
শ্রীলঙ্কায় আন্দোলন স্তিমিত
তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখে শ্রীলঙ্কায় সরকারবিরোধী যে গণবিক্ষোভ হয়েছিল, আপাতত সে আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়েছে। মাসের পর মাস ধরে চলা সেই আন্দোলনের একপর্যায়ে রাজধানী শহরে প্রেসিডেন্টের দপ্তর ঘেরাও করে অবস্থান নিয়েছিল বিক্ষোভকারীরা।
বিবিসি জানায়, রাজধানী কলম্বোর যে সমুদ্রমুখী উদ্যানকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ পরিচালিত হয়, সেটাকে পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তরিত করেছে বর্তমান সরকার। চারদিকের জাঁকালো সাজসজ্জা দেখিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা স্বস্তিকা অরুলিঙ্গম বিবিসিকে বলেন, ‘এটা ন্যক্কারজনক। যে সম্পদের অন্যায্য প্রদর্শন চলছে, তা এ দেশের নেই।’
উৎসব ঘিরে আলোকসজ্জা প্রসঙ্গে স্বস্তিকা বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ বোর্ড গেল বছর ১৫ হাজার কোটি শ্রীলঙ্কান রুপি লোকসান করেছে।
দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট ফের নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে শ্রীলঙ্কায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার, পরিবহন এবং শিশুদের স্কুলের ব্যয় মেটানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। সে সঙ্গে নতুন বছরে করবৃদ্ধিতে দুর্দশা বাড়বে বৈ কমবে না।
স্বস্তিকা অরুলিঙ্গমের ভাষায়, বর্তমানে এক ধরনের কৃত্রিম স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে শ্রীলঙ্কায়। অথচ ক্রমেই জীবনযাপন কঠিন হয়ে ওঠায় চাপ বাড়ছে জনগণের ওপর।
গেল বছরের বেশির ভাগ সময় তীব্র খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যদ্রব্যের সংকটে ভুগেছে শ্রীলঙ্কা। করোনা অতিমারীর পর সরকারের নেয়া বেশ কিছু সিদ্ধান্তে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার মজুত তলানিতে গিয়ে ঠেকে। জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ সারি আর বিদ্যুৎ বিভ্রাটে নাকাল জনগণের আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষ গত জুলাইয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
সে ঘটনার ছয় মাস পর শ্রীলঙ্কার দুর্দশা কমেনি মোটেও। রাজাপক্ষের জায়গায় রনিল বিক্রমাসিংহে এলেও জনসমর্থন পাননি। এদিকে এক বছর বিলম্বের পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে আগামী মাসে। আবার নির্ধারিত সময়ের আগে জাতীয় নির্বাচনের কথাও চলছে।
বিক্রমাসিংহেও সরকারবিরোধী আন্দোলনের মুখে পড়েন। সে সময় রাজাপক্ষের পথে তিনি হাঁটবেন না বলে আশ্বস্ত করেন বিক্ষোভকারীদের।
স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী শ্রীন সারুর বিবিসিকে বলেন, ‘শ্রীলঙ্কায় সব ধরনের আন্দোলন এখন নিয়ন্ত্রণে। প্রয়োজনে দেশ নিয়ন্ত্রণে সামরিক বাহিনীর সাহায্য চাইতে তিনি (রনিল) তার ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।’
প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা বিক্রমাসিংহের আছে বলে জানান সারুর। তিনি চাইলে নিরাপত্তা বাহিনীকে কাজে লাগাতে পারেন। ‘সন্ত্রাস প্রতিরোধ আইনের’ (প্রিভেনশন অব টেররিজম অ্যাক্ট) ক্ষমতাবলে আটকাদেশও দিতে পারেন।
সমালোচকদের মতে, শ্রীলঙ্কায় ক্ষমতা এমনিতেই প্রেসিডেন্ট-কেন্দ্রিক। জবাবদিহি না থাকায় রাজাপক্ষে পরিবারের দুই দশকের আমলে তা আরও পোক্ত হয়। গত বছরের আন্দোলনে অন্যতম দাবি ছিল সংবিধানের সংস্কার।
গোতাবায়া রাজাপক্ষের পদত্যাগ চেয়ে আন্দোলন শুরু হয় গত বছর ৯ এপ্রিল। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন বিক্ষোভকারীরা। জনসভা, মোমবাতি প্রজ্বালন, নাটক মঞ্চায়ন এবং রাজনৈতিক জ্ঞানবৃদ্ধির জন্য বই সংগ্রহে অংশ নেন তারা।
রাজাপক্ষে ক্ষমতা ছাড়তে না চাইলে জুলাইয়ে আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে, আন্দোলনকারীদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে ক্রমাগত। একপর্যায়ে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে হামলে পড়লে মালদ্বীপে পালিয়ে যান রাজাপক্ষে। তার পদত্যাগের পর উত্তরসূরির নির্দেশে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও বাসভবন নিয়ন্ত্রণে নেয় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। সেই থেকে অনেক আন্দোলনকারী এখনো কারাবন্দি।



