প্রধান খবরবাংলাদেশ

আমাদের ধর্ম, লিঙ্গ ও জাতিগত বিভাজনের উর্ধ্বে উঠতে হবে: প্রধান বিচারপতি

বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছেন, শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনের লক্ষ্যে ধর্ম, লিঙ্গ ও জাতিগত বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।

আজ শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর আর্চবিশপ হাউসে ভ্যাটিকান প্রতিনিধিদলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, আজকে যে আলোচনা আমরা করলাম, আপনার ধর্ম, আপনার লিংগ, আপনার বর্ণ, আপনার গায়ের কী রং কিছুই আসে যায় না, আমাদের সব কিছুর উর্ধ্বে উঠতে হবে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি আজ অনুষ্ঠানে সংবিধান, মদিনা সনদের কথা বলেছি। মহান আদর্শের কথা বলেছি। মানবিকতা অর্জনে কোনো না কোনো সময় বাধা বিপত্তির মধ্যে দিয়ে যায়, ধারাবাহিকতা অনেক সময় আটকে যায়, তবে তার জন্য পিছপা হওয়া যাবে না। সেটাই আজকের মেসেজ ছিল। আমাদের সব বিভেদের ওপরে উঠতে হবে, যত ঘাত প্রতিঘাতই আসুক না কেন। আমাদের একসংগে বসে, এগুলো যে ঘটনা ঘটছে, এর সূত্রপাত খুঁজে বের করতে হবে। এই ঘটনায় নিরুৎসাহিত হওয়া যাবে না, এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের ইউনিটি অব ডাইভার্সিটি গ্রহণ করতে হবে।’

বর্তমানে মবের সংস্কৃতিসহ যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে, এর পেছনে প্রধান কারণ কী? পারস্পরিক আস্থা কমছে, নাকি রাজনৈতিক কারণও আছে? সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সমাজ ব্যবস্থার কাছ থেকে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কাছ থেকে আমাদের আশা আকাঙ্ক্ষাটা কী, সেটা আমরা অনেক সময় ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ হচ্ছে না। তবে আমাদের জিজ্ঞেস করতে হবে আমরা কি একটু বেশি চাইছি? আমরা কি খুব তাড়াতাড়ি অনেক দূর এগিয়ে যেতে চাইছি? একটু সহিষ্ণু হতে হবে। একটু ধৈর্য্য ধরতে হবে। একটু বাস্তববাদী হতে হবে।’

ভ্যাটিকানের ইন্টাররিলিজিয়াস ডায়ালগ বিভাগের প্রিফেক্ট কার্ডিনাল জর্জ জ্যাকব কোভাকাদকে স্বাগত জানাতে বাংলাদেশ ক্যাথলিক বিশপ সম্মেলন (সিবিসিবি) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন বিভাগের সচিব মন্সিনিয়র ইন্দুনিল জনকরত্নে কোদিথুওক্কু কানকানামালাগে, ফাদার জোসেফ ভিক্টর এডউইন, এসজে ও ইসলাম ইন এশিয়া এন্ড প্যাসিফিকের ইনচার্জ ফাদার মার্কাস সলো কেওটা, এসভিডি।

এই প্রতিনিধিদল আন্তঃধর্মীয় সংলাপকে উৎসাহিত করতে এক সপ্তাহের সফরে ঢাকায় এসেছেন। তারা শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, আন্তঃধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন, জাতীয় মসজিদ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বৌদ্ধ ও হিন্দু মন্দির এবং রাজধানীর ক্যাথলিক গির্জা পরিদর্শন করবেন।

এর আগে প্রধান বিচারপতি স্বাগত অনুষ্ঠানেও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক ধর্ম অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান শেখায়। আমাদের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতার নীতিকে সমর্থন করে। পারস্পরিক সংলাপ ও সহাবস্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের সব ধর্মের মানুষ একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে পারে।

কার্ডিনাল জর্জ জ্যাকব কোভাকাদ বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্যের প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশ একটি উজ্জ্বল উদাহরণ, যেখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও মুসলমানরা একসঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে। এই ঐক্য মানব মর্যাদা বৃদ্ধি করে।

সৈয়দ রেফাত আহমেদ পোপ ফ্রান্সিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, পোপ ফ্রন্সিস তার সর্বজীন পত্রে ‘ফ্রাতেল্লী তুত্তি’ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এই বৈশ্বিক যুগে আমাদের চরম জাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এই মনোভাব শুধু নিজেদের স্বার্থকেই সহ্য করে এবং বাইরের সবকিছুকে হুমকি হিসেবে দেখে।

কার্ডিনাল কোভাকাদ মনে করেন, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়। এই সংলাপের ফলাফলই মানুষের মধ্যে গভীর ঐক্য আনতে পারে।

সিবিসিবি আর চেয়ারম্যান আর্চবিশপ বিজয় ডি’ক্রুজ স্বাগত বক্তব্যে বলেন, আমি কার্ডিনাল জর্জ কোভাকাদকে বাংলাদেশে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। আপনার উপস্থিতি ও দিকনির্দেশনা আমাদের দেশে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ভ্যাটিকানের কার্ডিনাল জর্জ জ্যাকব কোভাকাদের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল আজ শনিবার ঢাকায় পৌঁছেছে। কাকরাইলে আর্চবিশপ ভবনে প্রতিনিধি দলকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। সপ্তাহব্যাপী তারা নানা ধরনের আন্ত:ধর্মীয় সংলাপে অংশ নেবেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension