যে ৪০ হাজার ৩৪৫ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ১৮৭ জনের। এর মধ্যে চলতি বছর কলকাতা শহরে আক্রান্ত হয়েছে পাঁচ হাজার ৫০০ জন। মৃত্যু হয়েছে ৪৮ জনের।
২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে আট হাজার ২৬৪ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল। মৃত্যু হয়েছিল মাত্র সাত জনের।
হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দিল্লিতে এক হাজার ৮৭৬ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু অক্টোবরে শনাক্ত হয়েছে ৯৩৯ জনের। তবে ভারতের রাজধানীতে গতকাল শনিবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হয়নি। ২০২১ সালে দিল্লিতে দুই হাজার ৩২৩ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল। মৃত্যু হয়েছিল ২৩ জনের। পশ্চিমবঙ্গের মতো ভারতের উত্তর প্রদেশ, জম্মু-কাশ্মিরেও ডেঙ্গুর অবস্থা গত বছরের তুলনায় খারাপ।
শ্রীলঙ্কার জাতীয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের তথ্যমতে, ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশটিতে ৫১ হাজার ১৪৭ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ১৯৮ জনের। ২০২১ সালের একই সময়ে দেশটিতে ৩১ হাজার ১৬২ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল। মৃত্যু হয়েছিল ৮৭ জনের।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ডেঙ্গু পরিস্থিতি বেশি ভয়াবহ। ডব্লিউএইচওর ৭ অক্টোবরের হালনাগাদ অনুযায়ী, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চলতি বছর লাওসে ২৪ হাজার ২৫৫ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল মাত্র ১ হাজার ১০০। অর্থাৎ চলতি বছর দেশটিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২২ গুণ বেড়েছে। অবশ্য দেশটিতে ডেঙ্গুতে মৃত্যু কম। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছর তা ছিল ৪ জন।
একই সময়ে কম্বোডিয়ায় সাত হাজার ২২৯ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের। ২০২১ সালের একই সময়ে দেশটিতে পাঁচ হাজার মানুষের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল। মৃত্যু হয়েছিল ১০ জনের।
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় চলতি বছর মোট ৪২ হাজার ৪৮ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। শুধু অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে দেশটিতে এক হাজার ৫৩৩ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। আগের সপ্তাহে তা ছিল এক হাজার ৩৬৩ জন। ২০২১ সালের একই সময়ে দেশটিতে মোট ১৯ হাজার ৪২৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিল। অর্থাৎ চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মালয়েশিয়ায় ২২ হাজার ৬৬১ জন বা ১১৭ শতাংশ বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। দেশটিতে চলতি বছর অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ১৩ জন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সিঙ্গাপুরের। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চলতি বছর দেশটিতে মোট ২৭ হাজার ৭৬১ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬৪৮ শতাংশ বেশি। চলতি বছর মারা গেছেন ১৭ জন। গত বছরের একই সময়ে দেশটিতে মাত্র চার হাজার ২৮৪ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল।
আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেঙ্গু সমস্যা এশিয়ায় প্রকট কেন, তা নিয়ে এখনও পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা হয়নি। তবে সাধারণ গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ তাপমাত্রা, আর্দ্রতা থাকায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল ডেঙ্গুর অভয়ারণ্য। তা ছাড়া অপরিকল্পিত দ্রুত নগরায়ণ ডেঙ্গু বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
যে স্ত্রী এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু হয়, তাকে সাধারণত ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রাসম্পন্ন জায়গায় বাস করতে হয়। এশিয়ার যেকোনো স্থানের সারা বছরের তাপমাত্রা ১৬ ডিগ্রির ওপরে থাকে। ধারণা করা হয়, এ কারণেই সম্ভবত এশিয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ এতটা ভয়াবহ।
ডেঙ্গু আক্রান্ত একটি মশা তার পুরো জীবনকাল বা তিন থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত ডেঙ্গু ছড়াতে পারে। ডব্লিউএইচওর তথ্য, কয়েক দশকে বিশ্বে ডেঙ্গুর বিস্তার ভয়াবহ রকমের বেড়েছে। ডেঙ্গু ১৭টি অবহেলিত গ্রীষ্মমন্ডলীয় রোগের (এনটিডির) মধ্যে অন্যতম।
প্রবাদ আছে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই ভালো। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে ডাক্তাররা এটি স্মরণ করিয়ে দেন। এ জন্য দিন-রাতে মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো, মশা নিরোধক ওষুধ বা স্প্রে ব্যবহার করা, ঘরের আশপাশ পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। নিতে হবে পর্যাপ্ত বিশ্রাম।
মনে রাখতে হবে, ড্রেনের পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে না। জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে তারা ডিম পাড়ে। তাই কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
কেউ আক্রান্ত হলে সাধারণ প্যারাসিটামল খেতে বলেন ডাক্তার। তা ছাড়া পর্যাপ্ত পানিসহ অন্য তরল জাতীয় পানীয় পানের পরামর্শ দেন ডাক্তারেরা। তবে উপসর্গ দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
২০১৬ সাল থেকে বিশ্বের কোনো কোনো দেশ ডেঙ্গু টিকার অনুমোদন দিচ্ছে। সর্বশেষ তথ্যমতে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মেক্সিকোসহ ১১টি দেশ ডেঙ্গু টিকার অনুমোদন দিয়েছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রও এর অনুমোদন দিয়েছে। তবে বাংলাদেশে রোগটির প্রাদুর্ভাব বাড়লেও এখনও কোনো টিকার অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
ডব্লিউএইচওর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বিশ্বের ১২৯টি দেশে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ তথা প্রায় ৩৯০ কোটি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
গত এক দশক ধরে বছরে গড়ে ৩৯ কোটি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে, যাদের অধিকাংশেরই ডেঙ্গুর কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি বা দেখা গেলেও তা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। একই সময়ে বছরে গড়ে ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।



