ভারত

মণিপুরের দাঙ্গায় দোষ ঢাকতে এবার সিবিআই ডাকল ভারত সরকার

অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরুর আগেই মণিপুরে দুই নারীকে নগ্ন করে ঘোরানোর ভাইরাল হওয়া ভিডিওর সার্বিক তদন্তের ভার সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হলো। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়ে দিল, ওই ঘটনার বিচার মণিপুরের বাইরে করানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দাখিল করা হবে।

বিরোধীদের অভিযোগ, এটা করা হলো দুই কারণে। প্রথমত, সিবিআইয়ের হাতে তদন্তভার তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পাশাপাশি শাসক দল (দুই জায়গাতেই বিজেপি) নিজেদের ‘অপদার্থতা’ আড়াল করতে চাইছে। খাতায়-কলমে সিবিআই ‘স্বশাসিত’ হলেও পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের ‘নিয়ন্ত্রণাধীন’। নিজের ইচ্ছেমতো সরকার তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। নিয়ন্ত্রণ এতটাই নিরঙ্কুশ যে একটা সময়ে সুপ্রিম কোর্ট সিবিআইকে সরকারের ‘খাঁচায় বন্দী তোতা পাখি’ বলে ভর্ৎসনা করেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, সরকার চাইছে সিবিআইয়ের হাতে তদন্তভার তুলে দিয়ে এবং সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিষয়টিকে ‘বিচারাধীন’ তকমা দিতে, যাতে সেই অজুহাতে বাড়াবাড়ি রকমের কোনো সমালোচনা থেকে সরকার নিজেকে আড়াল করতে পারে।

কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্তটি নিয়েছে বেশ ভেবেচিন্তেই। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা মণিপুর নিয়ে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র জমা দেওয়া অনাস্থা প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এখনো তা নিয়ে আলোচনার দিনক্ষণ জানাননি। এই ফাঁকে ‘ইন্ডিয়া’ জোট জানিয়েছে, তাদের প্রতিনিধিরা আগামীকাল শনি ও পরশু রোববার মণিপুর সফর করবেন।

এর আগে গত ২৯ ও ৩০ জুন মণিপুর সফর করেছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর পর তৃণমূল কংগ্রেস পাঠিয়েছিল তাদের পাঁচ নেতার এক প্রতিনিধিদলকে। কিন্তু প্রায় তিন মাস ধরে জাতিদাঙ্গা চলা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একবারও সেখানে যাননি। সংসদে মুখও খোলেননি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একবার দুই দিনের জন্য গিয়েছিলেন, কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতির দাবিতেই বিরোধীরা মুখর। অনাস্থা প্রস্তাব আনার উদ্দেশ্যও তা-ই।

অনাস্থা প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, আলোচনার দিনক্ষণ স্থির হয়নি, প্রধানমন্ত্রীও বিরোধীদের দাবি মেনে সংসদে মণিপুর নিয়ে মুখ খোলেননি। ফলে বিরোধীরাও সংসদ স্বাভাবিক হতে না দিয়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেছেন। এই সুযোগে সরকার গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করিয়ে নিচ্ছে। সেটা অসংসদীয় আচরণ বলে বিরোধীরা দাবি জানিয়েছেন।

কংগ্রেসসহ অন্য বিরোধীরাও এ নিয়ে সরব। কংগ্রেসের লোকসভা সদস্য কার্তি চিদাম্বরমের দাবি, একবার অনাস্থা প্রস্তাব গৃহীত হলে তা আলোচনা না হওয়া পর্যন্ত সরকার গুরুত্বপূর্ণ বিল বা অন্যান্য সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে পারে না। সংসদীয় কার্যপ্রণালিতেই এই কথা বলা হয়েছে। অথচ দুই সভার অধ্যক্ষ বিল পাস করিয়ে চলেছেন। কংগ্রেস নেতা মণীশ তিওয়ারিও একই দাবি জানিয়ে বলেছেন, সংসদ কীভাবে চলবে, তা ‘রুল বুকে’ স্পষ্ট লেখা রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না।

আজ শুক্রবার লোকসভার অধিবেশন শুরু হতেই কংগ্রেসের লোকসভা নেতা অধীর চৌধুরী আপত্তি জানিয়ে বলেন, অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তাঁর দাবি, অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা ফেলে রাখা যায় না। দ্রুত এর নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পেশ ও গ্রহণ করার দিনেই আলোচনা শুরু করা হয়েছিল। এটাই সংসদীয় প্রথা। অথচ এখানে ফেলে রাখা হয়েছে।

স্পিকার ওম বিড়লা নির্বিকার। তিনি শুধু বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্ব চালাতে দিতে হবে। অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার দিনক্ষণ তিনি ঠিক সময়ে জানাবেন। সংসদীয় মন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ‘এখনো ১০ দিন সময় আছে। প্রস্তাব পরাস্ত করার সংখ্যাও আমাদের আছে। যেদিন সময় দেবেন, সেদিনই আমরা আলোচনায় প্রস্তুত।’

দিল্লি সরকারের আমলাদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় সরকার যে অধ্যাদেশ জারি করেছে, আগামী সোমবার তা লোকসভায় বিল আকারে প্রস্তুত করার সম্ভাবনা প্রবল। বিরোধীরা চায় না অনাস্থা প্রস্তাবের ফয়সালা হওয়ার আগে ওই বিল নিয়ে আলোচনা হোক। কারণ, বিলের বিরোধিতা করতে গেলে বিরোধীদের সভার কাজ সুষ্ঠুভাবে চালাতে দিতে হবে। বিতর্কে অংশ নিতে হবে। বিরোধীরা তা চান না।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension