
নতুন বৈশ্বিক অর্থনীতি চায় যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ব্যাপারে নতুন ঘরানায় চিন্তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন চিন্তাভাবনার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং পশ্চিমা জোটকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে তারা।
নতুন ওই পন্থাটির বেশিরভাগই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সালিভানের বক্তব্যে উঠে এসেছে। সালিভান ওই বক্তব্য রাখেন ২৭ এপ্রিল। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ঘরানার চিন্তাভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
সালিভানের বক্তব্যে অবশ্য ভূরাজনীতির পরিসীমার বাইরের বিষয়াদিও উঠে এসেছে। বাইডেন প্রশাসনের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্যও ফুটে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র নতুন কৌশলগত শিল্পনীতি নিয়ে মার্কিন মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং মার্কিন গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করতে চায়। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে লড়তে এবং চীনের চেয়ে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়েও থাকতে চায় তারা।
অনেক মার্কিন মিত্রের ধারণা, বিদেশিদের স্বার্থের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। তারা বিশেষভাবে যা নিয়ে উদ্বিগ্ন তা হলো– মার্কিন শিল্প ও নবায়নযোগ্য প্রযুক্তিতে যে শত শত কোটি ডলারের ভর্তুকি দেওয়া হবে, তাতে ইউরোপীয় উৎপাদক ও শ্রমিকদের লোকসান হবে।
কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন যে, চীনের সঙ্গে ‘ঝুঁকিমুক্ত’ বাণিজ্যের চাপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। আবার অনেকে মনে করছেন, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র যে সংস্কারের দাবি তুলেছে, তা মুক্তবাণিজ্যের এ অভিভাবককে পঙ্গু করে দেবে।
মার্কিন কর্মকর্তারা এসব বিষয় শুনলেই ক্ষোভ প্রকাশ করছে। তারা সালিভানের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করছে, পশ্চিমা মিত্রদের স্বার্থের কথা নিজ বক্তব্যে বলেছেন তিনি। তারা আরও বলছে, অবশেষে আমেরিকা জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে বিশ্বে নেতৃস্থানীয় অবস্থান নিচ্ছে এবং এ বিষয়টিকে গোটা বিশ্বে স্বাগত জানানো উচিত।
সালিভানও বারবার বলছেন, চীনের সঙ্গে ঝুঁকিমুক্ত সম্পর্কের মানে বৈশ্বিক সরবরাহ চেন থেকে চীনকে বাদ দেওয়া নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বিশ্ব তৈরির চেষ্টা করছি, যেখানে গুরুতর পণ্যের ক্ষেত্রে একাধিক উৎস থাকবে। আমরা বলছি না যে, চীনের আইফোন বা সোলার প্যানেল তৈরি থেকে সরে আসা উচিত। বরং বলছি যে, অন্যান্য দেশেরও এতে হাত দেওয়া উচিত।
‘ওয়াশিংটনের নতুন ঐকমত্য’ সবার জন্যই কাজে দেবে বলে মার্কিন মিত্রদের আশ্বস্ত করতে চাইছেন সালিভান। তিনি মনে করেন, হিরোশিমায় অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক জি-৭ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অন্যদিকে সম্মেলনটি সামনের দিকে উল্লেখযোগ্য একটি পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে।
সালিভান বিশ্বাস করেন, মার্কিন মিত্ররা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ অর্থনীতির পেছনে ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে ভালোভাবে নিশ্চিত হয়েছেন এবং তারাও একই ধরনের পথ অবলম্বন করবেন।
কিন্তু মার্কিন মিত্ররা অনেকেই তা মনে করছেন না। এসব মিত্রের মধ্যে জি-৭ এবং এর বাইরের রাষ্ট্রও রয়েছে। তাদের মধ্যে মার্কিন নীতি নিয়ে এখনও অস্বস্তি কাজ করছে। তাদের উদ্বেগের মধ্যে অন্যতম একটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র চীনকে ঘিরে নানা পদক্ষেপ নেবে এবং পরবর্তীকালে মিত্র দেশগুলোরও একই কাজ করার জন্য চাপের মুখে পড়তে হবে।
সিঙ্গাপুরের উপপ্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওঙ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘যদি ঝুঁকিমুক্তকরণ বেশি দূর যায়… তাহলে আরও টুকরো এবং দ্বৈত বিশ্ব অর্থনীতির সম্মুখীন হতে পারি আমরা।’
এসব অর্থনৈতিক আলোচনার মাথার ওপরই রয়েছে নানা ভূরাজনৈতিক শঙ্কা। একদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্তে যুদ্ধ করছে রাশিয়া; অন্যদিকে জাপান শঙ্কায় আছে চীনকে নিয়ে। সবাই সামরিক সুরক্ষা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের শরণাপন্ন হয়েছে। সালিভানের মতবাদ নিয়ে মার্কিন মিত্রদের মনে দ্বিধা থাকতেই পারে, কিন্তু তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তর্কে জড়ানোর সময় এটি নয়।
(মতামতটি লিখেছেন ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রধান পররাষ্ট্রবিষয়ক ভাষ্যকার গিডেওন র্যাকম্যান)
সূত্র : ফিন্যান্সিয়াল টাইমস



