যুক্তরাষ্ট্র

গাজার পক্ষে কথা বলে চাকরিচ্যুত, সেই ইসরায়েলি অধ্যাপককে আড়াই লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করায় এক বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি সম্মানজনক চাকরির প্রস্তাব হারিয়েছিলেন ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ রাজ সেগাল। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে অবশেষে সেই বিশ্ববিদ্যালয় তাকে আড়াই লাখ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়েছে।

২০২৪ সালের জুনে ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা (ইউএমএন) তাদের ‘সেন্টার ফর হলোকাস্ট অ্যান্ড জেনোসাইড স্টাডিজ’-এর পরিচালক হিসেবে রাজ সেগালের নাম ঘোষণা করেছিল। একটি উচ্চপর্যায়ের অ্যাকাডেমিক কমিটির নিবিড় অনুসন্ধান এবং প্রায় সর্বসম্মত সুপারিশের ভিত্তিতেই তাকে এই পদের জন্য বেছে নেওয়া হয়। কমিটির সদস্যরা সেগালের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন, এমনকি একজন সদস্য তার একটি প্রেজেন্টেশনকে ‘অপূর্ব’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

কিন্তু প্রস্তাব দেওয়ার মাত্র পাঁচ দিন পরই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নাটকীয়ভাবে তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। তারা জানায়, ‘কমিউনিটির সদস্যদের’ পক্ষ থেকে পাওয়া নেতিবাচক মতামতের কারণে এই নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে।

মূলত ২০২৩ সালের অক্টোবরে ‘জিউয়িশ কারেন্টস’ সাময়িকীতে লেখা সেগালের একটি নিবন্ধকে কেন্দ্র করে এই বিতর্কের সূত্রপাত। সেখানে তিনি গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘টেক্সটবুক কেস অব জেনোসাইড’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সমালোচকদের দাবি ছিল, ৭ অক্টোবরের হামলার পরপরই এমন নিবন্ধ লিখে সেগাল হামাসের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিয়েছেন। তবে সেগাল বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং তার লেখাতেও এমন কোনো সমর্থনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

চাকরির প্রস্তাব বাতিলের কয়েক মাস পর সেগাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আড়াই লাখ ডলারের একটি সমঝোতায় পৌঁছান। এ ধরনের সমঝোতার ক্ষেত্রে যা হয়, এখানেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কোনো ভুল স্বীকার করেনি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজ সেগাল মনে করেন, এই মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ ইসরায়েলের সমালোচনা করে বরখাস্ত বা তদন্তের মুখে পড়া অন্য স্কলারদের জন্য একটি বার্তা। তিনি বলেন, ‘এটি অন্যদের পাল্টা লড়াই করার সাহস জোগাবে।’

তথ্য অধিকার আইনের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু ইমেইল সংগ্রহ করেন সেগাল। সেখানে দেখা যায়, বড় দাতা, আইনপ্রণেতা এবং ইসরায়েলপন্থী কর্মীদের প্রচণ্ড চাপের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত বদলে বাধ্য হয়। দ্য গার্ডিয়ানের হাতে আসা এসব নথিতে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় শুরুতে সেগালের পক্ষ নিলেও পরে চাপের মুখে পিছু হটে।

একজন দাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড প্রধানকে লিখেছিলেন, ‘আমরা রাজ সেগালের মতো একজন কট্টর জায়নবাদবিরোধীকে হলোকাস্ট স্টাডিজ বিভাগের প্রধান হতে দিতে পারি না। এই সমস্যার সমাধান না হলে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুদান দেওয়া বন্ধ করে দেবেন।’

সেগালের দাবি, প্রায় একই ধরনের শত শত ইমেইল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল, যা একটি সুপরিকল্পিত প্রচারণার অংশ।

সেগালের পক্ষে আইনি লড়াই চালানো ‘সেন্টার ফর কনস্টিটিউশনাল রাইটস’ যুক্তি দিয়েছে যে, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পদক্ষেপ অসাংবিধানিক। কারণ তারা একজন ব্যক্তির বাকস্বাধীনতার অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে। সংস্থার ডেপুটি লিগ্যাল ডিরেক্টর মারিয়া লাহুদ বলেন, ‘ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি গণহত্যার বিরুদ্ধে সতর্ক করার সাহস দেখিয়েছিলেন ড. সেগাল। এর বদলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের সদস্যদের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে এবং ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট-এর নীতি লঙ্ঘন করে তার চাকরির প্রস্তাব বাতিল করেছে।’

রাজ সেগাল নিজে একজন ইহুদি এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিক। তার চারজন পূর্বপুরুষ নাৎসি হলোকাস্ট থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন। তিনি বর্তমানে নিউ জার্সির স্টকটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। এক সাক্ষাৎকারে সেগাল বলেন, ইউএমএন নেতৃত্ব তাকে ‘ভুল ধরনের ইসরায়েলি’ বা ‘ভুল ধরনের ইহুদি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

গাজায় ইসরায়েলি পদক্ষেপকে ‘গণহত্যা’ বলার ক্ষেত্রে তিনি অন্যতম অগ্রজ ছিলেন। পরবর্তীতে জাতিসংঘ, বিভিন্ন দেশের সরকার এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোও একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে। সেগাল আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি সত্যিই চেয়েছিলাম আমি যেন ভুল হই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমার আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে।’

সেগালের নিয়োগের প্রতিবাদে ২০২৪ সালের ৫ জুন ওই সেন্টারের উপদেষ্টা বোর্ডের দুই সদস্য—অধ্যাপক কারেন পেইন্টার এবং ব্রুনো শাউয়াত পদত্যাগ করেছিলেন। তারা অভিযোগ করেন, সেগাল ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছেন এবং হামাসের নৃশংসতাকে বৈধতা দিয়েছেন।

তবে সেগালের সেই নিবন্ধে দেখা যায়, তিনি ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং গাজায় নির্বিচার বোমাবর্ষণের তথ্য উল্লেখ করেছিলেন। একই সাথে তিনি হামাসের হামলাকে ‘গণহত্যা’ এবং ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ হিসেবেও বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি কখনোই হামাসকে সমর্থন করব না।’

ইমেইল থেকে জানা যায়, নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয় শুরুতে সেগালকে সমর্থন দেওয়ার চিন্তা করেছিল। কিন্তু ৮ জুন জনসংযোগ বিভাগ সতর্ক করে যে, ‘প্রার্থীকে খুব বেশি সমর্থন করা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।’

এমনকি নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা কোনো ‘রাজনৈতিক লিটমাস টেস্ট’ বা পরীক্ষা নিচ্ছে না—এমন বাক্যও মিডিয়া স্টেটমেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়। সেগাল ‘ইসরায়েল-বিরোধী’ কি না, তা যাচাই করতে তিনি আদতে ইসরায়েলি কি না, তাও জানতে চাওয়া হয়। উত্তরে সেগাল জানান, তিনি ইসরায়েলে জন্ম নিয়েছেন এবং তার পরিবার ও বন্ধুরা এখনো সেখানেই থাকেন।

১০ জুন একটি মাত্র দুই বাক্যের ইমেইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট জেফ এটিঙ্গার সেগালকে জানান যে, চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টির বড় দাতাদের ভূমিকার প্রমাণ পাওয়া যায়।

লিন রেডলিফ নামে এক দাতা হুমকি দিয়েছিলেন যে, সেগালকে নিয়োগ দিলে ওই সেন্টারের জন্য তহবিল সংগ্রহ বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি সেগালকে একজন ‘চরমপন্থী’ এবং ‘জায়নবাদবিরোধী’ হিসেবে অভিহিত করেন। জবাবে এটিঙ্গার লিখেছিলেন, ‘আপনার এই তথ্যের জন্য ধন্যবাদ। এটি সময়োপযোগী এবং সহায়ক।’

শুধু দাতারা নন, স্থানীয় আইনপ্রণেতারাও এই বিতর্কে যোগ দেন। ৬৯ জন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা সেগালের নিয়োগ স্থগিত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, ইহুদি সম্প্রদায়ের একটি প্রগতিশীল অংশ সেগালকে সমর্থন জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি লেখে। তারা বলে, সব ইহুদিই এক মতাদর্শের—এমন ভুল ধারণা পোষণ করা ঠিক নয়। হলোকাস্ট এবং জেনোসাইড বিষয়ক ৪০ জন শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পদক্ষেপকে একটি ‘বিপজ্জনক নজির’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

ইউএমএন অনুষদের সদস্যরা শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট এটিঙ্গার এবং প্রভোস্টের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ইউনিভার্সিটি প্রফেসরস সেগালের নিয়োগ পুনর্বহালের দাবি জানায়।

সেগাল জানান, বিশ্ববিদ্যালয় তাকে অন্য কোনো বিভাগে নিয়োগ দেওয়ার মৌখিক আশ্বাস দিলেও এক বছর পার হয়ে গেলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি মনে করেন, মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনার ফলে মার্কিন উচ্চশিক্ষার বাজারে তার ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবুও তিনি গাজার পরিস্থিতি নিয়ে লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন।

সেগাল চেয়েছিলেন তাকে যেন ক্ষতিপূরণ না দিয়ে পদটি ফিরিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তাকে জানিয়ে দিয়েছে—নিয়োগের বিষয়টি এখন আর বিবেচনার সুযোগ নেই। ওই পদটি এখনো শূন্যই পড়ে আছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension