প্রধান খবরবাংলাদেশ

ইতিহাসও প্রতিশোধ নেয়: শেখ হাসিনা

ঢাকা প্রতিনিধি:স্বাধীনতার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ‍মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ইতিহাসও প্রতিশোধও নেয়, ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। তা প্রমাণিত হয়েছে। ইউনেস্কো জাতির জনকের এ ভাষণকে ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।’

বুধবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের বিশ্ব স্বীকৃতি উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত আওয়ামী লীগের জনসভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

৭ মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘জাতির পিতা অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। অক্ষরে অক্ষরে বাংলার জনগণ জাতির পিতার নির্দেশ মেনে চলতেন। এই শিশু পার্ক, সেখানে মঞ্চ ছিল। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সেখানে উপস্থিত থাকার। সেখানে দাঁড়িয়ে জাতির পিতা নির্দেশ দিয়েছিলেন ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলার জন্য।’

তিনি বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বাঙালিরা এ ভাষণের পর যার যার ছিল তাই নিয়ে প্রত্যেক ঘরকে দূর্গ করে গড়ে তুলেছিল। ২৬ মার্চ জাতির পিতা ওয়ারলেসের মাধ্যেমে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন এবং শেষ শত্রু বিদায় না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন।’

একাত্তরের যুদ্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একাত্তরের যুদ্ধ  ছিল জনযুদ্ধ। বাংলাদেশে গেরিলা যুদ্ধ হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘একশ্রেণির লোক ছিল হানাদার বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে, গণহত্যা চালিয়েছে। মা-বোনদেরকে তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। বাংলাদেশ হলো শত্রুমুক্ত, বাংলাদেশ হলো স্বাধীন। দক্ষিণ এশিয়ায় একটা ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত।’

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর অবদান উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘একবেলা খেতে পারত না লাখ লাখ, কোটি কোটি মানুষ ছিল। থাকার মতো ঘরে ছিল না, পরনে জীর্ণ পোশাক। এদেশের মানুষ ছিল শোষিত-বঞ্চিত। তাদের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য জাতির পিতা আন্দোলন করে গেছেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু তার জীবন বাঙলার মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে যখন আদালতে নিয়ে যাওয়া হতো, তখন আদালতে ঢুকে প্রথম তিনি বলতেন জয় বাংলাদেশ। ভয়-ডর কিছু নাই, যেন একটা বাঘের বাচ্চা আদালতে এসে বসেছেন।

স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানি শাসকদের কথা শুনতো না। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসা থেকে বঙ্গবন্ধু যে কথা বলতেন সেই কথা শুনতো দেশের মানুষ। ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসেছিলেন, সেখানে এক বাঙালি বাবুর্চি ছিল। ইয়াহিয়া খান ফোন করল বঙ্গবন্ধুর কাছে। আপনি অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছে, কেউ কাজ করছে না। বঙ্গবন্ধু ফোন করে যখন বললেন তোমরা কাজ করতে পার, তারপর ইয়াহিয়া খান গরম খাবার পেয়েছিল।

তিনি বলেন, ৭৫’এ আমার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু আমার বিচার চাওয়ার অধিকার ছিল না। বাঙলার ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। আইন করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার নিষিদ্ধ করেছিল জিয়া। পৃথিবীর কোন দেশে আছে, হত্যার বিচার চাওয়া যাবে না!

শুধু বিচার বন্ধ করেনি। ওই খুনিদের প্রশাসনের বড় বড় পদে তাদের চাকরি দেওয়া হয়েছে। তাদের গাড়িতে তুলে দিয়েছে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আসা পতাকা, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম করে দিচ্ছি, কম্পিউটার ল্যাব করে দিচ্ছি। পোস্ট অফিসগুলোকে ডিজিটাল করে দিচ্ছি। গ্রামে বসে ভর্তি ফরম, চাকরি ফরম, বিদেশ যাওয়ার ফরম পাওয়া যাচ্ছে- সেই ব্যবস্থা আমরা করে দিয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দেশকে এগিয়ে নিচ্ছি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন করা হবে। আমরা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা ডিজিটাল সেন্টার করে দিচ্ছি। ঘরে বসে আমাদের ছেলেরা বিদেশে কাজ করে ডলার আয় করতে পারে। লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্প করে দিয়েছি। আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি।

তিনি বলেন, আমরা মৎসজীবীদের জন্য কাজ করছি। তাদের যখন মাছ ধরা নিষেধ থাকে তখন তাদের চাল দিচ্ছি। দলিত শ্রেণি এমনকি হিজরা- তাদের আমরা ভাতা দিচ্ছি। ভিটা-মাটি বিক্রি করতে হয় না। যারা বিদেশে যায়, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারে। প্রতিবন্ধীদের আমরা ভাতা দিচ্ছি।

এই উন্নয়নের ধারা বজায় থাকলে ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত দেশ গড়ে তুলতে পারব। বাংলাদেশকে আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলব। আজ আমাদের দায়িত্ব তার অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করা।

১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর ২০০১ সালে আবারো ক্ষমতায় না আসার কারণ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেন, গ্যাস আমাদের মূল্যবান সম্পদ। আমেরিকা গ্যাস উত্তোলন করতে চেয়েছিল আর সেই গ্যাস কিনতে চেয়েছিল ভারত। আমি বললাম, এ গ্যাসের মালিক জনগণ। বাংলাদেশে অন্তত ৫০ বছরের গ্যাস মজুদ থাকবে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশের জন্য এতকিছু করার পরও আমরা ২০০১ সালে সরকারে আসতে পারলাম না। তখন দেশের গ্যাস উত্তোলন করার প্রক্রিয়া চলছিল। আমেরিকান কোম্পানি সেই গ্যাস তুলে ভারতের কাছে বিক্রি করবে। কিন্তু আমরা বললাম, গ্যাসের মালিক জনগণ। আমাদের জনগণের জন্য ৫০ বছরের রিজার্ভ নিশ্চিত করতে হবে, তারপর গ্যাস বিক্রির সিদ্ধান্ত হবে। দেশের জনগণের এই স্বার্থ দেখেছিলাম বলে আমাদের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্ত হলো, ষড়যন্ত্র হলো। আওয়ামী লীগ ভোট বেশি পেয়েছিল। কিন্তু আমরা ক্ষমতায় আসতে পারলাম না। দেশের মানুষের স্বার্থ দেখার কারণে আমাদের ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হলো না।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধী-রাজাকারদের মন্ত্রী বানালেন খালেদা জিয়া। খুনিদের চাকরি দেওয়া, তোষামুদি করা চলতে থাকল। খুনি রশিদ, হুদাকে পার্লামেন্টে বসানো হলো। যুদ্ধাপরাধী হয়ে গেল মন্ত্রী, হয়ে গেল উপদেষ্টা। আমাদের মুক্তিযোদ্ধা-স্বাধীনতার জন্য এর থেকে লজ্জার কী হতে পারে?’

বিএনপি ক্ষমতায় এসে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের রাজত্ব কায়েম করা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের দুইজন এমপিকে হত্যা করা হয়েছে। মা বোনকে পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছে। গ্রামে গ্রামে নেতাকর্মীদের হত্যা করেছে। ঘর-বাড়ি দখল করে পুকুর কেটেছে।’

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension