
৫২ শতাংশ ইসরায়েলি নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রাথির্তা চায় না
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে গাজায় শান্তিচুক্তিতে আসতে একপ্রকার বাধ্য করেছেন। ইসরায়েল কাতারে হামলার পর যখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিচ্ছিল, তখনই নেতানিয়াহুকে কাতার সরকারের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন রিপাবলিকান নেতা।
২০ দফা শান্তিচুক্তির ফলে নেতানিয়াহুর রাজনীতি যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে, তা ভালো করেই বুঝতে পারছিলেন দখলদারদের নেতা। এই অবস্থায় হুমুর্মুহু হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি হুমকির ফেলে দেয় দখলদার বাহিনী। কিন্তু ট্রাম্প এটা মেনে নিতে পারেননি। তিনি তার দূতদের পাঠিতে ইসরায়েলকে চাপে রেখেছেন।
অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তেলআবিব সফল করেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। তাদের সফরের একটাই লক্ষ্য নেতানিয়াহুকে চাপে রাখা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন গাজা যুদ্ধবিরতির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের বিরুদ্ধে গলা ফাটাচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার জেডি ভ্যান্স নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেখা করেন। বৈঠকে নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে কথা বলেন। রাষ্ট্র গঠন হলে তা হামাসের জন্য পুরস্কার হবে বলেও জানিয়েছেন। কারণ তেল আবিবের কর্মকর্তারা মনে কনে, ‘দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান’ মেনে নেওয়ার অর্থ নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকার আশা শেষ হয়ে যাবে।
আগামী বছর ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গাজা যুদ্ধে ফলের ওপরই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হলে সেই আশার গুড়ে বালি দেখছেন নেতানিয়াহু। তিনি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পরিবর্তে হামাসের বিলুপ্তি দাবি করেছেন।
গত মাসের শেষের দিকে ট্রাম্প গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ২০ দফা পরিকল্পনার প্রস্তাব দেন। কিন্তু হামাস তাদের জিম্মিদের মুক্তি দেওয়ার পরও যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ফেল সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
চলমান আলোচনা ইতিমধ্যেই ব্যাহত হওয়ার হুমকি তৈরি হয়েছে। সেই হুমকি দূরত করতে মরিয়া ট্রাম্প প্রশাসন। যাতে তিনি নিজেকে বিজয়ী হিসেবে দেখতে পারেন। গাজার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেই শান্তিরক্ষী হিসেবে ট্রাম্পের প্রচেষ্টা মাঠে মারা যাবে। তার ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একই কারণে তিনি সর্বশেষ পুতিনের সঙ্গে বৈঠকটি করেননি। কারণ বৈঠকটি ব্যর্থ হওয়ার শঙ্কা ছিল। ট্রাম্প বারবার ব্যর্থ হতে চান না।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর জন্য তার দেশে রাজনৈতিক সমস্যার ক্রমবর্ধমান লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মূলত অতি-ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীদের সমন্বয়ে গঠিত তার সরকার ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে সতর্ক। তারা মনে করছে, মার্কিন চাপ নেতানিয়াহুকে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আপোষে আসতে বাধ্য করতে পারে।
ইসরায়েলের সংসদে নেতানিয়াহুর সমর্থকদের মধ্যে কয়েকজন বৃহস্পতিবার তাকে একটি গোপন সতর্কবাণী জারি করেছেন। তাতে ইসরায়েলকে পশ্চিম তীর দখল করার আহ্বান জানানো হয়েছে। যেহেতু সংসদে পশ্চিম তীর দখলের প্রাথমিক অনুমোদন হয়ে গেছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এ ব্যাপারে নড়েচড়ে বসেছেন।
ট্রাম্প ইতোমধ্যে হুমকি দিয়েছেন, পশ্চিম তীর দখল করলে ইসরায়েল সব ধরনের মার্কিন সমর্থন হারাবে। তবে ট্রাম্পের এই হুমকি কতটুক কার্যকর তা নিয়ে সংশয় সন্দেহ রয়েই যায়।
রয়টার্স জানায়, নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর জেডি ভ্যান্স তিনটি বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন ও গাজা পুনর্গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি জানান, ইসরায়েলি প্রশাসনের প্রতি আমাদের আশা হলো, তারা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপারে একমত হবে। হামাসকে নিরস্ত্র করার ক্ষেত্রে আমাদেরই নেতৃত্ব দিতে হবে। তাহলেই কেবল আন্তর্জাতিক বাহিনী কার্যক্রম ভালো করতে পারবে।
আল জাজিরা জানায়, ইসরায়েলের চ্যানেল-১২ প্রকাশিত একটি জরিপ অনুসারে, ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা বিশ্বাস করেন, পরবর্তী নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রার্থী হওয়া উচিত নয়। ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, লিকুদ পার্টির নেতা হিসেবে আবার প্রধানমন্ত্রী পদে তার প্রার্থী হওয়া উচিত। আর ৭ শতাংশ মানুষ তার প্রার্থিতা সম্পর্কে অনিশ্চিত।
ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ক্লায়েন্ট রাষ্ট্র!
ইসরায়েলে মার্কিন কর্মকর্তাদের উপস্থিতির ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘শিশুপালনের’ ভূমিকায় দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঠিক রাখতে যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার জন্য অজুহাত খুঁজতে মরিয়া নেতানিয়াহু। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র তাকে থামাতে চায়। সন্তানের মতো শাসন করে কাজটি তারা করতে চায়।
নিউইয়র্কে নিযুক্ত প্রাক্তন ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত এবং কনসাল জেনারেল অ্যালন পিঙ্কাস এশিয়া টাইমসকে বলেন, অবশ্যই ইসরায়েল হল যুক্তরাষ্ট্রের একটি ক্লায়েন্ট রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইসরায়েল কোটি কোটি ডলার সাহায্য পায়। জাতিসংঘে সমালোচনা বা নিষেধাজ্ঞা থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করার জন্য ওয়াশিংটন কয়েক ডজন বার ভেটো ব্যবহার করেছে। তারা ইসরায়েলের সামরিক সুরক্ষা দিয়ে আসছে বছরের পর বছর। সেই হিসেবে এখন পর্যন্তক ট্রাম্পের প্রশাসন অনেকাংশে সফল বলে মনে হচ্ছে। ওয়াশিংটন যখনই ইসরায়েলকে কিছু করার নির্দেশ দেয়, তখন ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত তাতে রাজি হয়।
গত বৃহস্পতিবার টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি নেতানিয়াহুকে গাজা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া থেকে বিরত রেখেছিলেন। আপনারা জানেন, আমি তাকে থামিয়েছিলাম। তা না হলে যুদ্ধ বছরের পর বছর ধরে চলতে পারত।
নেতানিয়াহুর প্রাক্তন সহযোগী মিচেল বারাক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক উভয় দেশের নীতির একটি কেন্দ্রীয় অংশ। এটি ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধের একটি ভাগাভাগি অনুভূতির ওপর নির্মিত। তইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের একটি মূল্যবান কৌশলগত অংশীদার।
সূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা ও এশিয়া টাইমস



