সাহিত্য

রবিঠাকুরের প্রেম ও প্রেমিকাদের কথা

আপাদমস্তক একজন প্রেমিক পুরুষ ছিলেন রবীন্দনাথ ঠাকুর। বলা চলে, রবিঠাকুর প্রেমের জন্য বেশ মরিয়া ছিলেন। জীবনে একাধিকবার প্রেমের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়েছেন তিনি। নিজেকে উজাড় করে দিয়ে ভালোবেসেছেন প্রেমিকাদের।

তার সাহিত্যেও প্রেম ও প্রেমিকার রেখাপাত ঘটেছে আকারে-ইঙ্গিতে। কবির ব্যক্তিগত জীবনের প্রেম সম্পর্কে অনেকেই অবগত নই। বিশ্বকবির প্রেম নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেকের নাম উঠে আসে। রবীন্দ্র জীবনে যেসব নারীদের ঘনিষ্টভাবে পাওয়া যায় তারা হলেন স্ত্রী মৃণালিনী, মারাঠি কন্যা আন্না তড়খড়, কাদম্বরী বৌঠান, আর্জেন্টিনার ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো এবং রবীন্দ্ররচনার গুণমুগ্ধ পাঠিকা হেমন্তবালা দেবী, ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা ও রবীন্দ্রভক্ত রাণু অধিকারী।

মারাঠি কন্যার প্রেমে
মুম্বাই থাকাকালে প্রথম প্রেমে পড়েন রবীন্দ্রনাথ। তখন মুম্বাইয়ের নাম ছিল বোম্বাই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম প্রেমে পড়েন এক মারাঠি কন্যার। নাম আন্না তড়খড়। তার সঙ্গে কবির প্রেম ছিল মাত্র একমাসের সামান্য কিছু বেশি সময়। এই প্রেম খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও বেশ তাৎপর্যময় ছিল। জীবনের প্রথম প্রেম বলে কথা! কবি তখন সবে কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে। আন্না ছিলেন বিদুষী, বুদ্ধিমতী। এই মারাঠি কন্যা কবির কাছ থেকে ভালোবেসে একটি ডাক নাম চেয়েছিলেন। কবি ‘নলিনী’ নামটি তার কাব্যভাবনা থেকে শুধুমাত্র তার জন্যই বুঝি তুলে এনেছিলেন। সেই নাম পেয়ে আন্না বলেছিলেন, ‘কবি, তোমার গান শুনলে আমি বোধ হয় আমার মরণ দিনের থেকেও প্রাণ পেয়ে জেগে উঠতে পারি।’

আন্না তড়খড় ছিল ডা. আত্দারাম পাণ্ডুরংয়ের কন্যা। জানা যায় তাদের যোগাযোগ ছিল পত্র বিনিময়ের মাধ্যমে। কবির প্রথম জীবনে রচিত বহু কাব্য-কবিতায়-নাটকে নলিনী নামটি এসেছে বহুভাবে। বহুকাল পরেও অতুলপ্রসাদ সেন এবং দিলীপকুমার রায়ের সঙ্গে একান্ত আলাপে এই তরুণীর কথা স্মরণ করতে দেখা যায় কবিকে। প্রেম প্রণয়ের দেখা না পেলেও, আন্নার সঙ্গে বহুদিন কবির পত্র যোগাযোগ ছিল।

কাদম্বরীর প্রেমে
রবীন্দনাথ ঠাকুর জীবনে বয়ঃসন্ধির সংবেদনশীল পর্যায়ে কাদম্বরী বৌঠান খুব বেশিই প্রভাব ফেলেছিলেন। কাদম্বরী বৌঠানকে বলা হয় রবীন্দ্রনাথের স্থপতি। কিশোর মনে ছাপ ফেলতে কাদম্বরীর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। কাদম্বরী এবং রবীন্দ্র দুজনে প্রায় সমবয়সী ছিলেন। বৌঠান ছিলেন তার জ্যোতিদাদার সহধর্মিণী। কবির অনেক সাহিত্য ও কবিতা সৃষ্টি এই নারীকে ঘিরে।

কবি কাদম্বরীকে নিয়ে ‘ভারতী’ পত্রিকায় লিখেন, ‘সেই জানালার ধারটি মনে পড়ে, সেই বাগানের গাছগুলো মনে পড়ে, সেই অশ্রুজলে সিক্ত আমার প্রাণের ভাবগুলোকে মনে পড়ে। আর একজন যে আমার পাশে দাঁড়াইয়া ছিল, তাহাকে মনে পড়ে, সে যে আমার খাতায় আমার কবিতার পার্শ্বে হিজিবিজি কাটিয়া দিয়াছিল, সেইটে দেখিয়া আমার চোখে জল আসে। সেই ত যথার্থ কবিতা লিখিয়াছিল। তাহার সে অর্থপূর্ণ হিজিবিজি ছাপা হইল না, আর আমার রচিত গোটাকতক অর্থহীন হিজিবিজি ছাপা হইয়া গেল।’

এর কিছুকাল পরেই কবি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হলেন। কিশোরী বৌদিটির সঙ্গে বালক রবির সম্পর্ক ছিল সৌখিন ও খুনসুটির। দুজনের মধ্যে বোঝাপড়ার কারণেই এই সুসম্পর্ক দাঁড়িয়েছিল। ‘চারুলতা’ আর ‘নষ্টনীড়ে’ সেই ছাপই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়।

বিদেশি কন্যা ভিক্টোরিয়ার প্রেমে
বিদেশিকন্যা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। ভিক্টোরিয়াকে বেশ আপন করে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই প্রেমের গাথা রচিত হয়েছিল আর্জেন্টিনার প্লাতা নদীর তীরে। এ নদীর তীর ঘেঁষে কবির সঙ্গী হয়ে পথ চলেছেন বিদেশিনী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। যাকে স্বরচিত কবিতা পড়ে শোনাতেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তখন নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ বিশ্বে খুব পরিচিত। দেশে-বিদেশে তার অসংখ্য ভক্ত। রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থে বিমুগ্ধ ছিলেন ওকাম্পো। এক ফরাসি সাহিত্যিকের অনূদিত গীতাঞ্জলি পড়েই ওকাম্পো প্রেমে পড়েন রবীন্দ্রনাথের।

রবীন্দ্রনাথ বিশ্ব ভ্রমণের একপর্যায়ে আর্জেন্টিনা পৌঁছান। সেখানে পৌঁছেই বিপুল সংবর্ধনা পান তিনি। প্রিয় কবিকে কাছে পেয়ে ওকাম্পো উদ্বেলিত হয়েছিলো। ক্রমেই কবির কাছে তিনি ভালো লাগার যে আবেদন প্রকাশ করেছেন তাতে দুজনের মধ্যে বেশ গোছানো একটি সুসম্পর্ক তৈরি হয়।

অনেকেই দাবি করেন রবীন্দ্রনাথের বহুল জনপ্রিয় গান, ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী’ তাকে ভেবেই লেখা। কিন্তু গানটি লেখা হয়েছিলো ১৮৯৫ সালে, শিলাইদহে। আর রবীন্দ্রনাথ আর্জেন্টিনা যান আরো অনেক পরে, সম্ভবত ১৯২৪ সালে। হয়তো বা শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ যাকে নিয়ে গান রচনা করেছিলেন সে ছিলেন রবীন্দ্র জীবনের আরেক প্রেমের উপাখ্যান।

পাঠিকার প্রেমে
রবীন্দনাথ ঠাকুর জীবনে প্রেম অধ্যায়ে পাওয়া যায় একজন হেমন্তবালা রায় চৌধুরীকেও। হেমন্তবালা ছিলেন রবীন্দ্ররচনার গুণমুগ্ধ পাঠিকা। দুজনের মধ্যে আলাপ হতো পত্র বিনিময়ের মাধ্যমে। তার সঙ্গে কবির একাধিক পত্র বিনিময় হয়েছে। কবিকে হেমন্তবালা ডাকতেন ‘কবিদাদা’। নানা অজুহাতে, পারিবারিক বাধা সত্ত্বেও এমন কি রাতের বেলায়ও ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ি থেকে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে হঠাৎ গিয়ে হাজির হতেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথকে একটি চিঠিতে হেমন্তবালা লেখেন, ‘আপনি আমার দেবতা, আমার কল্পলোকের রাজা। আমার দুর্ভাগ্য যে, আমার পূর্ণ পূজা আপনার চরণে দিতে পারছি না। আপনি কি আমার মন দেখতে পারছেন না?’ গুণমুগ্ধ এই পাঠিকাকে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমাতেই আপন করে নিয়েছিলেন রবীন্দনাথ ঠাকুর।

স্ত্রীর সমবয়সী ইন্দিরার প্রেমে
স্ত্রী মৃণালিনীর সমবয়সী ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাকেও একটু ভিন্নভাবেই রবীন্দ্রনাথের জীবনে পাওয়া যায়। ইন্দিরা বয়সে ছোট হলেও মনের দিক থেকে কবির সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক ছিল। ইন্দিরাকে লেখা বেশ কিছু চিঠি পড়েই সেটা স্পষ্ট হয়। ইন্দিরা বহুদিন অনূঢ়া ছিলেন। সংগীতচর্চায় আগ্রহ ও সাহিত্য অনুরাগের কারণে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ইন্দিরার। ইন্দিরা কবিকে ‘রবিকা’ সম্বোধন করতেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইন্দিরার পত্র বিনিময় নিয়েও ছড়িয়ে আছে অনেক কথা। রবীন্দ্রনাথ ইন্দিরার চিঠির লম্বা লম্বা উত্তর লিখতেন। অবস্থাটা এমন যে অন্য সব কাজ ফেলেও ইন্দিরাকে আগে চিঠি লেখা চাই-ই।

রাণুর প্রেমে রবি
জীবনের শেষভাগে রাণু অধিকারীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মনের মিলন ঘটে। রাণু ছিলেন অভিজাত শ্রেণির। তার বাবা অভিবাসী হিন্দু-বাঙালি। কাশীতে দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন। আর মা বাঙালি হয়েও বেড়ে উঠেছিলেন পাঞ্জাবে। হয়তো এ জন্যই রাণুর পরিবারে বাঙালি গণ্ডির বাইরেও সর্বভারতীয় উদার জীবনের ছাপ দেখা যেত। ছোটবেলায় মা রাণুকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন।

১৯১৮ থেকে ১৯২৪_ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তৈরি হলো রাণুর তীব্র প্রেমের সম্পর্ক। ১৮ বছরে রাণু লিখলেন ৬৩ বছরের রবীন্দ্রনাথকে, তোমার সঙ্গে আমার তো বিয়ে হয়ে গেছে। একদিন আমি তোমার সমস্ত আদর পেয়েছি। আমার সমস্ত শরীর ছেয়ে আছে সে আদর। রাণুর এই বুকফাটা আর্তি সাড়া পেল না সামাজিক চাপে নীরব রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে।

১৯২৫ সাল। রাণু ১৯। তার বিয়ে হয়ে গেল শিল্পপতি বীরেন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। কাশীর রাণু অধিকারী রাতারাতি লেডি রাণু মুখোপাধ্যায়। রবি-রাণুর ছয় বছরের সম্পর্ক ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

মৃণালিনীর সঙ্গে কবির জীবন
স্ত্রী মৃণালিনীর সঙ্গে কবির জীবন ছিল সরল ও স্বাভাবিক। সেখানেও প্রেমের ছোঁয়া এতটুকু কম পড়েনি। ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর ২২ বছর বয়সে হঠাৎ করে অপ্রত্যাশিতভাবেই বিয়ে হয় রবীন্দ্রনাথের। খুলনা জেলার ফুলতলা গ্রামের বেনী মাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারণীর বয়স তখন ১২ বছর। বেনী মাধব ছিলেন ঠাকুর এস্টেটের একজন সামান্য কর্মচারী। বিয়ের পরপরই নতুন বধুর নামকে আধুনিক করার জন্য নাম রাখা হয় মৃণালিনী দেবী।

সাংসারিক জীবনে রবীন্দ্রনাথ তার স্ত্রীকে অনেক সম্মান করতেন ও ভালোবাসতেন। তিনি তার স্ত্রীকে শিক্ষিত করেছিলেন ও পত্র লেখা শিখিয়েছিলেন। নিয়মিত স্ত্রীর পত্র না পেলে মন খারাপ হতো তার। মৃণালিনীকে নিয়ে তার সাহিত্যে তেমন লেখালিখি না থাকলেও তাদের নিজেদের মধ্যে নীরব ভালোবাসার আদান প্রদান হতো। সাংসারিক জীবনে নানান সময়ের ভালো থাকা ও মন্দ থাকার মাঝে মৃণালিনী দেবী সবসময়েই কবির পাশে থেকেছেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension