প্রধান খবর

দূর্গাপূজা, শরতের উৎসব, শারদীয়া উৎসব

আজ বিজয়া দশমী। দেবী দূর্গার প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হবে সনাতন ধর্মের মানুষদের সবচেয়ে বড় ধমীর্য় উৎসব দুগার্পূজার। বিসর্জনের এই আবেশের ফলে সকল মন্ডপেই থাকবে বিষাদের সুর। বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে স্বামীর ঘরে ফিরে যাবেন দুর্গতিনাশিনী দুর্গা।

ইকবাল বাহার



বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দেওয়া তথ্যে জানা যাচ্ছে এ বছর বাংলাদেশে ৩১ হাজার ২৭২টি স্থায়ী-অস্থায়ী মন্ডপে দুগার্পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রাজধানীতে পূজা হচ্ছে ২৩৪টি পূজামন্ডপে।

দুর্গাপূজা সমগ্র সনাতন ধর্মের তথা হিন্দুসমাজেই প্রচলিত থাকলেও বাঙালি হিন্দু সমাজে দূর্গাপূজাকে অন্যতম বিশেষ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আশ্বিন বা চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে দুর্গাপূজা পালন করা হয়। তবে দুর্গাপূজা কিন্তু হিন্দু ধর্মীয় সকলের কাছেই প্রধান ধর্মীয় উৎসব নয়। মূলত বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিম বাংলার বাংলা ভাষাভাষী সনাতন ধর্মের মানুষেরা বিশাল আড়ম্বরে পালন করে।

শুরুতে দুর্গা পূজা প্রচলিত ছিল চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষে, যা বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত; কিন্তু মধ্যযুগে  কৃত্তিবাস ওঝা যখন রামায়ণ অনুবাদ করলেন তখন মূল সংস্কৃত রামায়ণে রাম দুর্গা পূজা করেছে, এমন কথার উল্লেখ না থাকলেও পুরাণে রামের দুর্গা পূজার কথা বলা হয়েছে বলে কৃত্তিবাস নিজের অনুদিত বাংলা রামায়ণে রাম দুর্গার পূজা করেছে বলে উল্লেখ করে দিলেন। সেই কৃত্তিবাসী রামায়ন পাঠ করেই বাঙালিরা শরৎ কালে দুর্গা পূজা করতে শুরু করে দিল। দুর্গা পূজার সময় হিসেবে শরৎ কালকে বেছে নেবার কারণ হল, দূর্গা পূজা কিছুটা অঞ্চলভিত্তিক পূজা। আর এসব অঞ্চলে এ সময়টাতে বৃষ্টিও তেমন হয় না। এবং নবান্ন। এ সময় ধান ও অন্যান্য শস্য ফলত, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো থাকত। ফলে মানুষ আনন্দ উৎসবে অংশ নিতে পারত।শরৎ কালের এই দূর্গা পূজাই হল ‘শারদীয় উৎসব।’

ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করে জানা গেল, মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে দূর্গা পূজার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ১১শ’ শতকে অভিনির্ণয়-এ, মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির দূর্গাভক্তিতরঙ্গিনীতে দূর্গা বন্দনা পাওয়া যায়। বাংলায় ১৪শ’ শতকে দুর্গা পূজার প্রচলন ছিল কিনা সেটা অবশ্য ভালোভাবে জানা যায় না। ১৫১০ সালে কুচ বংশের রাজা বিশ্ব সিংহ কুচবিহারে দূর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন।

১২০০ সালের আগে থেকেও ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজা হতে থাকলেও সম্ভবত জঙ্গলে ঘেরা থাকার কারণে এই পূজার কথা লোকেরা তেমন জানত না। ফলে বর্তমান বাংলাদেশের প্রথম দুর্গাপূজা বলা হয় রাজশাহী জেলার তাহেরপুর থানার রাজা কংসনারায়নের পূজাকে, যেটা শুরু হয় মোটামুটি ১৬০০ সালের দিকে। তাছাড়া ১৬১০ সালে কলকাতার বারিশার রায় চৌধুরী পরিবার প্রথম দূর্গাপূজার আয়োজন করেছিল বলে ধারণা করা হয়।

ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির মূলত একটি দুর্গা মন্দির। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকে অর্থাৎ ১১০০ থেকে ১২০০ সালের মধ্যে বাংলার সেন বংশের কোনও এক রাজা গভীর জঙ্গলের মধ্যে একটি দেবী দুর্গা সদৃশ মূর্তি খুঁজে পান। তারপর তারা সেখানেই একটি মন্দির বানিয়ে সেই মূর্তি স্থাপন করেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন দেবীর এই মূর্তির নাম ঢাকেশ্বরী। সেই নাম অনুযায়ীই এই মন্দিরের নাম হয় ঢাকেশ্বরী মন্দির এবং পরবর্তীতে এই ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে কেন্দ্র করেই বিস্তৃত হতে শুরু করে একটি নগর বা জনপদ, আস্তে আস্তে যার নাম হয় ঢাকা। আমাদের আজকের ঢাকা শহর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ ব্যাখ্যা করলেন এভাবে- মূলত ব্রিটিশ শাসনের সময় হিন্দু এলিট শ্রেণী আর জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্গা পূজা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। হিন্দুদের মধ্যে যে বর্ণবাদ বা শ্রেণীভাগ ছিল, সেটা নিয়ে তখন অনেক সামাজিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। যার ফলে তখন হিন্দু ধর্মকে পরিবর্তন করার দরকার হয়ে পড়েছিল। তখন বাংলার এলিট শ্রেণী মনে করল, এমন একটা শক্তির দরকার, যাকে সবাই মেনে নেবে। তখনই, ওই সময়টা থেকেই দুর্গার পূজা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাছাড়া দেবী দূর্গার জনপ্রিয়তার আরেকটা কারণ হল, দূর্গার মাতৃরূপ।

আসেন, দুর্গতিনাশিনীর ব্যাপারটা একটু জানা যাক। দূর্গতিকে বিনাশ করতেই দুর্গার আবির্ভাব। অসুররা যখন দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গ দখল করে নিচ্ছিল, তখন সকল দেবতারা তাদের শক্তিকে মিলিত করে দেবী দুর্গার উৎপত্তি করল. এই দুর্গা অসুরদের পরাজিত করে দেবতাদের বাসস্থান, স্বর্গ উদ্ধার করেছিল।

অসুরদেরকে হত্যা করতে দুর্গা যুদ্ধে নেমেছিল। অসুরদের প্রধান, নানা রূপ ধারণ করতে পারত। সম্ভবত অসুরের পছন্দের রূপ ছিল মহিষ।ধারণা করা হয়,  বাঘ বা সিংহ হিংস্রতায় অনেক উঁচু হলেও শক্তির দিক দিয়ে বাঘ বা সিংহের চেয়ে একটি মহিষের শক্তি অনেক বেশি। অসুরের এই রূপ পরিবর্তনের ক্ষমতাকে বোঝানোর জন্যই দুর্গায় কাঠামোয় ব্যবহার করা হয় মহিষ এবং এই মহিষের নাম অনুসারেই অসুরের নাম মহিষাসুর।

অসুররা দেবী দুর্গাকে  রক্তবীজ নামক এক দৈত্যকে পাঠাল। রক্তবীজের বৈশিষ্ট্য হলো তার দেহ থেকে রক্ত মাটিতে পড়লেই সে রক্ত থেকে আবার নতুন অসুরের উৎপত্তি হয়। রক্তবীজের রক্ত যেন মাটিতে না পড়ে সেজন্য দুর্গা নিজের থেকেই কালীকে সৃষ্টি করল। তখন কালী রক্তবীজের রক্তপান করে তাদের উৎপত্তি বন্ধ করতে লাগল। এভাবে দেবী দুর্গা  অসুরকে মেরে ফেলতে লাগল।

দুর্গাপূজাকে সার্বজনীন উৎসব বলা হয়। দেবী দুর্গা মায়ের রূপে বিরাজ করেন, সকলের মা। মা যেমন সন্তানের সুরক্ষাদায়িনী, তেমনি দেবী দূর্গাও সকল অপশক্তি বিনাশিনী, মুক্তিদায়িনী, আনন্দময়ী দুর্গা। মায়ের কাছে সকল সন্তানই সমান, সব সন্তানের কাছে মা অনন্য।সে কারণেই মা দুর্গা সর্বজনের, দুর্গাপূজা সার্বজনীন। তারপর সার্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব উৎসব হিসেবে বাংলা সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

সার্বজনীনতার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেল এরকম, রাজাদের বাইরে প্রথম বারোজন বন্ধু মিলে দুর্গা পূজা শুরু করেছিল। বন্ধু শব্দের হিন্দি প্রতিশব্দ’ ইয়ার।’ এই ‘ইয়ার‘ শব্দটা বাংলাতেও প্রচলিত ছিল। এখনও আমরা ‘ইয়ার-দোস্ত’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করি। তো এইভাবে বার+ইয়ার মিলিত হয়ে হয় বারোয়ারি।

দুর্গা পূজা অনেক খরচ সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল তখন। রাজা বা জমিদার ছাড়া কারও একার পক্ষে এর খরচ বহন করা সে সময় খুব কষ্টসাধ্য ছিল। এই সমস্যা থেকে উৎপত্তি হয় বারোয়ারি পূজার। এই ধরণের পূজা-ই এখন সার্বজনীন পূজা বলে পরিচিত।

 

সকলকে বিজয়া দশমীর শারদীয় শুভেচ্ছা।

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension