আন্তর্জাতিক

রেডিও তরঙ্গ কাঁপিয়ে ৩ হাজার বছর পর বাজল তুতেনখামেনের তূর্য

ভাবুন তো, প্রায় ৩ হাজার বছর ধরে একটি বাদ্যযন্ত্র পড়ে আছে অন্ধকার এক সমাধির ভেতর। কেউ সেটিতে ফুঁ দেয়নি, শোনেনি তার শব্দ।

তারপর হঠাৎ একদিন সেটি বেজে উঠল—আর সেই শব্দ ছড়িয়ে পড়ল সারা বিশ্বে।
ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৩৯ সালের এপ্রিল মাসে। সেদিন আনুমানিক ১৫ কোটি মানুষ রেডিওর সামনে বসেছিলেন। তাদের জন্য বিবিসি আয়োজন করেছিল এক বিশেষ অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিল মিসরের কায়রো থেকে।
হঠাৎ ঘোষকের কণ্ঠ শোনা গেল—

‘ফারাও তুতেনখামেনের তূর্য!’

এরপর কয়েক মুহূর্তের নীরবতা।

তারপর বেজে উঠল একটি তূর্য।

হাজার হাজার বছর ধরে নীরব থাকা সেই শব্দ যেন এক লাফে ফিরে এল বর্তমান সময়ে।

সামরিক কুচকাওয়াজে ব্যবহৃত তূর্যের মতো শব্দটি কায়রো থেকে রেডিও তরঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বের নানা প্রান্তে। মিসরের কায়রোয় অবস্থিত আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের মিসরবিদ্যার অধ্যাপক সালিমা ইকরামের কাছে সেই মুহূর্ত ছিল বিশেষ কিছু। তিনি বলেন, ওই রেকর্ডিং তুতেনখামেনের সময় আর আধুনিক সময়ের মধ্যে শব্দ ও অনুভূতির একটি সেতু তৈরি করেছিল।
প্রাচীন এই বাদ্যযন্ত্রে ফুঁ দিয়েছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ব্যান্ডের সদস্য জেমস ট্যাপার্ন। হাজার বছরের পুরোনো একটি জিনিস হাতে নিয়ে তাতে ফুঁ দেওয়ার অভিজ্ঞতা তার কাছে ছিল অসাধারণ।

তুতেনখামেনের সমাধি থেকে পাওয়া দুটি তূর্যের একটি ছিল রুপার। অন্যটি ব্রোঞ্জ বা তামার তৈরি বলে ধারণা করা হয়। তূর্য দুটি ছিল ছোট এবং সুন্দর নকশা করা। এগুলোর গায়ে ফুলের নকশা ও প্রাচীন মিসরের দেবতাদের ছবি ছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, রাজা যখন শোভাযাত্রায় বের হতেন, তখন এসব তূর্য বাজানো হতো। প্রাচীন মিসরের বিভিন্ন চিত্রেও সামরিক, ধর্মীয় ও আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে তূর্য ব্যবহারের ছবি পাওয়া যায়। তূর্য বানানোও সহজ কাজ ছিল না। দক্ষ ধাতুশ্রমিকদের এমন একটি বাদ্যযন্ত্র তৈরি করতে হয়েছিল, যা দেখতে সুন্দর হওয়ার পাশাপাশি বাজানোর উপযোগীও হবে।

তুতেনখামেনের সমাধিতে পাওয়া দুটি তূর্যের মধ্যে একটি রুপালি, অন্যটি পিতলের মতো হলুদাভ। এই দুই রঙের মধ্যেও প্রতীকী অর্থ খুঁজে পান বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক সালিমা ইকরামের মতে, এগুলোকে দিনের ১২ ঘণ্টা ও রাতের ১২ ঘণ্টার প্রতীক হিসেবে দেখা যেতে পারে। আর এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তুতেনখামেনের পরকালের যাত্রার ধারণা। অর্থাৎ, শুধু বাদ্যযন্ত্র হিসেবেই নয়, প্রাচীন মিসরের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সঙ্গেও তূর্য দুটির সম্পর্ক ছিল।

১৯৩৯ সালের সেই অনুষ্ঠান শুনলে মনে হয়, সবকিছু বুঝি পরিকল্পনামতোই হয়েছিল। কিন্তু আসলে তা নয়। অনুষ্ঠানের মহড়ার সময় রুপার তূর্যটির মুখে একটি আধুনিক মুখপাত্র লাগানো হয়েছিল। এরপর সেটি বাজানোর চেষ্টা করা হয়। তূর্যবাদক ফুঁ দিতেই বিপদ ঘটে। তূর্যটি ভেঙে যায়। ঘটনাস্থলে ছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিক আলফ্রেড লুকাস। তিনি ছিলেন হাওয়ার্ড কার্টারের দলের সদস্য। হাওয়ার্ড কার্টারের দলই তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কার করেছিল।

তূর্য ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় লুকাস এতটাই হতবাক হয়ে পড়েছিলেন যে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে এত কিছুর পরও অনুষ্ঠান বন্ধ হয়নি। মেরামত করা তূর্যটি আবার বাজানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু তখনও বিপদ শেষ হয়নি। রেডিও অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণ আগে জাদুঘরের বিদ্যুৎ চলে যায়। ফলে শেষ পর্যন্ত মোমবাতির আলোয় অনুষ্ঠান চালাতে হয়েছিল। আর সেই অদ্ভুত পরিবেশেই হাজার বছরের পুরোনো তূর্যটি আবার বেজে ওঠে।

ঘটনাটির সঙ্গে আরও একটি কাকতালীয় বিষয় জড়িয়ে আছে। তূর্যগুলো বাজানোর কয়েক মাস পরই শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এরপর অনেকের মনে হতে থাকে, তুতেনখামেনের ‘অভিশাপ’ হয়তো সত্যি! প্রাচীন মিসরের এই ফারাওয়ের সমাধি আবিষ্কারের পর থেকেই তার ‘অভিশাপ’ নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত ছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা এসব দাবিকে কুসংস্কার বলেই মনে করেন। অধ্যাপক ইকরামও তুতেনখামেনের অভিশাপের ধারণা নাকচ করেছেন।

১৯৩৯ সালের সেই ঘটনার পর তূর্যগুলোর যত্ন নেওয়ার পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন এগুলো এতটাই মূল্যবান ও ভঙ্গুর যে আর কখনো আসল তূর্যে ফুঁ দেওয়া হবে না বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে। অধ্যাপক ইকরামের মতে, চাইলে আসল তূর্যের একটি প্রতিরূপ তৈরি করে সেটিতে বাজানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে আসল তূর্য হাতে নিয়ে বাজানোর অনুভূতি কখনোই পাওয়া যাবে না। কারণ ১৯৩৯ সালের ঘটনাটি দেখিয়েছে, এমন প্রাচীন নিদর্শন ব্যবহার করার মধ্যে বড় ঝুঁকি রয়েছে।

তুতেনখামেনের তূর্য দুটি এখন রয়েছে মিসরের নতুন গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়ামে। শত কোটি ডলার ব্যয়ে তৈরি এই বিশাল জাদুঘরটি গিজার পিরামিডের কাছেই নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে তূর্য দুটিকে রাখা হয়েছে বিশেষ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। প্রদর্শনী কক্ষের তাপমাত্রা ১৮ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা হয়। কারণ তূর্যের সঙ্গে থাকা কাঠের ভেতরের অংশও সংরক্ষণ করতে হয়। এই কাঠের অংশগুলো তূর্যের ধাতব অংশের আকৃতি ঠিক রাখতে সাহায্য করেছিল। জাদুঘরের তুতেনখামেন প্রদর্শনীর প্রত্নতাত্ত্বিক ও কিউরেটর জ্যাসমিন আবদালরউফ জানান, ধাতু ও কাঠ—দুই ধরনের উপাদান সংরক্ষণের উপযোগী করেই পুরো পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

তূর্য দুটির ইতিহাসে শুধু রেডিও সম্প্রচারের ঘটনাই নেই। চুরির ঘটনাও আছে। ২০১১ সালে মিসরে গণঅভ্যুত্থানের সময় কায়রোর মিসরীয় জাদুঘর থেকে তূর্যগুলোর একটি চুরি হয়ে যায়। কয়েক সপ্তাহ পর কায়রোর একটি মেট্রো স্টেশনে একটি ব্যাগের ভেতর অন্য চুরি হওয়া প্রাচীন নিদর্শনের সঙ্গে তূর্যটি পাওয়া যায়। এই ঘটনার পর তূর্যগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে আরো সতর্ক হয়েছে কর্তৃপক্ষ। নতুন জাদুঘরে শুধু পুরো ভবনের নিরাপত্তাই জোরদার করা হয়নি। প্রতিটি মূল্যবান নিদর্শনের জন্য আলাদা নিরাপত্তাব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

১৯৩৯ সালে তুতেনখামেনের তূর্য বাজানোর ঘটনা সামনে এনে বড় একটি প্রশ্নও উঠেছে। প্রাচীন কোনো নিদর্শনকে মানুষের সামনে জীবন্ত করে তুলতে গিয়ে সেটিকে কতটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলা যায়? সাংবাদিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ক্রিস্টিন ফিন তূর্য দুটি নিয়ে কাজ করেছেন। তার মতে, অতীতকে খুব কাছ থেকে অনুভব করার আগ্রহ থেকেই মানুষ অনেক সময় এমন ঝুঁকি নেয়। তার মতে, হাজার বছর আগের কোনো জিনিসকে শুধু কাচের বাক্সে রেখে দেখার চেয়ে সেটির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অভিজ্ঞতা মানুষের কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। কিন্তু সেই আগ্রহের মূল্যও আছে। একটি প্রাচীন নিদর্শনে সামান্য ফাটল ধরলেও সেটি আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।

তুতেনখামেনের তূর্যের সবচেয়ে আশ্চর্য দিক সম্ভবত এটাই। তূর্য দুটি হয়তো আর কখনো বাজবে না। কিন্তু ১৯৩৯ সালে রেকর্ড করা সেই শব্দ এখনো টিকে আছে। প্রযুক্তির কারণে ভবিষ্যতেও মানুষ সেই শব্দ শুনতে পারবে। অর্থাৎ, তুতেনখামেনের তূর্য হয়তো আর কোনো দিনও তার ধাতব শরীর দিয়ে বাতাস কাঁপাবে না। কিন্তু তার পুরোনো সেই শব্দ রয়ে যাবে। হাজার হাজার বছর আগে মিসরের রাজদরবারে যে তূর্য বাজত, তার প্রতিধ্বনি একবার রেডিও তরঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর সেই প্রতিধ্বনি এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে পৌঁছে যেতে পারে ভবিষ্যতের মানুষের কাছেও।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension