
চীন যেভাবে বিশ্বের সোনার পরাশক্তিতে পরিণত হলো চৌ চুং-ইয়েন
চীন কিভাবে শিল্প খাতের বৈশ্বিক পরাশক্তি হয়ে দাঁড়াল তা বোঝার জন্য দেশটির সোনা শিল্পের উত্থানের গল্পের চেয়ে বড় কোনো উদাহরণ আর হতে পারে না।
হাজার বছর ধরে সোনাকে সম্মান করে আসলেও চীনে ঐতিহাসিকভাবে কখনোই সোনাভিত্তিক অর্থনীতি ছিল না।
কারণ দেশটির মাটির নিচে স্বর্ণের প্রাকৃতিক মজুদ ছিল অত্যন্ত অপ্রতুল। ১৯৭৫ সালেও, যখন চীন তার অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন শুরু করে, তখন সংস্কারের অর্থায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে দেশটির সোনার খুব প্রয়োজন ছিল। তবে আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও চীন বছরে মাত্র ১৩ দশমিক ৮ মেট্রিক টন সোনা উৎপাদন করতে পারত। তখন বিশ্ব বাজারে রাজত্ব করা দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া উৎপাদনের দিক থেকে চীনকে সহজেই পেছনে ফেলে দিয়েছিল।
তবে সময়ের সাথে সাথে দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। ২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে টপকে বিশ্বের বৃহত্তম স্বর্ণ উৎপাদক দেশে পরিণত হয় চীন। আর সেই থেকে শীর্ষ স্থানটি ধরে রেখেছে তারা। আজ চীন বছরে ৩৮০ মেট্রিক টন সোনা উৎপাদন করে, যা দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া ও মেক্সিকোর সম্মিলিত উৎপাদনের চেয়েও বেশি!
চীনের এই সাফল্য কোনো অলৌকিক ঘটনায় মেলেনি।
১৯৭৯ সালে বেইজিং ‘গোল্ড ট্রুপ’ গঠন করে মাটির নিচে সোনার খোঁজে সারা দেশে বাহিনী পাঠিয়েছিল। কিন্তু উচ্চমানের খনির সন্ধান সেখানে মেলেনি। চীনের এই ঘুরে দাঁড়ানোর মূল চালিকাশক্তি ছিল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, রাষ্ট্রীয় শিল্পনীতি এবং নিখুঁত পরিকল্পনা।
১৯৯০-এর দশক থেকে চীনা রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নিম্নমানের আকরিক প্রক্রিয়াকরণের জন্য ‘প্রেসার অক্সিডেশন’ নামক একটি জটিল প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। সহজ কথায়, যেখানে প্রতি এক টন পাথরে মাত্র ১ গ্রাম সোনা থাকে সেখানেও এই প্রযুক্তি খনি শ্রমিকদের লাভজনকভাবে সোনা বের করার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
রাতারাতি, চীনের বিশাল এবং এতদিন অবহেলিত নিম্নমানের স্বর্ণক্ষেত্রগুলো নতুন সম্পদে পরিণত হয়। আজ চীনের মোট উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ১৩০ মেট্রিক টন) আসে এই নিম্নমানের খনিগুলো থেকেই।
মজার বিষয়, চীন এই প্রযুক্তি আবিষ্কার করেনি কিংবা সবচেয়ে বড় প্ল্যান্টও তৈরি করেনি। এই প্রযুক্তির উদ্ভাবক যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা, আর সবচেয়ে বড় সুযোগ-সুবিধা রয়েছে রাশিয়ায়। তবুও সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের কারণে চীন এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
আমেরিকায় প্রায় ৭৫ শতাংশ সোনা আসে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে, কিন্তু চীন তা না করে সারা দেশে শত শত মাঝারি আকারের খনি ক্লাস্টার পরিচালনা করে। ফলে একটি দুর্ঘটনায় পুরো ব্যবস্থা স্থবির হয় না। আর দক্ষিণ আফ্রিকার খনিগুলোর মতো না হয়ে, চীনের খনিগুলো রাষ্ট্রের দ্বারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রিত। উৎপাদন, অর্থায়ন, পরিবহন থেকে নিরাপত্তা সবকিছু একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর অধীনে আবদ্ধ। চীন শুধু বড় বড় কারখানা তৈরি করেনি, বরং তৈরি করেছে একটি পুরো শিল্প ‘ইকোসিস্টেম’।
পাশাপাশি অন্যান্য ধাতু যেমন তামা, সীসা ও দস্তা পরিশোধনের সময় উপজাত হিসেবেই চীন বছরে প্রায় ৮০ মেট্রিক টন সোনা উদ্ধার করে, যা কাজাখস্তানের মতো একটি দেশের পুরো বার্ষিক উৎপাদনের সমান!
২০১৬ সালে রেকর্ড ৪৫৩ দশমিক ৫ মেট্রিক টন সোনা তুলেছিল চীন। তবে স্থানীয় সরকারগুলো পরিবেশের চেয়ে উৎপাদনকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ায় দূষণ মারাত্মক রূপ নেয়। ২০১৭ সাল থেকে পরিবেশ ও নিরাপত্তার কঠোর নিয়ম চালু করে হাজার হাজার অবৈধ ও দূষণকারী খনি বন্ধ করে দেয় বেইজিং। এতে উৎপাদন কিছুটা কমলেও স্বর্ণ খাতটি আরও পরিচ্ছন্ন, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে।
২০০৭ সাল থেকে শীর্ষ উৎপাদক হওয়া সত্ত্বেও চীন থেমে নেই, তারা প্রতি বছর বিপুল সোনা আমদানি করছে। নিজস্ব উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে বছরে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন সোনা নিজেদের ভল্টে তুলছে দেশটি।
তবে বেইজিং কেবল তার চকচকে রূপের জন্য সোনা জমাচ্ছে না। এর পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক চাল। চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’কে বৈশ্বিক মুদ্রায় রূপান্তর করা এবং পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে দেশকে সুরক্ষিত রাখতেই সোনা জমানোর এই নীতি গ্রহণ করেছে বেইজিং।
(সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে অনূদিত)



