আন্তর্জাতিকপ্রধান খবর

জেন গুডঅলের চিঠিতে শৈশবে বইপড়ার স্মৃতি

বই শুধু কিছু ছাপানো অক্ষর বা মলাটবদ্ধ কাগজ নয়, বই যেন এক অনন্ত জগৎ। কখনো তা ক্ষুধার্ত মনের খোরাক যোগায়, কখনো অসুস্থ আত্মাকে সারিয়ে তোলে, কখনো হাসির ফোয়ারা ছোটে তো কখনো চিন্তার সাগরে ডুবিয়ে দেয়।

কবি গেন্ডোলিন ব্রুকস যেমনটা বলেছিলেন, “বই খাবার যোগায়, আরোগ্য করে, কলকল করে এবং আঘাত করে।” ফ্রাঞ্জ কাফকার কাছে বই ছিল আমাদের ভেতরের জমে থাকা বরফ ভাঙার কুঠার। গ্যালিলিও তো বইকে দেখতেন অতিমানবীয় শক্তির উৎস হিসেবে। আর হারমান হেস ১৯৩০ সালে ‘বইয়ের জাদু’ নিয়ে তার দূরদর্শী লেখায় বলেই ফেলেছেন, “বই লেখা ছাড়া কোনো ইতিহাস নেই, মানবতা বলে কিছু নেই।”

প্রযুক্তির যতই পরিবর্তন আসুক না কেন, বইয়ের সেই জাদু আমাদের ওপর চিরকালই থাকবে। আমরা কেন পড়ি? এর উত্তর বহুবিধ। আমরা পড়ি কিছু মনে রাখার জন্য, আবার কিছু ভুলে যাওয়ার জন্যও। নিজেদের নতুন করে গড়তে, নিজেদের বাঁচাতে, এমনকি নিজেদের আবিষ্কার করতেও আমরা বইয়ের আশ্রয় নিই।

কবি মেরি অলিভার বলেছিলেন, “আমি এমনভাবে পড়ি, একজন ব্যক্তি যেমন বাঁচার জন্য সাঁতার কাটে।” বই আমাদের কেবল ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচানোর লাইফ-রাফ্ট নয়, এটি সেই জল যা আমাদের জীবনের নদীপথকে নতুন করে গড়ে তোলে, কখনো এই দিকে বাঁকায় তো কখনো সেই দিকে, কখনো অজানা বিশাল দূরত্ব পাড়ি দেওয়ায় তো কখনো কঠিনতম শিলাকেও চূর্ণ করে নতুন পথ তৈরি করে।

এই যে বইয়ের জীবন-পরিবর্তনকারী শক্তি, তা সহজ ও সরল ভাষায় বর্ণনা করেছেন কিংবদন্তি প্রাইমাটোলজিস্ট জেন গুডঅল (১৯৩৪-২০২৫) “অ্যা ভেলোসিটি অফ বিয়িং: লেটারস টু অ্যা ইয়াং রিডার” বইটিতে। এটি নিছকই একটি বই নয়, এটি ভালোবাসা ও শ্রমের এক অনন্য ফসল, যা তৈরি করতে লেগেছে আট বছর। এই বইটিতে বিশ্বের সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক ১২১ জন মানুষের চিঠি রয়েছে, যাদের মধ্যে আছেন শিল্পী, লেখক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, উদ্যোক্তা, সঙ্গীতজ্ঞ এবং দুঃসাহসিক অভিযাত্রীরা। তারা সবাই শিশুদের কাছে লিখেছেন কীভাবে বই তাদের জীবনকে গঠন ও রূপান্তরিত করেছে।

“অ্যা ভেলোসিটি অফ বিয়িং: লেটারস টু অ্যা ইয়াং রিডার”, অনুপ্রেরণামূলক ১২১ জন মানুষের চিঠি রয়েছে।

“অ্যা ভেলোসিটি অফ বিয়িং: লেটারস টু অ্যা ইয়াং রিডার”, অনুপ্রেরণামূলক ১২১ জন মানুষের চিঠি রয়েছে।

প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে সিমন ডি বিউভোয়ার ভেবেছিলেন কীভাবে সুযোগ আর পছন্দের মিশেলে আমরা মানুষ হয়ে উঠি, ঠিক তেমনি জেন গুডঅল এই বইয়ে তরুণ পাঠকদের কাছে তার শৈশবের এক গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তার সেই অভিজ্ঞতা ছিল তার সময়, স্থান এবং তার নিজস্ব কিছু ঝোঁকের ফল। তার সেই হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া চিঠিটি ছিল এমন:

প্রিয় শিশুরা,
আমি তোমাদের সঙ্গে একটি বিশেষ কথা ভাগ করে নিতে চাই। আর তা হলো, যখন আমি তোমাদের বয়সী ছিলাম, তখন বইকে কতটা ভালোবাসতাম! অবশ্যই, তখন ইন্টারনেট বা টেলিভিশন কিছুই ছিল না। আমরা সবকিছু ছাপানো বই থেকেই শিখতাম।

যখন আমি ছোট ছিলাম, আমাদের পরিবারে তেমন টাকা-পয়সা ছিল না, তাই নতুন বই কেনার সামর্থ্য আমার ছিল না। ফলে আমার পড়ার বেশিরভাগ বই লাইব্রেরি থেকেই আসতো। তবে এর বাইরেও আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতাম একটি খুব ছোট পুরনো বইয়ের দোকানে।

সেই দোকানের মালিক ছিলেন একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক, যিনি কখনোই বইগুলো ঠিকমতো গুছিয়ে রাখার সময় পেতেন না। বইগুলো সব জায়গায় স্তূপ করে রাখা থাকত আর আমি সেখানেই বসে পড়তাম, চারদিকে কল্পনাতীত সব বিষয়ে তথ্যের ভাণ্ডার আমাকে ঘিরে রাখত। জন্মদিনে উপহার হিসেবে পাওয়া টাকা বা ছোটখাটো কাজ করে যা পেতাম, সবকিছু জমিয়ে রাখতাম শুধু একটি পুরনো বই কেনার জন্য।

হ্যাঁ, এখন তো তোমরা ইন্টারনেটে সবকিছু খুঁজে নিতে পারো। কিন্তু একটি বইয়ের মধ্যে সত্যিই বিশেষ কিছু আছে। হাতে ধরে রাখার সেই অনুভূতি, বিছানার পাশের টেবিলে বা বইয়ের আলমারিতে অন্যদের সঙ্গে গুছিয়ে রাখা অবস্থায় এর চেহারা, সবকিছুরই একটা আলাদা আকর্ষণ আছে।

আমি বিছানায় শুয়ে বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসতাম। আর যখন আলো নিভিয়ে দিতে হতো, তখন চাদরের নিচে টর্চ জ্বালিয়ে পড়তাম। সবসময় মনে মনে আশা করতাম মা যেন এসে আমাকে আবিষ্কার না করেন! শীতের সন্ধ্যায় আমি আগুনের সামনে কুঁকড়ে বসে পড়তাম। আর গ্রীষ্মকালে আমার প্রিয় বইগুলো নিয়ে উঠে পড়তাম বাগানের আমার সবচেয়ে প্রিয় গাছটিতে, আমার বিচ গাছ। সেখানে বসে আমি দূর-দূরান্তের জায়গার গল্প পড়তাম এবং কল্পনা করতাম আমি সত্যিই সেখানে আছি।

আমি বিশেষ করে ডক্টর ডুলিটলের গল্প পড়তে খুব ভালোবাসতাম, যিনি কীভাবে প্রাণীদের সঙ্গে কথা বলতে শিখেছিলেন। টারজান অফ দ্য অ্যাপস-এর গল্পও আমি খুব আগ্রহ নিয়ে পড়তাম। আর যত বই ঘাঁটতাম, তত বেশি পড়তে চাইতাম।

আমার বয়স যখন মাত্র ১০ বছর, তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে বড় হয়ে আমি আফ্রিকায় যাবো প্রাণীদের সঙ্গে থাকতে এবং তাদের নিয়ে বই লিখতে। আর শেষ পর্যন্ত আমি সেটাই করেছি! আমি আফ্রিকার শিম্পাঞ্জিদের সঙ্গে জীবন কাটিয়েছি এবং এখনও তাদের ও অন্যান্য প্রাণী সম্পর্কে বই লিখছি। সত্যি বলতে, বই লেখা যেমন ভালোবাসি, ঠিক তেমনই বই পড়তে ভালোবাসি। আশা করি তোমরা আমার লেখা কিছু বই পড়েও আনন্দ পাবে।

জেন গুডঅল

‘অ্যা ভেলোসিটি অফ বিয়িং’ বইটি থেকে এই অংশটি এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। এই বই বিক্রির সমস্ত আয় পাবলিক লাইব্রেরিতে দান করা হয়। জেন গুডঅল কীভাবে তার শৈশবের স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করেছিলেন, তা নিয়ে প্যাট্রিক ম্যাকডনেলের চমৎকার ছবি-বইটিও পড়ার মতো।

এছাড়া ‘অ্যা ভেলোসিটি অফ বিয়িং’ থেকে রেবেকা সলনিটের চিঠিটিও মন ছুঁয়ে যায়, যেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে বই আমাদের সান্ত্বনা দেয় এবং আমাদের ক্ষমতায়ন করে। একইভাবে, ১০০ বছর বয়সী হলোকাস্ট সারভাইভার হেলেন ফাগিনের চিঠিটিও গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে তিনি লিখেছেন একটি নির্দিষ্ট বই কীভাবে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের জীবন বাঁচিয়েছিল।

সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত প্রাণীবিদ, প্রাইমেট বিশেষজ্ঞ, নৃতত্ত্ববিদ ও সংরক্ষণবিদ ডেম জেন গুডঅল ৯১ বছর বয়সে মারা গেছেন। বিবিসি লিখেছে, তার পর্যবেক্ষণ মানুষ ও শিম্পাঞ্জির মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উন্মোচনে সহায়তা করেছে। তিনি বিশ্বজুড়ে প্রকৃতি সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন।

সূত্র: দ্য মার্জিনালিয়ান ডট অর্গ।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension