প্রধান খবরযুক্তরাষ্ট্র

ইরানে ইসরাইলি হামলা: যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ, পেছনে সক্রিয়

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বহুবার প্রকাশ্যে বলেছেন—তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আর কোনো ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ জড়াতে চান না। কিন্তু ইরানে ইসরাইলের ব্যাপক হামলা তার সেই অঙ্গীকারকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে। ট্রাম্প এখন এমন এক অবস্থায়, যেখানে তাকে ঠিক করতে হবে যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে কতটুকু জড়াবে, আর তাতেই তার নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তির সঙ্গে দ্বন্দ্বের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।

শনিবার (১৪ জুন) এক প্রতিবেদনে এ খবর দিয়েছে বার্তাসংস্থা এএফপি।

হামলার আগে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইসরাইলকে বলেছিলেন যেন তারা ইরানে হামলা না করে এবং এর পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেন। তার দূত স্টিভ উইটকফ রোববার ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে ষষ্ঠ দফা বৈঠকে বসার কথা ছিল।

কিন্তু হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প যেখানে বলেছিলেন, আক্রমণ হলে তা বিপুল সংঘাত ডেকে আনবে—সেই ট্রাম্প হামলার পর তা প্রশংসা করে বলেন, এটি চমৎকার ছিল।

তিনি দাবি করেন, ইসরাইলের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত এবং প্রাণঘাতী সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে এবং ইরান যদি কোনো চুক্তিতে না আসে, তবে আরও হামলা চলবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, যুক্তরাষ্ট্র হামলায় সরাসরি জড়িত নয়, তবে তিনি ইরানকে হুঁশিয়ারি দেন যেন তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত হাজার হাজার মার্কিন সেনার ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা না করে।

তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, শুক্রবার ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে সহায়তা করছে।

‘প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ, পেছনে সক্রিয়’

ওয়াশিংটনে অবস্থিত মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক আলেক্স ভাটাঙ্কা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হিসেব করে দেখেছে যে তারা ইসরায়েলকে সহায়তা করতে পারে এবং ইরানও তা বুঝবে। তবে প্রকাশ্যে তারা নিরপেক্ষই থাকবে।’

তার মতে, ‘ইরান এখন যেভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করছে, তারা হয়তো একটি কঠিন চুক্তি মেনে নেবে, অথবা সংঘাতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে, যাতে তেলের দাম হু-হু করে বেড়ে যায় এবং ট্রাম্প চাপের মুখে পড়েন।’

‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ঘরানার সংশয়

ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেস সদস্য ইসরাইলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের চোখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘একজন বীর’ এবং ইরান হলো ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ ।

কিন্তু ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ঘরানার সমর্থকেরা এই অবস্থানে খুশি নন।

ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব টাকার কার্লসন, যিনি প্রথম দফা প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ট্রাম্পকে ইরানে হামলা না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, তিনি দাবি করেন, ‘ট্রাম্পের আশপাশে এখন দুই ধরনের মানুষ—যারা সহজে সংঘাত চায়, আর যারা তা ঠেকাতে চায়—একদিকে যুদ্ধবাদী, আরেকদিকে শান্তিবাদী।’

এমনকি ট্রাম্পের প্রশাসনে শান্তিপন্থীদের সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড সম্প্রতি হিরোশিমা সফর শেষে একটি ভিডিওতে বলেন, ‘যুদ্ধবাদীরা বিশ্বকে পরমাণু বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’

গত মাসে সৌদি আরবের রিয়াদে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশকের মার্কিন হস্তক্ষেপ ছিল ভুল। আমার সবচেয়ে বড় আশাবাদ—আমি একজন শান্তির দূত এবং ঐক্যবদ্ধকারী হতে চাই। আমি যুদ্ধ পছন্দ করি না।’

ইসরাইলকে সমর্থন, তবে সীমা কত দূর?

ইসরাইলে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শাপিরো বলেন, ইরানের পাল্টা হামলার মুখে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেবে—এটা অনুমিত ছিল। কিন্তু এখন ট্রাম্পকে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে—যুক্তরাষ্ট্র কি তার বিশেষ সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করে তেহরানের গোপন পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করবে?

শাপিরোর মতে, এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের উপদেষ্টা এবং রাজনৈতিক ঘাঁটি উভয়ের মধ্যেই বিভাজন সৃষ্টি করবে। এমনকি নেতানিয়াহু তাকে যুদ্ধে জড়াতে চাইছেন—এই ধারণাটিও মাথাচাড়া দিতে পারে।

ডেমোক্র্যাট দলীয় আইনপ্রণেতারা নেতানিয়াহুকে অনেক আগেই সমালোচনা করে আসছেন—বিশেষ করে গাজায় তার রক্তক্ষয়ী অভিযানের জন্য।

কংগ্রেসম্যান জোয়াকিন ক্যাস্ট্রো বলেন, নেতানিয়াহুর এই হামলা পুরোপুরি এক প্রকার অন্তর্ঘাত। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ মানে কী, যদি ট্রাম্প নেতানিয়াহুর হাতে আমেরিকাকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধে ঠেলে দেন?

বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা, সুযোগ নিচ্ছে চীন?

প্রগতিশীল থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি’র সিনিয়র ফেলো সিনা তুসি বলেন, ট্রাম্প যাকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সেই চীন এখন এই পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে নিতে পারে—হয়তো তাইওয়ানের ওপর নতুন পদক্ষেপ নিয়েই বসে, কারণ তারা মনে করছে, এখন যুক্তরাষ্ট্র ব্যস্ত এবং বিভ্রান্ত।

‘যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও এখন তাকে ইসরাইলের জন্য অবিরত রসদ, গোয়েন্দা তথ্য এবং কূটনৈতিক সহায়তা দিতে হবে—এ অবস্থায় যখন ইউক্রেন যুদ্ধও চলমান এবং বিশ্বজুড়ে সংকট বাড়ছে।’

তুসি বলেন, ‘যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু একবার শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং সাধারণত যারা যুদ্ধ শুরু করে, তারাই পরিণাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।’

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension