
বিদেশমুখী বিএনপি এখন বিদেশী চাপে!
জাকির হোসেন
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের উপর চাপ বাড়াতে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নির্বাচন ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের একজন সহকারি মহাসচিবের সঙ্গে আলোচনা করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল। দেশে ফিরে তিনি জানান, বিষয়গুলো দেখার আশ্বাস দিয়েছে জাতিসংঘ। এই সফর ছাড়াও কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যদিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি অর্জনের অংশ হিসেবে ইতিপূর্বে বিএনপি দেশের চলমান বিষয় নিয়ে কমনওয়েলথে একটি চিঠি দেয় এবং সম্প্রতি ভারত সফরে যান মির্জা ফখরুল।
এ ছাড়াও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ট্রাম্প প্রশাসনে লবিস্ট নিয়োগ করেছে বলে খবর প্রকাশ করেছে একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম। গত ১৩ সেপ্টেম্বর পলিটিকো নামে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়
বুস্টার স্ট্রাটেজিকস এবং রাস্কি পার্টনারস নামে দুটি প্রতিষ্ঠানকে হোয়াইট হাউজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এজন্য আগস্ট মাসে তাদের ২০ হাজার ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া বছরের বাকি মাসগুলোতে ওই প্রতিষ্ঠানকে ৩৫ হাজার ডলার করে পরিশোধ করা হবে। বিএনপির পক্ষ থেকে আব্দুল সাত্তার বুস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
এসবের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের শিগগিরই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যে যাওয়ার কথা রয়েছে। এসব তৎপরতা ও সফরের মাধ্যমে বিএনপি যখন ইতিবাচক সাড়া আশা করেছিল, ঠিক সেই তখন উল্টো নির্বাচনে অংশ নিতে আন্তর্জাতিক মহলের চাপে পড়তে শুরু করেছে দলটি।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপিকে চিঠি দিয়েছেন কমনওয়েলথ মহাসচিব প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে লেখা এ চিঠিতে নির্বাচনে অংশ নেয়ার আহবান জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাসচিব ।
চিঠিতে কমনওয়েলথ মহাসচিব জানান, কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশে সবদলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অপরিহার্য। এজন্য আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে অংশ নিতে উৎসাহিত করেন তিনি। চিঠিটি ২৮ সেপ্টেম্বর মির্জা ফখরুলের হাতে এসে পৌঁছায়। এতদিন বিএনপি নেতারা এ নিয়ে কোন কথা বলেন নি। বৃহস্পতিবার বিষয়টি জানাজানি হলে এ প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তারা দেশের চলমান বিষয় নিয়ে কমনওয়েলথে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। কমনওয়েলথ মহাসচিব সেই চিঠির জবাব দিয়েছেন। শিগগিরই বিএনপি এর জবাব দেবে।
চলতি বছরের আগস্টে ঢাকা সফর করেন কমনয়েলথ মহাসচিব। সে সময় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রী ও কর্মকতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। বিএনপির একটি প্রতিনিধিদলও সে সময় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। চিঠিতে সেই প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন প্যাট্রিসিয়া।
চিঠিতে কমনওয়েলথ মহাসচিব তার বংলাদেশে সফর এবং আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, ‘সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে গিয়ে আমরা প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তারা সবাই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে। আমরা মনে করি, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিএনপি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে অংশ নেবে বলে আমরা আশা করি। সবার অংশগ্রহণে যাতে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয় এ লক্ষ্যে আমরা আমাদের আওতার ভেতর থেকে সহায়তা করব। যারা মানবাধিকার এবং গণতন্ত্র নিশ্চিত করবে আমরা তাদের সঙ্গে থাকব।’
গত ৮ই আগস্ট ঢাকায় এসেছিলেন কমনওয়েলথ মহাসচিব প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীসহ সরকারের বেশ ক’জন মন্ত্রী এবং বিএনপিসহ বিরোধী রাজনীতিক, কূটনীতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।
এদিকে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশে শুধু অবাধ বা সুষ্ঠু নয় বরং অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বাংলাদেশ এর আগে অবাধ নির্বাচন করার দক্ষতা দেখিয়েছে বলে এবারও তা পারবে বলে মনে করেন ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত রেনসে টিরিঙ্ক সম্প্রতি গণমাধ্যমকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া আগ্রহের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে ইইউ। গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের অনেক নির্বাচন সম্পন্ন করার দক্ষতা রয়েছে। তবে এটা শুধুই দক্ষতার ব্যাপার না। জনগণ কতটা মুক্তভাবে ভোট দিতে পারছে, এটা দেখা জরুরি। আমাদের মেথোডোলজি হল অংশগ্রহণমূলক স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। আমরা আশা করি বাংলাদেশের দলগুলো সদিচ্ছা দিয়ে এই মানের নির্বাচন নিশ্চিত করবে।
বিএনপি’র বিদেশমুখী তৎপরতা বিষয়ে কূটনীতি বিশ্লেষকরা বলেন, বড় দুই দলের সম্মতি ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। সাবেক বিএনপি নেতা ও পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, সকল দল যেটা চায় বিশেষ করে বড় দু’দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং উভয় পক্ষই যদি রাজি হয়। তাহলে মধ্যস্ততা করার সুযোগ থাকে। কিন্তু এক পক্ষ যদি রাজী না হয় তাহলে কেউ কিছুই করতে পারবে না।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুর কবির জানান, একটা জাতীয় ঐক্যমত তৈরি করে বিষয়টা সুরাহা করে ফেলতে পারলেই ভালো হয়। এ ক্ষেত্রে ভারত কি বলছে, জাতিসংঘের কি মতামত, কারও কাছে গিয়েই দেন দরবারের সুযোগ বা প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমি মনে করি না।
অন্যদিকে জাতিসংঘের সাবেক বাংলাদেশি কর্মকর্তা হাসান ফেরদৌস এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, কোন দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য জাতিসংঘের মধ্যস্থতা করার সুযোগ নেই। নির্বাচন তদারকির জন্য বিশ্ব সংস্থাটির কোন মনিটরিং সেলও নেই। তার মতে, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কাজ করতে হলে সরকারের অনুমতি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণ ও কাঠামোগত সহায়তা করা ছাড়া নির্বাচনে জাতিসংঘের আর কোন ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। জাতিসংঘ কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কারোরই বাংলাদেশে নির্বাচন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ হওয়ার গ্যারান্টি দেয়ার উপায় নাই। তারা দূর থেকে দেখে বলতে পারে, ভালো হয়েছে কিনা। যখন আমরা কোন বিধি রাষ্ট্রের কাছে আসি দেনদরবার করতে, তখন আমরা আসলে আমাদের সার্বভৌমত্বটাকে দুর্বল করে ফেলি।’
জাতিসংঘের সাবেক এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার জাতিসংঘ মহাসচিবের দপ্তরের নেই। এজন্য সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। আর সরকার সহযোগিতা চাইলেই কেবল নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে পারে জাতিসংঘ।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণ ছাড়া কারও সাধ্য নেই বাংলাদেশে প্রবেশ করবার। ভিসা লাগবে তো। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে যে, জাতিসংঘ খুব বড় সংস্থা বটে, খুব ক্ষমতাবান সংস্থা নয়। আমি একটা উদাহরণ দেই- রোহিঙ্গা। পাশে বার্মা একটা দেশ, এথনিক ক্লিনজিং হয়ে গেছে। একটা জেনোসাইড হয়ে গেল। এখানে বসে কথা বলা ছাড়া কি করতে পেরেছে তারা। একটা লোককে দেশে ফেরত পাঠানো গেছে? যদি এটা সাধারণ পরিষদ বলত, নিরাপত্তা পরিষদ বলত, দ্যাটস অ্যা ডিফারেন্ট স্টোরি। জাতিসংঘ সেক্রেটারিয়েটের কোন ক্ষমতা নেই বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে, সরকারের সম্মতির বাইরে কোনভাবে নাক গলানো। ফলে যারা স্বপ্ন দেখছে অপজিশনের আমন্ত্রণে একটি মিডিয়া টিম যাবে, একটি মিডিয়াটর (মধ্যস্থতাকারী) যাবে। তারা স্বপ্ন দেখছে। হতে পারে অনলি ইফ, আমাদের সরকার এটাকে এগ্রি করে, আমন্ত্রণ পাঠায় এবং সম্মতি জানায়, কে আসবে, কখন আসবে কিভাবে আসবে। যেহেতু প্রটোকল ইনভলব এখানে। এর বাইরে নয়।’
হাসান ফেরদৌস মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের মত ক্ষমতা এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের নেই।
তার কথায়, ‘আমেরিকার এ মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব করার মত কোন তেমন ক্ষমতা নেই। আমাদের বার্ষিক ফরেন এইড ২২০ মিলিয়ন ডলারের মতো। যা আজকের বাংলাদেশের জন্য কিছুই না। কোন রিয়েল ওয়েট তারা ক্যারি করে না।’



