
জুতার আন্তর্জাতিক বাজার: কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ
২০২২ সালে বিশ্বে জুতার বাজারের আকার বেড়ে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০ লাখ ৪২ হাজার টাকা) হয়েছে। এর আগের বছর বাংলাদেশ থেকে জুতা রপ্তানি হয়েছে ১১৬ কোটি ডলারের। সে হিসাবে বলা যায়, জুতার বর্তমান বৈশ্বিক চাহিদার ৩২৯ ভাগের প্রায় এক ভাগ জোগান দেয় বাংলাদেশ। বর্তমানে জুতা রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৬তম অবস্থানে রয়েছে। শীর্ষে রয়েছে চীন। দেশটি বৈশ্বিক চাহিদার ৬০ শতাংশের বেশি রপ্তানি করে।
২০২৭ সালে এই বাজারের আকার বেড়ে হবে ৫০ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের জুতার ক্রমবর্ধমান চাহিদাও আশাব্যঞ্জক। এই অবস্থায় অনেকের মনেই প্রশ্ন, ২০২৭ সাল নাগাদ বিশ্বে জুতার যে বিশাল বাজার তৈরি হবে, তা ধরতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ।
জুতা উৎপাদনে বাংলাদেশের সুবিধা
জুতা উৎপাদনের কাঁচামাল ও মজুরি- উভয় দিক থেকেই বাংলাদেশ বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তা সত্ত্বেও বিশ্ব জুতার বাজারে উৎপাদন, ভোগ কিংবা রপ্তানি- তিন ক্ষেত্রেই চীন শীর্ষে। ২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত প্রতি পাঁচ জোড়া জুতার এক জোড়া কিনেছে চীনের ভোক্তারা। আর ৬০ দশমিক ৪০ শতাংশ রপ্তানি করেছে চীন। সে তুলনায় ২০২১ সালে জুতা উৎপাদনে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বে অষ্টম, ভোক্তার দিক থেকে দশম আর রপ্তানিতে ১৬তম অবস্থানে।
জুতা উৎপাদনে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে মজুরির দিক থেকে। স্বল্প মজুরিতে জুতা উৎপাদনের এমন সুবিধাজনক অবস্থানে আর কোনো দেশ নেই। এমনকি চীনের তুলনায়ও এখানে মজুরি কম।
লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে এই খাতে দুই লাখ মানুষ সরাসরি সংশ্লিষ্ট। তাদের ৬০ শতাংশ নারী। আর পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে জড়িত আছে ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষ।
এবার আসা যাক কাঁচামালের বিষয়ে। জুতা উৎপাদনে বাংলাদেশের বাজার থেকেই বছরে ৩০ কোটি বর্গফুট চামড়ার জোগান আসে। মজুরি কম হওয়ায় এবং দেশীয় বাজার থেকে কাঁচামালের সিংহভাগ আসায় উৎপাদন খরচ প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক কম।
এদিকে বাংলাদেশের জুতা কর ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও চীনে রপ্তানি হচ্ছে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের জুতার দামও কম। ফলে বিশ্ববাজারে জুতার মান ও দামে বাংলাদেশ বেশ সুনাম অর্জন করেছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জুতার বড় একটি বাজার আছে। মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে এই বাজারও বড় হচ্ছে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় জুতা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ডাইচম্যান। ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ৩ হাজার ৮০০টিরও বেশি শোরুম রয়েছে। জার্মানিভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠানের জন্য সিনথেটিক ও চামড়ার জুতা তৈরি হচ্ছে অ্যাপেক্স, বেঙ্গল, আর্থ, ফরচুনা, জিল ওয়্যার ও ল্যান্ডমার্ক ফুটওয়্যারের কারখানায়। এসব কারখানায় ডাইচম্যানের জনপ্রিয় ফিফথ এভিনিউ, এ এম সুজ, ফিলা, গ্রেসল্যান্ড, ল্যান্ডলোভার, আগাক্সি, বারেনসচু, ক্যাটওয়াক, ক্লাউডিও কন্টি, কাপকেক কউট্রু, ভেনিস, ভিক্টরি, ভিটিওয়াই ও গালুসের মতো ব্র্যান্ডের জুতা তৈরি হচ্ছে। পৃথিবী বিখ্যাত ব্র্যান্ড টিম্বারল্যান্ড, উলভারিনের জুতায়ও এখন ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ থাকছে।
তবে কিছু বাধার কারণে এখনো আন্তর্জাতিক বাজার সেভাবে ধরতে পারেনি বাংলাদেশ। এর মধ্যে পরিবহন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত করতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজার ধরা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতিও দেখছেন কেউ কেউ।
ব্যবসা-সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
ফরচুন শুজ বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জুতা উৎপাদন প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘এই খাত এগিয়ে নিতে অবকাঠামো দরকার। এ খাতকে এগিয়ে নিতে হলে ঢাকা-চট্টগ্রামের বাইরে অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। যেমন আমার কারখানা বরিশালে, কিন্তু সেখানে এই খাতের তেমন কোনো অবকাঠামো নেই। বাংলাদেশ কাস্টমস আমাদের গার্মেন্টসের মতো মনে করে। চট্টগ্রাম পোর্টে কারখানাগুলো যখন বন্ড করে, অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়। এই সাপোর্টগুলো দরকার। এনবিআরকে আরও সহজীকরণ করা দরকার।’
মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা প্রতিযোগিতা করছি চীনের সঙ্গে। চীনের কারখানাগুলো সাবসিডি পায়। চীনের কারখানাগুলো যখন ইনভয়েস জমা দেয়, তখন সরকার তাদের সঙ্গে সঙ্গে ১৮ শতাংশ বেনিফিট দিয়ে দেয়। এ কারণেই আমরা চীনের সঙ্গে কখনোই প্রতিযোগিতায় টিকতে পারি না। অথচ তাদের চেয়ে আমাদের উৎপাদন খরচ কম। আমরা চাচ্ছি চামড়া খাতে ১৫ শতাংশ প্রণোদনা। আমরা পাচ্ছি মাত্র ৪ শতাংশ। পৃথিবীতে সিনথেটিকের বাজার কিন্তু অনেক বড়। প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ সিনথেটিকের জুতা পরে থাকেন। এই খাতকে প্রণোদনা দিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ এখনো আপডেটেড না। আজকে এলে কালকে কনটেইনার ছাড়ানো যায় না। দেখা যায়, আজকে কনটেইনার আসছে, এক মাস ধরে আটকে আছে। কিছুদিন আগে জাহাজ ভাড়া ২ হাজার ডলার থেকে বেড়ে ৫ হাজার ডলার হয়েছে। আমাদের কাঁচামাল চীন থেকে আনতে হয়। সেখানেও বেশি দাম দিতে হচ্ছে। কমিশন দিতে হচ্ছে।’
বাংলাদেশ পাদুকা প্রস্তুতকারক সমিতির সহসভাপতি আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না। পাদুকাশিল্পের বড় অংশ লালবাগ, ইসলামবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায়। কয়েক বছর ধরে সরকার এখানে ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স ও পরিবেশের ছাড়পত্র দিচ্ছে না। এখান থেকে ফ্যাক্টরিগুলো সরানোর কথা বলছে। কিন্তু আমাদের জন্য কোনো জায়গাও বরাদ্দ নেই। যেহেতু ডকুমেন্টগুলো আপডেট করা যাচ্ছে না, তাই ব্যাংক লোন পাওয়াও সহজ হচ্ছে না।’
সরকার কী বলছে
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘বিসিকের মাধ্যমে শিল্প মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। এর সুফল এসেছে। গত কোরবানির ঈদে যত চামড়া ঢাকার বাইরে থেকে ঢুকেছে, সেগুলো নষ্ট হয়নি। হাজারীবাগ দীর্ঘদিন রেড জোন অবস্থায় ছিল। এখন কিন্তু নেই। আমরা এখন অস্ট্রেলিয়ান একটি কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছি। আমরা হোপফুল, আমাদের মিনিমাম কিছু মোডিফিকেশন দরকার হবে। আমরা একটি কনসালট্যান্টের সঙ্গে কথা বলছি। ছয় মাসের মধ্যে আমরা একটি পরিবর্তন আনতে পারব।’



