
আজ নীলার বিয়ে। বাড়ির আঙিনা ঝলমলে আলোয় সাজানো, সানাইয়ের সুরে ভরে গেছে চারদিক, আর আত্মীয়-স্বজনের হাসি-ঠাট্টায় মুখরিত পরিবেশ। কিন্তু এই সব কোলাহলের মাঝেও নীলার মনে এক অজানা শূন্যতা, এক চাপা কষ্ট। সাজঘরের বড় আয়নাটার সামনে বসে সে নিজেকে দেখছে—লাল বেনারসির ভারি শাড়ি, সোনার গহনা, কপালে টুকটুকে লাল টিপ। বাইরে থেকে দেখতে সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি কনে, কিন্তু তার চোখের গভীরে লুকিয়ে আছে অশ্রুর স্রোত।
নীলার চোখ বারবার চলে যায় জানালার বাইরে, যেখানে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। ঠিক যেমন ভাবে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নও আজ অস্তমিত হতে চলেছে। কারণ সে ভালোবেসেছিল রোহিতকে, আর সেই ভালোবাসা হারিয়ে গেছে সমাজের দেয়াল, পারিবারিক চাপে আর সময়ের নিষ্ঠুরতায়।
নীলা আর রোহিতের পরিচয় হয়েছিল কলেজের প্রথম দিনেই। দুজনেই বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে এসেছিল। প্রথম দিন ক্লাসে স্যার যখন রবীন্দ্রনাথের ‘শুভদৃষ্টি’ কবিতাটা পড়াচ্ছিলেন, তখন নীলা খেয়াল করল পাশে বসা ছেলেটা বড় মনোযোগ দিয়ে শুনছে, মাঝে মাঝে নিজের ডায়েরিতে কিছু লিখছে। ক্লাসের শেষে কৌতূহলো সামলাতে না পেরে নীলা জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কি নোট নিচ্ছ?’
রোহিত হেসে বলল, ‘না, কবিতার যেসব লাইন আমার মনে দাগ কাটে, সেগুলো লিখে রাখি।’
এই প্রথম আলাপের পর থেকেই দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত বন্ধন গড়ে উঠল। কলেজের প্রতিটি দিন একসাথে কাটাতে কাটাতে বন্ধুত্ব কখন যে ভালোবাসায় রূপ নিল, তারা নিজেরাও বুঝতে পারে নি। সন্ধ্যাবেলা কলেজের পাশের ছোট্ট কফির দোকানে বসে আড্ডা, কবিতার বই বিনিময়, আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনা—সবকিছুই ছিল এক স্বপ্নের মতো।
একদিন বসন্তের বিকেলে রোহিত নীলাকে বলল, ‘জানো, জীবনটা যদি একটা বই হয়, তাহলে আমি চাই তুমি হও আমার সেই অধ্যায়, যা কখনও শেষ হবে না।’
নীলা হেসে বলল, ‘তাহলে আমি তো তোমার গল্পের নায়িকা হলাম!’
‘তুমি শুধু গল্পের নায়িকা নও, তুমি আমার পুরো গল্পটাই।’
সেই দিনটা ছিল তাদের ভালোবাসার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। তারা ঠিক করেছিল, একসাথে জীবন কাটাবে, সব বাধা অতিক্রম করে ভালোবাসার জয় করবে। কিন্তু জীবন কি এত সহজ? সমাজ, পরিবার, দায়িত্ব—সবকিছুই যেন ধীরে ধীরে তাদের স্বপ্নের ওপর কালো মেঘের ছায়া ফেলল।
নীলার পরিবার ছিল রক্ষণশীল। তারা চাইত মেয়ের বিয়ে হোক তাদেরই পছন্দের ছেলের সাথে, যেখানে পারিবারিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সবকিছু বিবেচনা করা হবে। রোহিত, একজন স্বপ্নবাজ কবি, যে সাহিত্যকে জীবন করে নিয়েছে, তার জীবনের স্থায়িত্ব তখনও তৈরি হয়নি।
একদিন নীলার বাবা জানতে পারলেন তাদের সম্পর্কের কথা। সেই রাতে বাড়িতে ভীষণ ঝড় উঠল। নীলাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হলো, ‘তোমার পড়াশোনা শেষ হলে আমরা তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করব। এর মধ্যে যদি তুমি কোনো অন্য পথে যাও, তাহলে এই বাড়ির দরজা তোমার জন্য বন্ধ।’
নীলা ভয়ে, কষ্টে, দ্বিধায় ভেঙে পড়ল। রোহিতও বুঝতে পারছিল, তাদের সম্পর্কটা এক কঠিন পরীক্ষার মধ্যে পড়েছে।
বিয়ের এক সপ্তাহ আগে নীলা শেষবারের মতো রোহিতের সাথে দেখা করল। তারা কলেজের সেই প্রিয় কফি শপে বসে ছিল, কিন্তু আজ কোনো হাসি, কোনো স্বপ্নের গল্প ছিল না। শুধু নীরবতা আর চোখের ভাষা।
রোহিত বলল, ‘তোমার সুখের জন্য যদি আমাকে সরে যেতে হয়, আমি তাই করব, নীলা। ভালোবাসা শুধু পাওয়ার নাম নয়, প্রিয়জনকে সুখি দেখার নামও।’
নীলা কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘কিন্তু আমি কীভাবে সুখি থাকব, রোহিত?’
রোহিত কোনো উত্তর দিল না। সে তার ব্যাগ থেকে একটি বেলি ফুলের মালা বের করে নীলার হাতে দিল। ‘যখনই তুমি এই মালাটা দেখবে, মনে করবে, ভালোবাসা কখনও মরে না, শুধু রূপ বদলায়।’
আজ সেই দিন। নীলা যখন বিয়ের সাজে প্রস্তুত, তখন একজন পরিচিত ছোট্ট ছেলে এসে তার হাতে সেই বেলি ফুলের মালাটা দিয়ে গেল। সাথে ছিল একটি ছোট্ট চিঠি—
‘জীবন তোমাকে যেকোনো পথে নিয়ে যাক, জানবে, ভালোবাসা কখনও শেষ হয় না। তুমি সুখি থাকলেই আমি সুখি থাকব। – রোহিত’
নীলা মালাটা বুকে চেপে ধরল। চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু ঝরল। বাইরে সানাই বাজছে, আত্মীয়রা ডাকছে, কিন্তু নীলার হৃদয়ে আজ একটাই সুর বাজছে—হারানো ভালোবাসার অমলিন সুর।
নীলা জানে, জীবন সবসময় ইচ্ছেমতো চলে না। তবুও, স্মৃতির সেই বেলি ফুলের মালা তাকে সারাজীবন মনে করিয়ে দেবে—ভালোবাসা হারায় না, শুধু দূরে সরে যায়, অদৃশ্য কোনো জগতে, যেখানে সময়ের কোনো বাধা নেই।



