
নিউ ইয়র্কযুক্তরাষ্ট্র
২৫ বছর পরও আকাশে জ্বলছে স্মৃতির আলো
২,৯৭৭ প্রাণের প্রতি শ্রদ্ধা, টুইন টাওয়ারের স্মৃতিতে নিউইয়র্ক—শোক, সাহস ও মানবতার এক অমর অধ্যায়
শাহ্ জে. চৌধুরী :
একটি সকাল বদলে দিয়েছিল পুরো পৃথিবীকে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সেই ভয়াবহ দিনে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ২,৯৭৭ মানুষ। ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল নিউইয়র্কের আকাশ, স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল একটি শহর। আজ ২৫ বছর পরও সেই ক্ষত পুরোপুরি মুছে যায়নি। তবে সেই শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাহস, আত্মত্যাগ, মানবতা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য ইতিহাস।
মাত্র ১৯ জন সন্ত্রাসী এই চারটি বিমান ছিনতাই করে সেগুলোকে গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রে পরিণত করে এবং জন্ম দেয় ইতিহাসের ভয়াবহতম অধ্যায়ের। দুটি বিমান আঘাত হানে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার নামে পরিচিত দুটি ভবনে। দুই ঘণ্টার মধ্যে ভবন দুটি মাটিতে ধসে পড়ে।
তৃতীয় বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর পেন্টাগনে আঘাত হানে। এ হামলায় ভবনের পশ্চিম পাশের কিছু অংশ ধসে পড়ে। চতুর্থ বিমানটির লক্ষ্য ছিল ওয়াশিংটনে হামলার। কিন্তু যাত্রীদের প্রতিরোধের সময় বিমানটি পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হয়।
এ হামলায় সেদিন প্রায় ৩ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। আহত হয় আরও ১০ হাজার মানুষ।
৯/১১-এর ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে নিউইয়র্কে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক স্মরণ ও শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রস্তুতি। নিহত ২,৯৭৭ মানুষের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে নিউইয়র্ক হারবারের আকাশে বিশেষ ড্রোন আলোক প্রদর্শনীতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তাঁদের স্মৃতি এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া টুইন টাওয়ারের প্রতীকী অবয়ব।
অন্ধকার আকাশে একের পর এক আলো জ্বলে ওঠার দৃশ্য যেন বলেছে—মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার স্মৃতি কখনো হারিয়ে যায় না। প্রতিটি আলো যেন একটি জীবন, একটি পরিবার এবং একটি অসমাপ্ত গল্পের প্রতীক।
স্মৃতির সঙ্গে শ্রদ্ধা বীরদের প্রতিও
৯/১১-এর স্মরণ শুধু নিহত সাধারণ মানুষের জন্য নয়; এটি সেইসব পুলিশ কর্মকর্তা, অগ্নিনির্বাপক, উদ্ধারকর্মী, চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবকের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধার সময়, যারা নিজের জীবনের নিরাপত্তার কথা না ভেবে অন্যকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিলেন।
তাঁদের অনেকেই সেদিন আর ঘরে ফিরতে পারেননি। কিন্তু তাঁদের সাহস ও আত্মত্যাগ আজও নিউইয়র্কের মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে আছে।
সেই আত্মত্যাগের উত্তরাধিকার কীভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকে, তার এক আবেগঘন উদাহরণও সামনে এসেছে ২৫তম বার্ষিকীতে।
৯/১১-তে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো এনওয়াইপিডি ডিটেলটিভ জো ভিজিয়ানোর দুই ছেলে জো ভিজিয়ানো জুনিয়র ও জেমস ভিজিয়ানো বাবার পথ অনুসরণ করে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগে যোগ দিয়েছেন।
বাবাকে হারানোর গভীর বেদনা তাঁদের থামিয়ে দেয়নি। বরং বাবার সেবার আদর্শই তাঁদের জীবনের পথ দেখিয়েছে। একটি পরিবারের এই গল্প যেন ৯/১১-এর বেদনার মধ্যেও সাহস ও উত্তরাধিকারের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
আজও ম্লান হয় নি স্বজন হারানোর স্মৃতি। নিউ ইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলার স্থলে নির্মিত হয়েছে ন্যাশনাল সেপ্ট. ইলেভেন মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়াম। হতাহতের পরিবারের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রতি বছর মার্কিনিরা নিউ ইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোতে সমবেত হন। নীল বাতি জ্বালিয়ে স্মরণ করবেন হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের।
লোয়ার ম্যানহাটন জুড়ে কঠোর নিরাপত্তা
২৫তম বার্ষিকীর মূল স্মরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে লোয়ার ম্যানহাটনে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংস্থা মোতায়েন থাকবে। কাউন্টারটেররিজম, কাউন্টার-ড্রোন এবং বিশেষায়িত নিরাপত্তা ইউনিটও প্রস্তুত থাকবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিউইয়র্কের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট বা বিশ্বাসযোগ্য হুমকির তথ্য নেই। তবে ২৫তম বার্ষিকীর বিশেষ গুরুত্ব বিবেচনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতায়।
স্মরণ অনুষ্ঠানকে ঘিরে লোয়ার ম্যানহাটনের বিস্তৃত এলাকায় যান চলাচলে সাময়িক বিধিনিষেধ থাকবে। ক্যানাল স্ট্রিট থেকে ব্যাটারি প্লেস এবং ব্রডওয়ে থেকে ওয়েস্ট স্তরিত পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল সীমিত বা বন্ধ রাখা হবে। ফলে নগরবাসী ও দর্শনার্থীদের গণপরিবহন ব্যবহার এবং বিকল্প পথ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
২৫ বছর পরও একটি প্রশ্ন—আমরা কী শিখেছি?
৯/১১-এর ২৫ বছর পর নিউইয়র্ক আজ আবারও দাঁড়িয়ে আছে শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে। টুইন টাওয়ার নেই, কিন্তু তার স্মৃতি আছে। ধ্বংসস্তূপ নেই, কিন্তু সেখানে হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্প আছে। আর আছে এমন এক শহরের ইতিহাস, যে শহর অন্ধকারের মধ্য থেকেও নতুন আলো খুঁজে নিয়েছে।
এই ২৫তম বার্ষিকী তাই শুধু অতীতকে স্মরণ করার দিন নয়—এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি অঙ্গীকারের দিন।
ঘৃণা নয়, মানবতা।
বিভেদ নয়, ঐক্য।
ধ্বংস নয়, শান্তি।
নিউইয়র্কের আকাশে জ্বলে ওঠা সেই হাজারো আলো যেন আজও বলে—
২,৯৭৭টি প্রাণ নিভে গেলেও তাঁদের স্মৃতির আলো কখনো নিভবে না।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
৯/১১-এর সকল নিহত, শহীদ ও আত্মত্যাগী মানুষের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
তাঁদের আত্মত্যাগ মানবতার ইতিহাসে চিরকাল অমর হয়ে থাকুক।
তাঁদের স্মৃতি হোক শান্তি, ভালোবাসা ও মানবতার পথচলার আলো।



