অগ্নিঝরা মার্চমুক্তিযুদ্ধস্বাধীনতা

আমি মুজিব বলছি: এ গণবিস্ফোরণ মেশিনগানেও স্তব্ধ করা যাবে না

জাকির হোসেন

আজ ১৮ মার্চ। একাত্তরের আরেকটি অগ্নিঝরা দিন। কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই আগের দিন (১৭ মার্চ) মুজিব-ইয়াহিয়া দ্বিতীয় দফা বৈঠক শেষ হওয়ায় এবং তৃতীয় দফা বৈঠকের দিন নির্ধারিত না হওয়ার একাত্তরের এই দিনে (১৮ মার্চ) স্বাধীনতাকামী বাঙালির মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয় এবং তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। এদিন সরকারি-বেসরকারি অফিসে অনুপস্থিতির হার আরো বেড়ে যায়। দলে দলে মানুষ যোগ দিতে থাকে মুক্তির আন্দোলনে। স্বাধীনতা সংগ্রামের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ছাত্র- শ্রমিক-জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষ মুক্তির স্লোগানে ঢাকার রাজপথকে আবার নতুন করে প্রকম্পিত করে তোলে।
 
এদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শপথদীপ্ত ছাত্র যুবক, নার্স, ব্যাংক কর্মচারী, নার্সিং স্কুল ও কলেজের ছাত্রী, ট্রাক ড্রাইভার ইত্যাদি সমাজের বিভিন্ন স্তরের সংগ্রামী মানুষ মিছিলসহ বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির সামনে সমবেত হয় এবং নেতার প্রতি অকুণ্ঠ আস্থা জ্ঞাপন করে। সারাদিন ধরে আনাগোনাকারি বিদেশি সাংবাদিক এবং এইসব মিছিলের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বঙ্গবন্ধু আবেগ ভরা কণ্ঠে বলেন, ‘বিদেশি বন্ধুরা দেখুন, আমার দেশের মানুষ আজ প্রতিজ্ঞায় কি অটল, সংগ্রাম আর ত্যাগের মন্ত্রে কতো উজ্জীবিত, কার সাধ্য এদের রোখে?’
 
বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, ‘আমার দেশ আজ জেগেছে। স্বাধীনতার জন্য জীবনদানে অগ্নিশপথে দীপ্ত জাগ্রত জনতার এ জীবন জোয়ার এবং এ প্রচণ্ড গণবিস্ফোরণকে স্তব্ধ করতে পারে এমন শক্তি আজ আর মেশিনগানেরও নাই।’
 
আগত মিছিলকারীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে সংক্ষিপ্ত ভাষণ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলার মানুষ তোমরা ঘরে ঘরে সংগ্রাম দূর্গ গড়ে তোলো। আঘাত যদি আসে, প্রতিহত করো, পাল্টা আঘাত হানো।’
 
তিনি বলেন, ৭ কোটি বাঙালির সার্বিক মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। চরম ত্যাগের বিনিময়ে হলেও আমরা লক্ষ্যে পৌছিবই। তিনি বলেন, ‘দরকার হলে রক্ত দিয়েই আমরা দাবি প্রতিষ্ঠা করবো-তবু শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দিবো না। দাবি আদায় করতেই হবে। শান্তিপূর্ণভাবে হয় ভালো-না হলে সংগ্রামের দুর্গম পথ ধরেই আমরা লক্ষ্যস্থলে পৌছিব’।
 
 
 
একাত্তরের একদিনে (১৮মার্চ) বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়ার কোনো বৈঠক ছিল না। সকালে নিজ বাসভবনে বঙ্গবন্ধু ন্যাপ প্রধান ওয়ালী খানের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। এক ঘণ্টা স্থায়ী এ বৈঠকে পশ্চিম পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি গাউস বখশ উপস্থিত ছিলেন। এ বৈঠক বিষয়ে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেন, ওয়ালী খান আমার বন্ধু। বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশেই আমাদের আলোচনা হয়েছে। যতদিন তিনি ঢাকায় আছেন যে কোনো সময় আমরা আলোচনা পারি।
 
আগের দিন (১৭ মার্চ, বুধবার) বিগত ‘২ থেকে ৯ মার্চ’ পর্যন্ত বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সাহায্যের নামে কোন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী নামানো হয়েছিল-তা তদন্তের জন্য যে কমিশন গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়, তা প্রত্যাখ্যান করেন বঙ্গবন্ধু। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আমি দুঃখিত যে, বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ হতে আমি যে তদন্তের দাবি করেছি এর পরিপ্রেক্ষিত গঠিত তদন্ত কমিশন উক্ত দাবি পূরণ করতে পারে না। সামরিক আইন আদেশ মারফত এর গঠন এবং সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের কাছে এর রিপোর্ট পেশের ব্যবস্থা অত্যন্ত আপত্তিজনক। এর শর্তসমূহ একান্ত মৌলিক প্রশ্নসমূহের ক্ষেত্রে প্রাক বিচারের মনোভাবই প্রকাশ পেয়েছে এবং প্রকৃত বক্তব্য সম্পর্কিত তদন্তের পথটি এর দ্বারা রোধ করা হয়েছে। বিবৃতিতে তিনি এ কমিশনকে সহযোগিতা না করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
 
বঙ্গবন্ধু এদিন নিজ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গেও আলোচনায় বসেন। অন্যদিকে ইয়াহিয়াও তার উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। সদ্য ঢাকায় আসা পাক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আবদুল হামিদও এ বৈঠকে যোগ দেন। সেখানে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ৪ দফা নিয়ে আলোচনা করেন তারা। এই দিনে তেজগাঁও ও মহাখালীতে নিরস্ত্র ট্রাক আরোহীদের নির্মমভাবে প্রহার করে সেনা সদস্যরা। মহাখালী রেলক্রসিং এলাকায় পাকসেনাদের গুলিতে মেহের আলী নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। এ ঘটনার পর স্থানীয় জনগণ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। রাতে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির উপনেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে সংবাদপত্রে একটি বিবৃতি দেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘‘আমাদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও সেনাবাহিনীর দায়িত্বজ্ঞানহীন কার্যকলাপ অব্যাহত রয়েছে। ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মধ্যে তারা বিনা অজুহাতে নিরস্ত্র-নিরীহ-নিরপরাধ জনগণকে অপদস্ত, হয়রানি ও নির্যাতন করছে। ঢাকাসহ সারাদেশে সেনাবাহিনী উস্কানিমূলক আচরণ অব্যাহত রেখেছে-যা সাধারণ জনগণকে প্রতিনিয়তই বিক্ষুব্ধ করে তুলছে। আমরা পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই, এ ধরনের উস্কানিমূলক আচরণ আর সহ্য করা হবে না। এর ফলাফলের দায়িত্বও তাদেরই বহন করতে হবে।’’
 
অন্যদিকে পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো এদিন আলোচনার জন্য ঢাকায় না আসার ঘোষণা দেন। তিনি দলীয় নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর করাচীতে সাংবাদিকদের বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গত ১৬ মার্চ এক বাণীতে তাকে ১৯ মার্চ ঢাকায় যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু তিনি কতিপয় বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন। কয়েকটি প্রশ্নের জবাব পেলেও কতকগুলো বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে তিনি দাবি করেন।
 
পরদিন ১৯ মার্চ প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা এসব ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। এ দিন সংবাদ ‘তদন্ত কমিশন বর্জন: ‘মৌল প্রশ্ন বিচারের অভিপ্রায় নস্যাত করা হইয়াছে: মুজিব’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৫ কলামে প্রকাশ করে।
 
সংবাদে -এ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত অন্যন্য সংবাদগুলোর শিরোনাম ছিল, ‘মুজিব ওয়ালী দ্বিতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত’, ‘বাধা দিলে প্রতিরোধ করিব’, ‘আজ মুজিব ইয়াহিয়া বৈঠক’, ‘বুলেট অথবা মেশিন গান মানুষকে দমাইতে পারিবে না’, ‘ঢাকায় গিয়া লাভ হইবে না: ভুট্টো’, ‘উস্কানী সহ্য করা হইবে না’; ইত্যাদি।
 
 
 
 
আজাদ এদিন ‘তদন্ত কমিশন প্রত্যাখ্যান, বাংলাদেশের জনগণ সহযোগিতা করিবে না: মুজিব’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৬ কলামে প্রকাশ করে। এছাড়া আজাদ ‘সেনাবাহিনীর দায়িত্বহীন কার্যকলাপ অব্যাহত’, ‘মুজিব ওয়ালী সাক্ষাৎকার’, ‘আজ মুজিব-ইয়াহিয়া তৃতীয় দফা বৈঠক: ঢাকায় নেতৃ সমাবেশ’ ভুট্টোর ঢাকা আগমনে অস্বীকৃতি’ শিরোনামে কয়েকটি খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে।
 
আর ইত্তেফাক এদিন ‘আমি মুজিব বলছি: এ গণ বিস্ফোরণ মেশিনগানেও স্তব্ধ করা যাইবে না’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৬ কলামে প্রকাশ করে। এ ছাড়াও ইত্তেফাকে ‘এ তদন্ত কমিশন চাহি নাই’, ‘আজ মুজিব ইয়াহিয়া তৃতীয় বৈঠক’, ‘উস্কানীমূলক যথেচ্ছাচার বন্ধ করুন- নজরুল ইসলাম’, ‘ভুট্টো আসিতেছেন না’ শিরোনামে কয়েকটি খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়।
 
১৯ মার্চ (শুক্রবার) দৈনিক সংবাদ, ইত্তেফাক ও আজাদে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো:
 
আমি মুজিব বলছি: এ গণ বিস্ফোরণ মেশিনগানেও স্তব্ধ করা যাইবে না-
স্টাফ রিপোর্টার: বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবের ধানমন্ডিস্থ বাসভবন এখন মুক্তিকামী জনতার তীর্থক্ষেত্র। স্বাধিকারকামী বাংলার মানুষ অসহযোগ আন্দোলনের ধারাক্রমে আবালবৃদ্ধবনিতা নির্বিশেষে সমাজের সব পর্যায়ের মানুষের সেখানে যেন ঢল নামিয়াছে। জাতীয় জীবনের বর্তমান সংকট সন্ধিক্ষনে রাষ্ট্রপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া ও জাতীয় নেতা শেখ মুজিবর রহমানের মধ্যে দই দফা বৈঠকের পর তৃতীয় বৈঠকের কোনো সময় ধার্য না হওয়ায় জনমনে কিছুটা জিজ্ঞাস জাগায় গতকাল ভোর হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত উৎসুক জনতা প্রতিনিয়ত ভীর জমাইতে থাকেন নেতার বাসভবনে। শপথদীপ্ত ছাত্র যুবক, নার্স, ব্যাংক কর্মচারী, নার্সিং স্কুল ও কলেজের ছাত্রী, ট্রাক ড্রাইভার প্রভৃতি সমাজের বিভিন্ন স্তরের সংগ্রামী মানুষের মিছিল আসিয়া নেতার প্রতি অকুণ্ঠ আস্থা জ্ঞাপন করিয়া প্রতিদানে তাহারা আর্শীবাদ কামনা করেন। সারাদিন ধরিয়া আনাগোনাকারী বিদেশী সাংবাদিকের দৃষ্টি এই সব মিছিলে প্রতি আকর্ষন করিয়া নেতা আবেগ ভরা কণ্ঠে এক পর্যায়ে বলেন, বিদেশী বন্ধুরা দেখুন, আমার দেশের মানুষ আজ প্রতিজ্ঞায় কি অটল, সংগ্রাম আর ত্যাগের মন্ত্রে কতো উজ্জীবিত, কার সাধ্য ইহাদের রোখে?
 
তিনি বলেন, আমার দেশ আজ জাগিয়াছে। স্বাধীনতার জন্য জীবনদানে অগ্নিশপথে দীপ জাগ্রত জনতার এ জীবন যোয়ারকে এ প্রচন্ড গণবিস্ফোরণকে স্তব্ধ করিতে পারে এমন শক্তি মেশিনগানেরও আজ আর নাই।
 
বিদেশি সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভোর ৫টা হইতে রাত্রি পর্যন্ত আপনারা কেবল এই দৃশ্যই দেখিতে পাইবেন। একের পর এক তাহারা বাসভবনে সমাগত শোভাযাত্রীদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত ভাষন দান প্রসঙ্গে প্রত্যয় দীপ্ত ঘোষণায় মুক্তি সংগ্রামের পতাকা আরো উর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়া এদেশের আপামর মানুষের স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলার মানুষ তোমরা ঘরে ঘরে সংগ্রাম দূর্গ গড়িয়া তোলো। আঘাত যদি আসে, প্রতিহত করো, পাল্টা আঘাত হানো।’ তিনি বলেন, ৭ কোটি বাঙালীর সার্বিক মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। চরম ত্যাগের বিনিময়ে হইলেও আমরা লক্ষ্যে পৌছিবই।…
 
তিনি বলেন, ‘দরকার হইলে রক্ত দিয়াই আমরা দাবি প্রতিষ্ঠা করিব-তবু শহীদের রক্ত বৃথা যাইতে দিব না। তিনি বলেন, ‘দাবি আদায় করিতেই হইব। শান্তিপূর্ণভাবে হয় ভালো-নইলে সংগ্রামের দূর্গম পথ ধরিয়াই আমরা লক্ষ্যস্থলে গিয়া পৌছিব।
(ইত্তেফাক: ১৯ মার্চ, শুক্রবার-১৯৭১)
 
বাংলাদেশের জনগণ সহযোগিতা করিবে না : মুজিব
তদন্ত কমিশন প্রত্যাখান
ঢাকা ১৮ মার্চ।-সামরিক আইন আদেশ অনুযায়ী গঠিত ‘তদন্ত কমিশন’ আমরা গ্রহণ করিতে পরি না। বাংলাদেশের জনসাধারণ কোনো ক্ষেত্রেই এইরূপ। কমিশনের সহিত সহযোগিতা করিবে যা। কেহই এই কমিশনে সদস্য হিসেবে কাজ করিবে না। ‘খ’ জোনের সামরিক আইন ও শাসক কর্তৃক তদন্ত কমিশন গঠনের ঘোষণা সম্পর্কে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবর রহমান উপরোক্ত অভিমত প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, আমি দু:খিত যে, বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ হইতে আমি যে তদন্তের দাবি করিয়াছি উহার পরিপ্রেক্ষিত গঠিত তদন্ত কমিশন উক্ত দাবি পূরণ করিতে পারে না। সামরিক আইন আদেশ মারফত ইহার গঠন এবং সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের নিকট ইহার রিপোর্ট পেশের ব্যবস্থা অত্যন্ত আপত্তিজনক। ইহার শর্তসমূহ একান্ত মৌলিক প্রশ্ন সমূহের ক্ষেত্রে প্রাক বিচারের মনোভাবই প্রকাশ পাইয়াছে এবং প্রকৃত বক্তব্য সম্পর্কিত তদন্তের পথটি ইহাদ্বারা রুদ্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। একমাত্র পূর্বশর্ত হইল, কোনো পরিস্থিতিতে ২রা মার্চ হইতে ৯ই মার্চ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সাহাযার্থে সৈন্য বাহিনী তলব প্রয়োজন হইয়াছিল উহা নির্ধারন।
 
 
এইভাবে মৌলিক বিষয়টি সম্পর্কে বিচার পূর্বেই নিষ্পত্তি করা হইয়াছে। অথচ হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিত হইয়া সৈন্যবাহিনী মোতায়েন করা হইয়াছে। কিংবা সামরিক কর্তৃপক্ষকে সাহায্য করিবার জন্য সৈন্য তলব করা হইয়াছিল উহাই হইলো তদন্তের বিষয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা হইতে যে সকল প্রকৃত নৃশংসতা অনুষ্ঠানের খবর পাওয়া গিয়েছে যাহার ফলে হাজার হাজার লোক হতাহত তৎ সম্পর্কে এই কমিশনের তৎপ্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই। এমনকি হতাহতের সংখ্যা এবং কোন পরিস্থিতিতে নিরস্ত্র জনগণের উপর গুলি চালানো হইয়াছে তৎসম্পর্কে তদন্ত করা হইবে না।
 
এইরূপ কমিশন কোনো প্রকার কার্যকরী উদ্দেশ্য সাধন করিতে পারে না। বাস্তবিক পক্ষে এইরূপ তদন্ত সত্য নিরূপনের জন্য প্রকৃত তদন্ত নহে বরং জনগণকে বিভ্রান্ত করার একটি ব্যবস্থা মাত্র। সুতরাং আমরা এইরূপ একটি কমিশন গ্রহণ করতে পারি না। বাংলাদেশের জনসাধারণ এরূপ কমিশনের সহিত কোনো ক্ষেত্রেই সহযোগিতা করিবে না।
(আজাদ: ১৯ মার্চ, শুক্রবার-১৯৭১)
 
শক্তিবলে দাবাইয়া রাখা যাইবে না : মুজিব
স্টাফ রিপোর্টার: শেখ মুজিবর রহমান গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, ‘বুলেট কিংবা মেশিন গানের দ্বারা বিশ্বের কোনো শক্তিই ঐক্যবদ্ধ বাংলার মানুষকে দাবাইয়া রাখিতে পারিবে না’। গতকাল দুপুরে নিজ বাসভবনে দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের সহিত আলোচনা কালে শেখ মুজিব উপরোক্ত দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করেন।
 
তিনি বলেন যে, বাংলার মানুষ যখন সংঘবদ্ধ ও দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হইয়াছে তখন নিশ্চয়ই তাহারা লক্ষ্যে পৌছিতে সক্ষম হইবে। গতকাল ভোর হইতে তাহার বাসভবনের সম্মুখে আগত অসংখ্য বিক্ষোভ মিছিলের প্রতি ইঙ্গিত করিয়া বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা কি মনে করেন যে, মেশিনগান জনতার কণ্ঠকে স্তব্ধ করিয়া দিতে পারিবে’। পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এই মাত্র বাংলাদেশে আসিয়া নামিয়াছে বলিয়া কোনো তথ্য জানেন কিনা জনৈক বিদেশী সাংবাদিকের এইরূপ প্রশ্নের জবাবে শেখ মুজিবর রহমান বলেন, বাংলাদেশে যাহা ঘটে আমি তাহা সবই জানি।
(আজাদ : ১৯ মার্চ, শুক্রবার-১৯৭১)
 
 
উস্কানি সহ্য করা হইবে না
আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারী দলের সহকারী নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম গতকল্য এই মর্মে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেন যে, যে কোনো মহল হইতেই উস্কানী দেওয়া হোক না কেন উহা বরদাশত করা হইবে না এবং ইহার পরিনামের জন্য উস্কানীদাতারই সম্পূর্ণ দায়ী হইবে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম রাজশাহী, খুলনা, যশোর ও বাংলাদেশের অন্যান্য শহরে সংগঠিত ঘটনাবলীর উল্লেখ করিয়া এক বিবৃতিতে দু:খ প্রকাশ করিয়া বলেন যে, ‘তাহাদের পুন পুন প্রতিবাদ সত্ত্বেও সেনাবাহিনীর অত্যধিক পরিমানে দায়িত্বহীন কার্যকলাপ অব্যাহত রহিয়াছে’। ঢাকা বিমান বন্দরের সন্নিকটে সংগঠিত এক ঘটনার উল্লেখ করিয়া সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বারবার প্রতিবাদ জানানোর পরেও সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্ট এলাকার আশেপাশে এইধরনের ঘটনা অব্যাহত রাখিয়াছে।
(সংবাদ: ১৯ মার্চ, শুক্রবার ১৯৭১)
 
 
মুজিব ওয়ালী সাক্ষাৎকার
স্টাফ রিপোর্টার: রুদ্ধদ্বার কক্ষে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবর রহমানের সঙ্গে প্রায় এক ঘন্টাকাল বৈঠকের পর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান খান আব্দুল ওয়ালী খান অপেক্ষমান সাংবাদিকদের দেখা মাত্রই স্মিত মুখে বলিয়া ওঠে যে, সেই একই পুরাতন কথা। গতকাল বেলা সাড়ে ১০টায় খান ওয়ালী খান ও পশ্চিম পাকিস্তান ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক জনাব গাউস বখশ বেজেঞ্জো আওয়ামী লীগ প্রধানের ভবনে গমন করেন। তাহাদের বৈঠকের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, জনাব ওয়ালী খান আমার বন্ধু। বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশেই আমাদের আলোচনা হইয়াছে। যতদিন তিনি ঢাকায় আছেন যে কোনো সময় আমরা মিলিত হইতে পারি।
(আজাদ: ১৯ মার্চ, শুক্রবার-১৯৭১)
 
 
ভুট্টোর ঢাকা আগমনে অস্বীকৃতি
করাচী, ১৮ই মার্চ। পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টো আজ বলেন যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের গত ১৬ই মার্চের অনুরোধ অনুযায়ী আগামীকাল সকালে তিনি যদি ঢাকায় গমন করেন তাহাতে বিশেষ কোনো ফলোদয় হইবে যা। দলীয় নেতাদের সহিত দীর্ঘ আলোচনার পর সাংবাদিকদের নিকট তিনি বলেন যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গত ১৬ই মার্চ এক বাণীতে তাহাকে ১৯ শে মার্চ ঢাকায় আগমনের অনুরোধ জানাইয়াছেন। কিন্তু তিনি কতিপয় বিষয়ে ব্যাখ্যা চাহিয়াছিলেন বলিয়া জানান। কয়েকটি প্রশ্নের জবাব পাওয়া গেলেও কতকগুলি বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলিয়া তিনি দাবি করেন। তবে চলতি মাসের ২৫শে মার্চের পূর্বে তাহার উপস্থিতিতে কোনো প্রয়োজনীয় ফল পাওয়া যাইবে বলিয়া প্রতীয়মান হইলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঢাকা যাইতে প্রস্তুতি রহিয়াছেন বলিয়া উল্লেখ করেন। এপিপি।
(আজাদ: ১৯ মার্চ, শুক্রবার-১৯৭১)
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension