মুক্তমত

চিকিৎসা শিক্ষার বাতিঘর অধ্যাপক ডা. এ. বি. এম. আবদুল্লাহ: রাজনীতির ঊর্ধ্বে যার সম্মান

হুমায়ূন কবীর ঢালী

সম্প্রতি দেশের উচ্চশিক্ষা এবং চিকিৎসা অঙ্গনে একটি অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও স্তম্ভিত করার মতো খবর ছড়িয়ে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইমেরিটাস অধ্যাপক পদ থেকে প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. এ. বি. এম. আবদুল্লাহর আজীবন নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে ওই সম্মানিত পদে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর উত্তোলিত সমস্ত বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই খবরটি জানার পর দেশের সচেতন নাগরিক, চিকিৎসক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ, উদ্বেগ ও বেদনার জন্ম হয়েছে। কারণ, দেশের চিকিৎসা শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা গবেষণার ইতিহাসে ডা. এ. বি. এম. আবদুল্লাহ কেবল একটি সাধারণ নাম নন, বরং তিনি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান এবং অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। কয়েক দশক ধরে তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক, অনন্য শিক্ষক ও অগ্রগণ্য গবেষক হিসেবে কোটি মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছেন। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক যেকোনো পটপরিবর্তনের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক না কেন, তা দেশের চিকিৎসা ও শিক্ষাঙ্গনের জন্য একটি অত্যন্ত কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
ডা. এ. বি. এম. আবদুল্লাহর মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, তিনি আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশের জন্য বিপুল গৌরব বয়ে এনেছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত টেক্সটবুক Davidson’s Principles and Practice of Medicine-এর লেখকদলের একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবে তিনি অবদান রেখেছেন। যারা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেন কিংবা চিকিৎসা পেশার সঙ্গে জড়িত, তারা খুব ভালো করেই জানেন যে একটি আন্তর্জাতিক মেডিকেল পাঠ্যবইয়ের লেখকদলের অংশ হওয়া কতটা কঠিন এবং একজন ডাক্তারের পেশাগত জীবনে এই বইটির গুরুত্ব কতটা অপরিসীম। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করা এমন একজন ব্যক্তিত্বকে যখন রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক স্তরে এভাবে অসম্মানিত করা হয়, তখন তা প্রকারান্তরে দেশের পুরো চিকিৎসা শিক্ষা এবং জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
এই প্রখ্যাত চিকিৎসকের জীবন ও কর্মের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, তাঁর এই অবস্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও মেধার ফসল।
১৯৫৪ সালে জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার হাড়িয়াবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই কৃতি সন্তান ১৯৬৯ সালে ইসলামপুর নেকজাহান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৭২ সালে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ১৯৭৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে সফলতার সঙ্গে এমবিবিএস পাস করার পর তিনি সরাসরি শহরের চাকচিক্যের পেছনে না ছুটে, কিছুদিন গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করেন এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় অবদান রাখেন। এরপর কর্মজীবনের একপর্যায়ে তিনি পাঁচ বছর সৌদি আরবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিদেশের মাটিতে কাজের এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও সমৃদ্ধ করে এবং ১৯৯২ সালে তিনি লন্ডনের বিখ্যাত ‘রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস’ এর অধীনে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এমআরসিপি (MRCP) ডিগ্রি লাভ করেন।
উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর বিদেশের মাটিতে বিলাসবহুল জীবনযাপনের হাতছানি উপেক্ষা করে ডা. আবদুল্লাহ নিজ দেশে ফিরে আসেন এবং দেশের মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। বাংলাদেশে ফিরে তিনি হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগে দুই বছর পরামর্শক (কনসালট্যান্ট) হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯৫ সালে তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তৎকালীন পিজি হাসপাতাল এবং বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) নিয়োগ লাভ করেন। সেখান থেকেই তাঁর শিক্ষকতা ও গবেষণার এক সোনালী অধ্যায়ের সূচনা হয়। কর্মজীবনে তিনি বিএসএমএমইউ-এর মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁর নেতৃত্ব ও যোগ্যতার কারণে সহকর্মীদের ভোটে মেডিসিন অনুষদের ৩ বার ডিন নির্বাচিত হয়েছিলেন। চিকিৎসা শিক্ষায় এই অসামান্য ও অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালে রাষ্ট্র তাঁকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে এবং ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করে। পরবর্তীতে, ২০২২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এই মহান শিক্ষককে তাঁর আজীবন অবদানের জন্য ‘ইমেরিটাস অধ্যাপক’ পদবীতে ভূষিত করে। এ ছাড়া, তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে পূর্ণ সচিব পদমর্যাদায় বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব‍্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবেও নিয়োগ পেয়েছিলেন, যা ছিল একটি সম্পূর্ণ পেশাদারী রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
চিকিৎসাজগতে মেডিসিন বিভাগের জন্য অধ্যাপক ডক্টর এ. বি. এম. আবদুল্লাহ স্যার এতটাই একজন বিশেষজ্ঞ, মেধাবী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব যে, তাঁর লেখা মেডিকেল টেক্সটবুকগুলো আজ শুধু বাংলাদেশে নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার চিকিৎসা শিক্ষার মূল ভিত্তি। তাঁর রচিত অত্যন্ত জনপ্রিয় বই যেমন—Short Cases in Clinical Medicine, Long Cases in Clinical Medicine, ECG in Medical Practice, Radiology in Medical Practice, Case History and Data Interpretation in Medical Practice, Practical Manual in Clinical Medicine এবং Practical Standard Prescriberসহ অসংখ্য গ্রন্থ বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, মালদ্বীপসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সবকয়টি দেশে এমবিবিএস কোর্সের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হয়। প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের লাইব্রেরীতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও রেফারেন্সের প্রয়োজনে তাঁর রচিত এই গ্রন্থগুলো সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক। চিকিৎসা জগতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এই বইগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচিতি আকাশচুম্বী। আজ দেশের হাজার হাজার প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার গর্ব করে বলেন যে, ডা. এ. বি. এম. আবদুল্লাহ স্যারের বই পড়েই তারা আজ ডাক্তার হতে পেরেছেন। শুধু মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্যই নয়, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেও তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেছেন। বাংলা ভাষায় তাঁর লেখা ‘স্বাস্থ্য বিষয়ক নির্বাচিত কলাম’, ‘সুস্থ শরীর, সতেজ মন, সুন্দর জীবন’ এবং ‘স্বাস্থ্য সচেতন’ বইগুলো সাধারণ মানুষের কাছে দারুণ সমাদৃত। এর পাশাপাশি দেশের ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তিনি ‘একাত্তরের স্বাধীনতা হঠাৎ করে আসেনি’ নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও রচনা করেছেন।
একজন নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদের প্রতি এমন অসম্মানজনক আচরণ এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কারণে তাঁর সারাজীবনের অর্জনকে ধূলিসাৎ করার এই চেষ্টা দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা ও শিক্ষাঙ্গনের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত। একজন চিকিৎসকের মূল ধর্ম ও আদর্শ হলো মানবসেবা এবং জ্ঞান বিতরণ। তিনি কর্মজীবনে কার চিকিৎসা করেছেন বা কোন রাষ্ট্রীয় পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, তা দিয়ে তাঁর কয়েক দশকের মেধা, প্রজ্ঞা, শিক্ষকতা ও কোটি রোগীকে দেওয়া সেবাকে মুছে ফেলা যায় না। ইমেরিটাস অধ্যাপকের মতো একটি আজীবন সম্মানজনক পদবী বাতিল করা এবং তাঁর অর্জিত ও উত্তোলিত বেতন-ভাতা ফেরত চাওয়ার মতো সিদ্ধান্ত কেবল অমানবিকই নয়, বরং চরম প্রতিহিংসামূলক। একজন ডা. এ. বি. এম. আবদুল্লাহর সম্মান আজ আর শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সম্মান নয়, এটি বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষা, চিকিৎসকদের আত্মমর্যাদা এবং জাতীয় মেধা ও জ্ঞানচর্চার সম্মানের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যারা সারাজীবন জ্ঞান, শিক্ষা ও মানবসেবায় নিজেদের উৎসর্গ করেছেন, তাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের একটি অন্যতম প্রধান নৈতিক দায়িত্ব। রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে এই বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসকের প্রতি হওয়া অন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে তাঁর যথাযথ সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া হোক—এটাই আজ দেশের সমগ্র চিকিৎসক সমাজ এবং সাধারণ জনগণের জোরালো দাবি।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension