যুক্তরাষ্ট্র

মুহূর্তে বাষ্পীভূত হবে মানবদেহ: ইসরায়েলকে ৫৪ হাজার টন মারণাস্ত্র দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ক্ষুব্ধ মার্কিন রাজনীতিবিদেরা

ইসরায়েলের কাছে অত্যন্ত বিধ্বংসী ও প্রতিটি ২ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৯০৭ কেজি) ওজনের মোট ৬০ হাজার শক্তিশালী বোমা বিক্রির চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। কয়েক শ কোটি ডলারের এই চুক্তির সিংহভাগ ব্যয় মেটানো হবে খোদ মার্কিন করদাতাদের অর্থে। মার্কিন কংগ্রেসকে এরই মধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।

 

ইতিহাসে এর আগে কখনোই একসঙ্গে এত বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র ইসরায়েলে পাঠায়নি ওয়াশিংটন। গাজায় প্রায় তিন বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানের মুখে মধ্যপ্রাচ্য যখন চরম মানবিক সংকটে, ঠিক তখনই এ বিশাল অস্ত্র চুক্তির খবর প্রকাশ্যে এল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, প্রস্তাবিত চুক্তির আর্থিক মূল্য প্রায় ২৮০ কোটি মার্কিন ডলার। এ ব্যয়ের বড় অংশ মেটানো হবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সিং’ (FMF) কর্মসূচির আওতায়—যেখানে মার্কিন সরকার তার নিজস্ব তহবিল থেকে ইসরায়েলকে অস্ত্র কেনার অনুদান দেয়।
সম্ভাব্য এ চুক্তির অধীনে মূলত তিন ধরনের ভারী বোমা সরবরাহ করা হবে:
এমকে-৮৪ (MK-84): প্রায় ২ হাজার পাউন্ড ওজনের এই জেনারেল পারপাস বোমাটি বড় বড় বহুতল ভবন গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম। এটি বিস্ফোরণস্থল থেকে শত শত মিটার এলাকার কাঠামো ধসিয়ে দিতে পারে।
বিএলইউ-১১৭ (BLU-117): এমকে-৮৪-এর সমওজনের এ বোমায় উন্নত রাসায়নিক বিস্ফোরক ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী (প্রিসিশন-গাইডেড) প্রযুক্তি যুক্ত থাকে। এছাড়া এতে বিশেষ তাপপ্রতিরোধী প্রলেপ রয়েছে।
আই-২০০০ পেনিট্রেটর (বাংকার বাস্টার): প্রায় ২ হাজার পাউন্ডের অত্যন্ত শক্তিশালী এ বোমাটি মাটির নিচে বা কয়েক ফুট পুরু কংক্রিটের কাঠামো ভেদ করে বিস্ফোরিত হতে পারে। এর ধাতব বহিরাবরণ সাধারণ বোমার চেয়ে বহুগুণ শক্ত।
এর আগে বেসামরিক প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালে জো বাইডেন প্রশাসন ২ হাজার পাউন্ড ওজনের বোমার চালান সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন এবং কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই দফায় দফায় শত শত কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির ছাড়পত্র দেন।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ২ হাজার পাউন্ডের ৬০ হাজার বোমার মোট ওজন প্রায় ৫৪ হাজার ৪০০ টন। এই ধ্বংসক্ষমতা প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের মূল কাঠামোর চেয়ে প্রায় সাত গুণ ভারী এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পুরো সময়ে জার্মানির বার্লিনের ওপর ফেলা সব বোমার মোট ওজনের সমান। ১৯৪৫ সালে জাপানের টোকিওতে এক রাতের হামলায় প্রায় ৮০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৬০০ টন বোমায়; তার তুলনায় এই চালান প্রায় ৩৫ গুণ বেশি ভারী।

 

গবেষণা অনুযায়ী, একটি ২ হাজার পাউন্ডের বোমা যেখানে পড়ে সেখানে প্রায় ৫০ ফুট চওড়া ও ১৬ ফুট গভীর গর্ত তৈরি হয়। আল-জাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, গাজায় এ ধরনের উচ্চতাপযুক্ত (থার্মোবারিক) বোমা বিস্ফোরণে ৩ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা তৈরি হওয়ায় অন্তত ২ হাজার ৮৪২ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

US set to approve 60,000 heavy bombs for Israel: What that means |  Israel-Palestine conflict | Al Jazeera

এদিকে পেন্টাগনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইউক্রেনকে সহায়তা এবং চলমান মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনার কারণে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেরই গোলাবারুদের মজুত, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষার ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইতিহাসের সেরা প্রযুক্তি ও অস্ত্র তৈরি করছে।

অন্যদিকে মার্কিন করদাতাদের অর্থে ইসরায়েলকে এই অস্ত্র দেওয়ার সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন এই চুক্তি ঠেকাতে তৎপর হওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেন, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত সরকারের হাতে মার্কিন নাগরিকদের টাকা তুলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রক্ষণশীল বিশ্লেষক টাকার কার্লসন এবং সাবেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি মার্জোরি টেলর গ্রিনও এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করে জানান, সাধারণ আমেরিকানরা এই প্রাণঘাতী আগ্রাসনের জন্য অর্থ দিতে চান না।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension