
ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা: ফাঁস হয়ে গেল আমেরিকার পরিকল্পনা, ছাড়তে হবে দেশের অংশ
দুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে শান্তি চুক্তির নতুন পরিকল্পনা আঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২৮ দফার পরিকল্পনায় কী কী থাকতে পারে, তার কিছু অংশ প্রতিবেদনে তুলে এনেছিল আরেক সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস। এর মধ্যে গতকাল ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের ২৮ দফার শান্তি চুক্তির প্রস্তাবনা সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেছে।
অ্যাক্সিওস তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, এই পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী যুদ্ধ বন্ধ করতে চাইলে ইউক্রেনকে তাদের দেশের পূর্ব দিকের অঞ্চল দনবাস রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দিতে হবে। পাশাপাশি শান্তিচুক্তির পরিকল্পনায় ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর ক্ষমতাও ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে, তবে তার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়া হবে তাদেরকে।
অ্যাক্সিওস লিখেছে, ইউক্রেন এবং তাদের মিত্রপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনাকে রাশিয়ার প্রতি অনেক বেশি ছাড় হিসেবে দেখতে পারে। তবে পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওই যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের কর্মকর্তা বলেছেন, হোয়াইট হাউসের বিশ্লেষণ হলো, এই যুদ্ধ চলতে থাকলে এমনিতেই আরও অনেক অঞ্চল ইউক্রেনের হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, ‘সে কারণে এখনই একটা চুক্তিতে চলে যাওয়া ইউক্রেনের জন্যই ভালো।’
পরিকল্পনায় কী আছে?
ইউক্রেন যুদ্ধে শান্তি চুক্তির আলোচনায় এখন পর্যন্ত বড় কাঁটা হয়ে থাকা দুটি বিষয় হলো – যুদ্ধ শেষে কোন অঞ্চল কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আর ইউক্রেন কীভাবে নিশ্চিত হবে যে রাশিয়া পরে আবার যুদ্ধ শুরু করবে না।
ট্রাম্পের ২৮ পয়েন্ট পরিকল্পনায় লুহানস্ক ও দোনেৎস্কের নিয়ন্ত্রণ কার্যত (ডি ফ্যাক্টো) রাশিয়ার হাতেই থাকবে। দুই অঞ্চলকে একসঙ্গে দনবাস হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। দনবাস অঞ্চলের বেশিরভাগেরই নিয়ন্ত্রণ সাড়ে তিন বছরের যুদ্ধে রাশিয়ার হাতে চলে গেছে। ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের বিশ্লেষণ বলছে, এখন শুধু ১৪.৫% অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ আছে ইউক্রেনের হাতে।
তবে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দনবাসের যে অংশ ইউক্রেন ছেড়ে দেবে, সে অঞ্চলকে ‘বেসামরিকীকৃত এলাকা’ হিসেবে দেখা হবে, অর্থাৎ রাশিয়াও এখানে কোনো সৈন্য রাখতে পারবে না।
এর বাইরে আরও দুই যুদ্ধপীড়িত অঞ্চল খেরসন ও ঝাপোরিঝিয়াতে এখন যার যতটুকুতে নিয়ন্ত্রণ যে অবস্থায় আছে, সেভাবেই রাখা হবে, সে ক্ষেত্রে আলোচনা সাপেক্ষে রাশিয়াকে কিছু ছাড় দিতে হতে পারে।
ভেতরের কথা:
ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য দেশগুলো ক্রিমিয়া (২০১৪ সালে যুদ্ধে এর দখল রাশিয়ার হাতে চলে গেছে, তবে একে এখনো রাশিয়ার বলে স্বীকৃতি দেয় না বেশিরভাগ দেশ) এবং দনবাসকে রাশিয়ার অংশ বলে স্বীকার করে নেবে। তবে ইউক্রেনকে তা স্বীকার করে নিতে বাধ্য করা হবে না।
অ্যাক্সিওস লিখেছে, ইউক্রেনের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে, ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর আকার এবং দেশটির দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত রাখার সীমা অনেক কমিয়ে আনা হবে। যার বিপরীতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তা গ্যারান্টি পাবে। তবে ভবিষ্যতে রাশিয়া আক্রমণ করলে সেটা ঠেকাতে সাহায্যের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টিতে আর কী কী থাকবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
আরও যারা জড়িত
পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত দুটি সূত্রের কাছ থেকে পাওয়া জানিয়ে অ্যাক্সিওস লিখেছে, কাতার এবং তুরস্ক ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার খসড়া বানানোর কাজে জড়িত ছিল। যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার সমর্থনও করছে এই দুই দেশ।
পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত সূত্র দুটির মধ্যে একজনের মন্তব্য জানিয়ে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে লেখা, ‘গাজায় যুদ্ধ বন্ধেও কাতারি ও তুরস্কের মধ্যস্থতা সাহায্য করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধেও তাদের সাহায্য কাজে আসতে পারে।’
ট্রাম্পের দূত স্টিভ হুইটকফ এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রুস্তেম উমেরভের সঙ্গে গত সপ্তাহে বৈঠকে বসেছিলেন এক উচ্চপদস্থ কাতারি কর্মকর্তা, এমনটাই অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি সূত্র।
পর্দার আড়ালের খেলা
পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট এক সূত্র বলেছেন, হুইটকফের সঙ্গে আলোচনা করতে উমেরভকে যথাযথ ক্ষমতা দিয়ে পাঠিয়েছিলেন জেলেনস্কি। ট্রাম্পের ২৮ দফার পরিকল্পনায় উমেরভের অনেক মন্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
তবে ইউক্রেনের এক কর্মকর্তার কথা জানিয়ে অ্যাক্সিওস লিখেছে, জেলেনস্কি উমেরভকে পাঠিয়েছিলেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত হতে। শুধু মৌখিক আলোচনা হয়েছে সেখানে এবং উমেরভ লিখিত কোনো প্রস্তাবনা পাননি বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের ওই কর্মকর্তা। উমেরভ পরিকল্পনাটা মেনে নেননি এবং এর বেশ কিছু পয়েন্টে ইউক্রেনের আপত্তি আছে বলেও জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।
উমেরভের সঙ্গে বৈঠকের আগে হুইটকফ রাশিয়ার দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।
যার আপত্তি যেসব পয়েন্টে
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় তুরস্কের সমর্থনের অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার আঙ্কারায় জেলেনস্কি এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে হুইটকফের বৈঠকের কথা ছিল বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা। তবে উমেরভ-হুইটকফের বৈঠকের আলোচনার সঙ্গে জেলেনস্কি একমত নন বলে এবং তিনি (জেলেনস্কি) ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী হননি বলে বৈঠকটা পিছিয়ে দেওয়া হয়। জেলেনস্কি সে সময়ে বরং আঙ্কারাতেই ইউরোপিয়ান মিত্রদের সঙ্গে মিলে আরেকটি শান্তিচুক্তির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওই কর্মকর্তার মতে, জেলেনস্কি ও ইউরোপিয়ান মিত্রদের ওই পরিকল্পনার কিছুই রাশিয়া কখনো মেনে নেবে না।
ইউক্রেনের এক কর্মকর্তা অবশ্য বলছেন, হুইটকফের সঙ্গে জেলেনস্কির বৈঠক পিছিয়ে দেওয়ার কারণ হলো, জেলেনস্কি এই পরিকল্পনা নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করতে চেয়েছেন।
এরপর কী
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার কথা ফাঁস হওয়ার পর থেকে চারিদিক থেকেই প্রতিক্রিয়া আসছে। রাশিয়া বলছে, তারা নতুন কোনো পরিকল্পনা নিয়ে কিছু জানে না। গত আগস্টে আলাস্কায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচনায় যা বলা হয়েছে, সেটিকেই রাশিয়া নিজেদের অবস্থান হিসেবে দেখে। আজ আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ক্রেমলিন জানিয়েছে, ইউক্রেন নিয়ে যেকোনো শান্তি চুক্তি হতে হবে এমন যার মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পেছনে মূল সমস্যার সমাধান আসে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হলেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে এখনো এমন কোনো শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়নি বলেই জানিয়েছে ক্রেমলিন।
এদিকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক বিভাগের প্রধান কাজা কাল্লাসের পাশাপাশি জার্মানি, পোল্যান্ড, স্পেন, সুইডেনের মতো দেশ একই সুরে বলেছে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে আলোচনার টেবিলে না রেখে ইউক্রেন নিয়ে কোনো শান্তি চুক্তি হতে পারে না।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের প্রতিনিধিরা আজ ইউক্রেনে জেলেনস্কির সঙ্গে দেখা করেছেন। এরপর জেলেনস্কির দপ্তর বলেছে, জেলেনস্কি শান্তিচুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলবেন।
আর রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা টিএএসএস-এ হাঙ্গেরিয়ান বিশেষজ্ঞ এবং দেশটির বেসরকারি সংস্থা হাঙ্গেরিয়ান পিস সার্কেলের প্রধান অন্দ্রে সিমো বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সব পরিকল্পনার মূলে আসলে জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে তাদের অনুরাগী অন্য কাউকে ক্ষমতায় বসানো।



