বাংলাদেশ

‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে, জবাব দেন’

‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে, আমি জানতে চাই। আমাকে জবাব দেন। আমি কুমিল্লায় চাকরি করতে এসেছি, এটা কি আমার অন্যায়? আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে? আমি শুধু এটুকু জানতে চাই। আমি কোন দেশে থাকি, এটা কোন দেশ? একটা ছেলে বাসা থেকে বের হবে, তাকে মেরে ফেলবে!’

এভাবেই একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বুকফাটা আহাজারি করছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও লেখক ড. নাহিদা বেগম। কখনো ছেলেকে হারানোর শোকে বিলাপ করছেন, কখনো ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে মূর্ছা যাচ্ছেন। সন্তানের এমন মৃত্যু যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না এই মা।

কী অপরাধ ছিল তাঁর সন্তানের? কেন তার সন্তানকে এভাবে প্রাণ দিতে হলো? বারবার একই প্রশ্নে উত্তর খুঁজছেন তিনি।

নাহিদা ইসলাম বিলাপ করে এও বলছেন, ‘আমি বাঁচব কীভাবে? আমার জীবনটা কীভাবে পার করব, কীভাবে জীবন কাটাব? আমার একমাত্র ছেলে। আমি কেমনে বাঁচব? এই ছেলের মুখ আমরা কীভাবে দেখব?’

গতকাল শুক্রবার বিকেলে মায়ের মুঠোফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাসা থেকে বের হয়েছিল ১৩ বছরের স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। এরপর আর বাড়ি ফেরা হয়নি তার। স্বজনদের অপেক্ষা, উদ্বেগ আর খোঁজাখুঁজির অবসান হয়েছে এক মর্মান্তিক পরিণতির মধ্য দিয়ে। নিখোঁজের এক দিন পর আজ শনিবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশের একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তার মরদেহ। অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানা গেছে।

পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।

নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও লেখক ড. নাহিদা বেগম এবং কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র ছেলে। সে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। যে সন্তানকে ঘিরে ছিল মা-বাবার স্বপ্ন, যে সন্তানকে নিয়ে ছিল পরিবারের স্বপ্ন, সেই সন্তানকেই হারিয়ে এখন শোকে মুহ্যমান পরিবারটি।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকায় নিজেদের বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। সঙ্গে ছিল তার মায়ের আইফোন। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকেই তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত—ছেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে মা-বাবার। কোথায় গেল অপ্রতিম, কার সঙ্গে আছে, কখন বাড়ি ফিরবে—এমন নানা প্রশ্নে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন তাঁরা। স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছে খোঁজ নিতে থাকেন। সম্ভাব্য বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও ছেলের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না।

ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে শুক্রবার দিবাগত রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন ড. নাহিদা বেগম। সেখানে তিনি জানান, তাঁর ছেলে অপ্রতিমের বয়স ১৩ বছর। সে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। নিখোঁজ হওয়ার সময় তার পরনে ছিল একটি পাঞ্জাবি। মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

ফেসবুক পোস্টে ছেলেকে খুঁজে পেতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। একই সঙ্গে জানান, বিষয়টি থানায়ও জানানো হয়েছে। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের সহযোগিতা চেয়েছিলেন এই মা। কিন্তু তখনো জানতেন না, তাঁর আদরের সন্তান আর কোনো দিন ঘরে ফিরবে না।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত অপ্রতিমের মুঠোফোনটির অবস্থান কুমিল্লার গন্ধমতী এলাকায় দেখা যাচ্ছিল। এরপর আর ফোনটির কোনো অবস্থান পাওয়া যায়নি।

অপ্রতিম সাধারণত যেসব বন্ধুর সঙ্গে চলাফেরা করত, তাদের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই বন্ধুরা নিজ নিজ বাসায় রয়েছে। এদিকে ছেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।

নিখোঁজ ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় মা-বাবা যখন অপেক্ষা করছিলেন, তখনই আজ শনিবার দুপুরে আসে সেই দুঃসংবাদ। কোটবাড়ি এলাকার দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশের একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

যে সন্তানকে খুঁজে পেতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহযোগিতা চেয়েছিলেন মা, পরদিন সেই সন্তানের মরদেহ উদ্ধারের খবর তাঁকে ভেঙে দেয়। মুহূর্তেই বদলে যায় পরিবারের সব আশা-প্রত্যাশা। স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।

একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারও। সন্তানের এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। তাঁর কণ্ঠে ক্ষোভ, অসহায়ত্ব আর সন্তান হারানোর গভীর বেদনা।

ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমার একটি মাত্র ছেলে। সে অন্যায় করলে তাকে মেরে ফেলুক—সে তো অন্যায় করেনি। একটা ফোনের জন্য একটা মানুষকে মেরে ফেলবে! এটা কী হলো? এটা কীভাবে সম্ভব? ফোনের দাম আছে, একটা মানুষের দাম নেই?’

ছেলের নিখোঁজ হওয়ার পর সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন বলে জানান তিনি। কিন্তু সেই জিডি করার পরও ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার যে আশা ছিল, তা শেষ হয়ে গেছে শনিবার মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে।

সন্তান হারানোর শোকের মধ্যেও ছেলের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন ফিরোজ শাহরিয়ার। তিনি চান, যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক এবং অপরাধের উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করা হোক।

একটি মুঠোফোনের জন্য যদি একজন শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই ঘটনার বিচার দাবি করাই এখন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় চাওয়া। যে সন্তানকে ঘিরে ছিল তাঁর জীবনের এত আয়োজন, সেই সন্তানকে হারিয়ে এখন ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।

আজ শনিবার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান। এ সময় সদর দক্ষিণ থানা-পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যরাও তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে তিনি সদর দক্ষিণ থানা-পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। সেখান থেকে শিক্ষার্থী অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান জানান, এ ঘটনায় সন্দেহভাজন এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটনে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়া, মুঠোফোনের অবস্থান এবং মরদেহ উদ্ধারের স্থানসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের একাধিক দল মাঠে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান (পিপিএম)। তিনি বলেন, ‘আমাদের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে এবং আমরা কিছু ক্লু পেয়েছি। আমাদের কাছে একজন ব্যক্তি আছে, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।’

পুলিশ সুপার আরও বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সঠিকভাবে খতিয়ে দেখব, তদন্ত করব এবং প্রকৃত হত্যাকারীকে না ধরা পর্যন্ত আমরা ননস্টপ এটা নিয়ে কাজ করব।

এদিকে নিহত অপ্রতিমের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আজ তাঁদের কোটবাড়ির বাসায় যান কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন। অপ্রতিমের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।

সন্তান হারানোর শোকে মুহ্যমান পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন সংসদ সদস্য। তবে একমাত্র সন্তানকে হারানোর যে গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো সান্ত্বনাতেই পূরণ হওয়ার নয়।

অপ্রতিমের মৃত্যুতে কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নই ভেঙে যায়নি, শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার পরিচিতজনদের মধ্যেও। একজন কিশোরের এমন মৃত্যু ঘিরে উঠেছে নিরাপত্তা ও অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার প্রশ্ন।

একটি শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপন, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা ছবি তোলার জন্য বাসা থেকে বের হওয়া—এসবই ছিল তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কিন্তু সেই বের হওয়াই যে পরিবারের জন্য এমন দুঃসহ পরিণতি ডেকে আনবে, তা কল্পনাও করেননি মা-বাবা।

ড. নাহিদা বেগমের বুকফাটা আহাজারিতে বারবার ফিরে আসছে সেই প্রশ্ন—‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে?’ সন্তান হারানোর বেদনায় তাঁর এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই।

এদিকে শনিবার বিকেলে অপ্রতিম হত্যায় আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension