
জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকীতে ওয়েবিনার
মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান কোনো অংশে কম নয় বরং অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান বেশি, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সেভাবে স্বীকৃতি পায়নি। মুক্তিযুদ্ধে নারী যে গৌরবগাঁথা রচনা করেছিলেন তা ধর্ষিত এবং নির্যাতিত নারীর ভূমিকায় অদৃশ্য হয়ে আছে। তাই মুক্তিযুদ্ধে নারীর গৌরবগাঁথা তুলে ধরতে হলে অবশ্যই পাঠ্যপুস্তকসহ সর্বত্র নির্যাতিত নারী, মুক্তিযোদ্ধাদের মা-বোনের ত্যাগ, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে।
শনিবার ‘মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের নারী সমাজের অবদান’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ২৭তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি এই ওয়েবিনার আয়োজন করে। সংগঠনের সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।
আলোচ্য বিষয়ে ‘জাহানারা ইমাম স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেন কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন। অনুষ্ঠানে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার আন্দোলনে বিশেষ অবদানের জন্য বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনকে ‘জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক’ প্রদান করা হয়। ২০২১ সালে ব্যক্তি হিসেবে বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত সমাজকর্মী মালেকা খান ও সংগঠন হিসেবে ‘বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ’কে জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ২০২০ সালে ব্যক্তি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট বাউল গবেষক অধ্যাপক শক্তিনাথ ঝা এবং সংগঠন হিসেবে ‘বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’ কে এই স্মৃতিপদক প্রদান করা হয়। গত বছর এই সময়ে করোনা মহামারির কারণে লকডাউন থাকায় স্মৃতিপদক প্রদান স্থগিত রাখা হয়েছিল।
ওয়েবিনারে আরও বক্তব্য রাখেন সমাজকর্মী মালেকা খান, মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম, শহীদজায়া শিক্ষাবিদ শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, নারী প্রগতি সংঘের উপপরিচালক সমাজকর্মী শাহনাজ সুমি, ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ, অধ্যাপিকা উর্মিলা রায় ও শহীদ সন্তান অধ্যাপক ডা. নুজহাত চৌধুরী।
সূচনা বক্তৃতায় শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান কোনও অংশে কম নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান অনেক বেশি, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সেভাবে স্বীকৃতি পায়নি। কারণ হচ্ছে সামন্ততান্ত্রিক ও ধর্মীয় মৌলবাদী ধ্যানধারণা, যা মানুষের মনোজগতে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি ও সম্মাননা প্রদান করে অত্যন্ত প্রশংসনীয় কাজ করেছে। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় প্রবাসে যারা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত গঠন করেছেন তাদের নামও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় সংযুক্ত করছে। এক্ষেত্রে সবার আগে কবি সুফিয়া কামাল ও শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মতো যেসব সাহসী নারীরা শত্রুকবলিত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তাদের নামও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় যুক্ত করা প্রয়োজন।
জাহানারা ইমাম স্মারক বক্তৃতায় সেলিনা হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ নারীর জীবন অধ্যয়নের একটি বড় দিক। এই যুদ্ধে নারীর ভূমিকা বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, নারী তার সর্বাত্মক শক্তি নিয়োগ করেছিলেন স্বাধীনতার মতো একটি বড় অর্জনে। পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ ছিল তার জীবনবাজি রাখার ঘটনা। অথচ দেশের মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাসে নারীকে মূলধারায় স্থাপন না করার ফলে নারীর প্রকৃত ইতিহাস যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে নারী যে গৌরবগাঁথা রচনা করেছিলেন তা ধর্ষিত এবং নির্যাতিত নারীর ভূমিকায় অদৃশ্য হয়ে আছে। প্রকৃত অবদান খুঁজে নারীকে মূলধারায় না আনার আরও একটি কারণ নিম্নবর্গের নারীরাই ব্যাপকভাবে এ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।’
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপকভাবে নারীর ভূমিকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের মধ্যে বেশ ক’জন নারীনেত্রী ছিলেন। গেরিলা যুদ্ধ থেকে শুরু করে চিকিৎসাসেবা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দ সৈনিকের ভূমিকা এবং বিভিন্ন উপায়ে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করা- ইত্যাদি ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা ও ত্যাগ আমাদের অনুপ্রাণিত করে। তাই মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারী, মুক্তিযোদ্ধাদের মা-বোনের বিভিন্ন ত্যাগ, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ- এসব ইতিহাস ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা খুবই জরুরি।’
এদিকে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার সকালে রাজধানীর মিরপুরে তার সমাধিতে পুস্পার্ঘ্য অর্পণ করেছে নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরও এ দিন অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। দুই মহিয়সী নারী সুফিয়া কামাল ও শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্মরণে রাতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ফেসবুক পাতায় শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও সদস্যসচিব সারা যাকের, গবেষক ড. রেজিনা বেগম এবং সুফিয়া কামালের কন্যা সুলতানা কামাল। জাহানারা ইমাম রচিত ‘ক্যান্সারের সাথে বসবাস’ গ্রন্থ থেকে পাঠ করেন আবৃত্তিশিল্পী বুশরা আহমেদ তিথি। অনুষ্ঠানে কাওসার চৌধুরী নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র গণআদালত প্রদর্শিত হয়।


