আন্তর্জাতিক

ধনকুবের আল ফায়েদের যৌন নিপীড়নের শিকার ৫ নারী ‘আধুনিক দাসত্বের’ শিকার হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন

মোহাম্মদ আল ফায়েদ লন্ডনের বিলাসবহুল হ্যারডস ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মালিক ছিলেন এবং প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে নিহত দোদির বাবা।

প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে নিহত দোদির বাবা ও যুক্তরাজ্যের অন্যতম বিলাসবহুল ও বিখ্যাত ডিপার্টমেন্টাল স্টোর হ্যারডসের সাবেক মালিক মোহাম্মদ আল ফায়েদের নির্যাতনের শিকার হওয়া অন্তত পাঁচ নারীকে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে আধুনিক দাসত্বের শিকার বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।

চলতি বছরের এপ্রিলে বিবিসি প্রকাশ করেছিল, নিজের পরিচয় গোপন রাখার অধিকার ত্যাগ করা র‍্যাচেল লাউ প্রথম নারী হিসেবে এ ধরনের স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

এরপর থেকে আরও অন্তত চারজন নারী ইতিবাচক ‘চূড়ান্ত ভিত্তি’ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পেয়েছেন, এর মধ্যে তাদের আধুনিক দাসত্বের শিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথাও রয়েছে। সংবাদ সংস্থা প্রেস অ্যাসোসিয়েশন মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, আরও অনেকেই শীঘ্রই একই ধরনের স্বীকৃতি পেতে পারেন।

সর্বশেষ মামলাগুলোর মধ্যে এমন কিছু নারী অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন যাদের আন্তর্জাতিকভাবে এবং যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরে পাচার করা হয়েছিল, যার মধ্যে একটি ক্ষেত্রে পাচারের পুরো ঘটনাটি হ্যারডসের ভেতরেই ঘটেছিল।

যুক্তরাজ্যে আধুনিক দাসত্বের শিকার হওয়া মানুষদের শনাক্ত করার জন্য গঠিত অফিশিয়াল কাঠামো ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজমের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি যখন একটি ইতিবাচক “চূড়ান্ত ভিত্তি” সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত লাভ করেন, তখন তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে একজন ভুক্তভোগী হিসেবে মেনে নেওয়া হয়।

আইন বিশেষজ্ঞরা এর আগে বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত ফৌজদারি মামলায় সাক্ষীদের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও শক্তিশালী করতে পারে এবং পুলিশ যেভাবে মামলার তদন্ত পরিচালনা করে, তাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

যুক্তরাজ্যে ২০১৫ সালে কার্যকর হওয়া আধুনিক দাসত্ব আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে শোষণের উদ্দেশ্যে একটি দেশের অভ্যন্তরে বা সীমান্ত পেরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা কিংবা সেই যাত্রা সহজতর করাকে মানবপাচার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

সর্বশেষ স্বীকৃতিপ্রাপ্তদের মধ্যে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ‘নো ওয়ান অ্যাবাভ’ নামের সংগঠনের চার সদস্যই রয়েছেন। তাদের সবাইকে আধুনিক দাসত্ব বিরোধী দাতব্য সংস্থা ‘আনসিন’ জাতীয় রেফারেল ব্যবস্থায় পাঠানোর পর থেকে তারা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন।

প্রেস অ্যাসোসিয়েশন মিডিয়ার তথ্য অনুসারে, একজন ভুক্তভোগীকে হ্যারডসের ভেতরে একটি ভুয়া পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যেখানে অন্য দুজনকে নিপীড়নের জন্য নির্বাচনের পূর্বে আসল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

চতুর্থ একজন নারী ‘হাইড পার্ক রেসিডেন্স’ নামে একটি বাসস্থান-ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ার পর আল ফায়েদ পরিবারের গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেছিলেন।

বেঁচে ফেরা নারীদের একজন বলেছেন, এই স্বীকৃতি পাওয়া তার জন্য ‘খুবই তাৎপর্যপূর্ণ’।

তিনি প্রেস অ্যাসোসিয়েশন মিডিয়াকে বলেন, ‘লিখিতভাবে এটা দেখতে পাওয়া যে আপনি আধুনিক দাসত্ব ও মানবপাচারের শিকার ছিলেন—এটা সত্যিই … পড়ে ভীষণ বিস্ময়কর অনুভূতি হয়।’

এপ্রিলে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে র‍্যাচেল লাউ বলেন, সরকার তার ঘটনাকে স্বীকৃতি দেওয়ায় তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনুভূতি এবং নিজের অভিজ্ঞতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে মনে করেছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বলা হয়, মোহাম্মদ আল ফায়েদ এবং তার ভাই সালাহ আল ফায়েদের মাধ্যমে তিন বছর ধরে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে তিনি যৌন শোষণের শিকার হয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘যে বিষয়টি নিজেই এত গভীরভাবে নেতিবাচক ছিল, সেটির স্বীকৃতি পেয়ে ইতিবাচক অনুভূতি হওয়া ছিল এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। কিন্তু এটি আমার জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনুভূতি এবং আমার অভিজ্ঞতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।’

১৯৮৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত লন্ডনের বিলাসবহুল হ্যারডস ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মালিক ছিলেন মোহাম্মদ আল ফায়েদ। তার বিরুদ্ধে শত শত নারী ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, মানবপাচার এবং যৌন শোষণের অভিযোগ তুলেছেন। ২০২৩ সালে ৯৪ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। জীবদ্দশায় এসব অভিযোগে তার বিরুদ্ধে কখনো কোনো অভিযোগপত্র গঠন করা হয়নি। তার ভাই সালাহ আল ফায়েদের বিরুদ্ধেও একাধিক নারী নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। সালাহ ২০১০ সালে মারা যান।

লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ ‘অপারেশন কর্নপপি’ নামে পরিচালিত তদন্তে ফায়েদের অপরাধের পেছনে অন্য কেউ সহায়তা বা সুযোগ করে দিয়েছিল কি না তা খতিয়ে দেখছে।

মেট্রোপলিটন পুলিশ তাদের তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে মানবপাচারের অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত করেছে। মার্চ মাসে তারা জানায়, যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে মানবপাচার, ধর্ষণে সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অভিযোগে চারজনকে সতর্কীকরণের মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

পুলিশ আরও জানায়, এখন পর্যন্ত ১৫৪ জন ভুক্তভোগী সামনে এসে যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, যৌন শোষণ এবং মানবপাচারের অভিযোগ জানিয়েছেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension