
রংপুরের চার প্রাণ: সত্যের আগে কোনো গল্প নয়
শাহ্ জে. চৌধুরী:
একটি পরিবারের চারটি প্রাণ। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, তাঁর স্ত্রী, তাঁদের সন্তান—একটি ঘর, একটি পরিবার, কিছু স্বপ্ন, কিছু স্মৃতি। অথচ মুহূর্তের নির্মমতায় সেই ঘরই পরিণত হয়েছে মৃত্যুর নীরব ঠিকানায়। রংপুরে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর হত্যাকাণ্ড তাই শুধু একটি অপরাধের ঘটনা নয়—এটি আমাদের বিবেক, আইন ও সমাজব্যবস্থার জন্যও এক গভীর প্রশ্ন।
এই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের বক্তব্য, গ্রেফতার এবং কথিত স্বীকারোক্তি নিয়ে নানা তথ্য সামনে এসেছে। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে আরও কিছু গুরুতর দাবি। কিন্তু এখানেই আমাদের সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ আর প্রমাণ এক নয়, গুঞ্জন আর সত্য এক নয়, স্বীকারোক্তির দাবি আর আদালতে প্রমাণিত অপরাধও এক নয়।
বিশেষ করে নিহত তরুণীর শরীরে কথিত যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়ার যে দাবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে, তার আনুষ্ঠানিক ও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত সেটিকে সত্য হিসেবে প্রচার করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা কিংবা মানবিকতার পরিচয় হতে পারে না। একইভাবে কোনো একটি কারণকে সামনে রেখে পুরো হত্যাকাণ্ডের রহস্যের সমাপ্তি টেনে দেওয়াও বিপজ্জনক।
আমাদের জানতে হবে—ঘটনাটি আসলে কীভাবে ঘটল? কারা সেখানে ছিল? হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? প্রত্যেকটি আলামত কী বলছে? সিসিটিভি, কল রেকর্ড, ফরেনসিক প্রতিবেদন, ডিএনএ পরীক্ষা, ময়নাতদন্ত এবং প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য—সবকিছু কি একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করছে?
আরেকটি বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সেটিকে সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের চশমায় দেখা শুরু করা যেমন অনুচিত, তেমনি কোনো সম্ভাব্য অপরাধের সবকিছুকে শুধু ‘মাদকের ঘটনা’ বলে সরলীকরণ করাও সমানভাবে বিপজ্জনক। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের সত্যটাই তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত।
চারজন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকের একটি জীবন ছিল, পরিবার ছিল, পরিচিত মানুষ ছিল, ভালোবাসার মানুষ ছিল। তাঁদের মৃত্যুকে রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব কিংবা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার উপাদানে পরিণত করা তাঁদের প্রতি দ্বিতীয়বারের মতো অন্যায়।
আমরা কোনো পক্ষের হয়ে কথা বলতে চাই না। আমরা চাই সত্যের পক্ষে কথা বলতে।
প্রয়োজন এমন একটি তদন্ত, যেখানে অপরাধীর ধর্ম, পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক অবস্থান কোনো কিছুই তদন্তের গতিপথ নির্ধারণ করবে না। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক তদন্ত, পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষা এবং প্রতিটি প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর।
কারণ চারটি প্রাণের মূল্য কোনো রাজনৈতিক বয়ানের চেয়ে বড়।
একটি পরিবারের কান্না কোনো সামাজিক মাধ্যমের গুঞ্জনের চেয়ে গভীর।
আর ন্যায়বিচারের পথে সবচেয়ে বড় শত্রু হলো—প্রমাণের আগে তৈরি হয়ে যাওয়া গল্প।
রংপুরের এই হত্যাকাণ্ডের সত্য আমরা জানতে চাই।
গুজব নয়—প্রমাণের ভিত্তিতে।
প্রতিহিংসা নয়—আইনের ভিত্তিতে।
সাম্প্রদায়িকতা নয়—মানবিকতার ভিত্তিতে।
চারটি প্রাণের জন্য সত্য উদঘাটিত হোক, প্রকৃত অপরাধীরা আইনের মুখোমুখি হোক এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক।



