মুক্তিযুদ্ধ

একাত্তরের খলনায়ক ৩: রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ও যুদ্ধাপরাধী একেএম ইউসুফ

আনিসুজ্জামান মুহাম্মদ

 

একেএম ইউসুফ। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ইউসুফ। কিন্তু তিনি একেএম ইউসুফ নামেই অধিক পরিচিত। জামায়াতে ইসলামীর কুখ্যাত আমীর। রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭১ সালে এই একেএম ইউসুফই প্রথম খুলনা শহরে রাজাকার বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন। ছিলেন খুলনা জেলার শান্তি বাহিনীর আহ্ববায়ক। একেএম ইউসুফের নেতৃত্বে পরিচালিত হত সেখানকার প্রধান নয়টি নির্যাতন সেল। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টা জুড়ে সেসব নির্যাতন সেলে রাজাকার বাহিনীর ছিয়ানব্বই জন ক্যাডার মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে গেছে। নির্যাতনের পর সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হত শহরের চারটি প্রধান জায়গাতে। সেখানে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হত।

মাওলানা একেএম ইউসুফের জন্ম খুলনার বাগেরহাটে। ১৯৫২ সালে জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৬২ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ‘৬৯ থেকে ‘৭১ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির ছিলেন। ‘৭১ সালে বৃহত্তর খুলনার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় ৯৬ জন জামায়াত সদস্য ও স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে খুলনার আনসার ও ভিডিপি ক্যাম্পে সর্বপ্রথম সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন।

‘৭১’ সালে খুলনা বাগেরহাটের শরখোলা থানার রাজপুরে ইউসুফ নিজেই উদ্যোগ নিয়ে খুলনার খানজাহান আলী রোডের আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন জামায়াত কর্মী নিয়ে পাকবাহিনীর সহায়তার জন্য একটি প্যারামিলিটারি বাহিনী গড়ে তোলে। ‘রেজাকার’ নামটা ইউসুফের নিজেরই দেওয়া। পরবর্তীতে পাকবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার জেনারেল নিয়াজীর পৃষ্ঠপোষকতায় (রাজাকার অধ্যাদেশ ৭১) সারাদেশে বিস্তার লাভ করে।’

-দৈনিক ইত্তেফাক, ২২.৮.১৯৭১।

মাওলানা একেএম ইউসুফ খুলনায় রাজাকার বাহিনী নিয়ে হত্যা, গণহত্যা, লুন্ঠন, নির্যাতন, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরিত, দেশান্তরিত চালিয়ে গেছেন। সেই সঙ্গে দেশে বিদেশে মুক্তিযুদ্ধর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার ভূমিকাটিও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন।

মাওলানা একেএম ইউসুফ ডা. মালেক মন্ত্রীসভার সদস্য। কুখ্যাত ওই মন্ত্রীসভায় তিনি ছিলেন রাজমন্ত্রী। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর চালানো গণহত্যা আর যুদ্ধাপরাধে সক্রিয় এই সহযোগি যুদ্ধপরাধীদের সংগঠন রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা শুধু নন, ‘রাজাকার’ নামটিও একেএম ইউসুফেরই দেওয়া। তিনি একাধারে রাজাকার, শান্তি কমিটি, আল বদর, আল শামস বাহিনীসহ সকল সংগঠনের স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকান্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একাত্তরের মে মাসে মাওলানা ইউসুফ বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম জামায়াতের ৯৬ জন ক্যাডার নিয়ে খুলনায় রাজাকার বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন। খুলনার তৎকালীন ভূতের বাড়ি (বর্তমানে আনসার ক্যাম্পের হেড কোয়ার্টার) ছিল তার রাজাকার বাহিনীর হেড কোয়ার্টার এবং প্রধান নির্যাতন সেল। দুটি প্রধান নির্যাতন সেল ও রাজাকার বাহিনীর ক্যাম্প ছিল বর্তমান শিপইয়ার্ড ও খালিশপুরে। এছাড়া পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর মহৃল ক্যাম্প সার্কিট হাউস এবং পাকিস্তানি বাহিনীর অপর চারটি ঘাঁটি হেলিপোর্ট, নেভাল বেস, হোটেল শাহিন ও আসিয়ানা হোটেলও হয়ে উঠেছিল এই বাহিনীর নির্যাতন সেল। প্রথম তিনটি নির্যাতন সেল পরিচালিত হত সরাসরি রাজাকার বাহিনীর নেতৃত্বে আর পাকিস্তানি বাহিনীর অবশিষ্ট চারটি ঘাঁটি যৌথভাবে পরিচালিত হত। তবে অধিকাংশ হত্যাকান্ডই সংঘটিত হয়েছে গঙামারি, সার্কিট হাউসের পেছনে ফরেষ্ট ঘাঁটি, আসিয়ানা হোটেলের সামনে ও স্টেশন রোডসহ কিছু নির্দিস্ট স্থানে।

‘ইউসুফ তার এই কুকীর্তির প্রতিদান হিসাবে যুদ্ধের সময় পাতানো নির্বাচনে খুলনা থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেই সাথে দালাল মালেক মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসাবে স্থান করে নেয়।

দৈনিক পাকিস্তান, ২৪ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর ১৯৭১।

মালেক মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়ার পর এক সংবর্ধনায় একেএম ইউসুফ তার বক্তৃতায় বলেন, ‘আমাদের শত্রুরা আমাদের সকল অঞ্চলের মুসলমানদের এক জাতি মনে করেই আঘাত হানে। আর শত্রুদের আমরা যতই বন্ধু মনে করি না কেন, শত্রুরা আমাদের শত্রুই মনে করে।’

১০ অক্টোবর ১৯৭১ সালে খুলনায় এক সভায় রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যদের উদ্দেশ্যে একেএম ইউসুফ নির্দেশ দিয়ে বলেছিল, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চল সফল করে জনগণকে ভারত কর্তৃক সৃষ্ট তথাকথিত বাংলাদেশের অসারতা বুঝতে হবে। বিচ্ছিন্নতাবাদী, দুষ্কৃতিকারী এবং নকশালীরা দেশের এই অংশে বিপর্যয় সৃষ্টিতে তৎপর রয়েছে। আপনাদের তাদের সমূলে উৎখাত করতে হবে।’

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আইনের অধীনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দালালি করার অভিযোগে ’৭২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মালেক মন্ত্রীসভার সদস্য ও রাজনৈতিক নেতাসহ ৩৭ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সকলের সঙ্গে একেএম ইউসুফকেও পাঠানো হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। আদালতের রায়ে অন্য অনেকের সঙ্গে একেএম ইউসুফেরও যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। কিন্তু পরে সরকারের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আওতায় সে বছরের ৫ ডিসেম্বর মুক্তি পেয়ে যায় মাওলানা ইউসুফ।

২০১৩ সালের ১২ মে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে একেএম ইউসুফকে গ্রেপ্তার করে। ১ আগষ্ট তার বিরুদ্ধে সাতটি গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে হত্যার পাঁচটি, ও নিপীড়নের অভিযোগ গঠন করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন জানিয়েছে, সমগ্র বাংলাদেশ বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় এসব অপরাধ সংগঠিত হয়। এসব অপরাধ সংঘটনের সময় একাত্তরের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর। প্রতিবেদনে, একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে ১৫টি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- ৭০০ জনকে গণহত্যা, ৮ জনকে হত্যা, হিন্দু সম্প্রদায়ের ২০০ জনকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা, আনুমানিক ৩০০ বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন, ৪০০ দোকান লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে প্রথম রাজাকার বাহিনীর নামকরণ করেন তিনি। তিনি শান্তি কমিটি, রাজকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীসহ সব সংগঠনের স্বাধীনতাবিরোধী কাজে নেতৃত্ব দেন।

২০০৮ সালে গ্যাটকো দুর্নীতির মামলায় জামায়াতে ইসলামীর আমির রাজাকার মতিউর রহমান নিজামী গ্রেফতার হওয়ার পরদিন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা আবুল কালাম ইউসুফকে দলের ভারপ্রাপ্ত আমির নির্বাচিত করে,স্বল্প সময়ের জন্যে আমিরের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।। কুয়েত থেকে দেশে ফিরে তিনি দায়িত্ব নিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বসেন। তার বাড়ি বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার রাজৈর গ্রামে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় খুলনা জামায়াতের নেতা ছিলেন তিনি। খুলনা জেলা শান্তি কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে ওই সময় তার নাম ছাপা হয় পাকিস্তান অবজারভারসহ বিভিন্ন পত্রিকায়।

গবেষক এ এস এম সামছুল আরেফিনের ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান’ গ্রন্থে  একেএম ইউসুফকে রাজাকার বাহিনীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (পৃ-৪২২)। ১৯৭১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আব্বাস আলী খান ও মাওলানা ইউসুফসহ মালেক মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যকে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকেরা সংবর্ধনা দেন। ওই অনুষ্ঠানে মাওলানা ইউসুফ বলেছিলেন, ‘যুব সমাজকে পাকিস্তান সৃষ্টির মূল লক্ষ্য সম্পর্কে অবহিত করা হয় নি বলেই তারা আজ নিজেদের পাকিস্তানী ও মুসলমান পরিচয় দিতে লজ্জা বোধ করে।’

দৈনিক সংগ্রাম, ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭১।

১৯৭১ সালের ১১ অক্টোবর খুলনার জনসভায়, ২৬ অক্টোবর সিলেটের জনসভায়, ১২ নভেম্বর সাতক্ষীরার রাজাকার শিবির পরিদর্শনকালে এবং ২৮ নভেম্বর করাচিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালেসহ বিভিন্ন সময় তার বক্তৃতা-বিবৃতিতে স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এসব বক্তৃতা-বিবৃতি পরেরদিন দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইউসুফ এক রাজাকার সমাবেশে ভাষণ দিতে গিয়ে ১১ অক্টোবর খুলনায় বলেছিলেন, ‘দুষ্কৃতকারী ও ভারতীয় সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারীদের দমন এবং দেশের সার্বভৌমত্বের উপর হামলার যে কোন অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য আমাদের সাহসী জনগণ সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের পেছনে থাকবে।’

দৈনিক পাকিস্তান, ১৩ অক্টোবর, ১৯৭১।

একাত্তর সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের সংগ্রাম-এর প্রথম পাতায় তেজগাঁও থানা শান্তি কমিটি মালেক মন্ত্রিসভার সদস্যদের সংবর্ধনা দিয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে এ কে এম ইউসুফ তাঁর বক্তব্যে বলেন, পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ইসলামের দুশমনরা এর অস্তিত্ব ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছে এবং বিভিন্ন পন্থায় তারা এই ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে। মার্চ মাসের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপকেও ইউসুফ এই ষড়যন্ত্রের পরিণাম বলে উল্লেখ করেন।

একাত্তর সালের ১৮ অক্টোবর সংগ্রাম-এ প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, মালেক মন্ত্রিসভার সদস্য (রাজস্ব মন্ত্রী ইউসুফ) হিসেবে তিনি বলেন, ‘দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলার যেকোনো অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের পেছনে আমাদের সাহসী জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকবে।’

২৮ নভেম্বর করাচিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে মাওলানা ইউসুফ বলেছিলেন, ‘রাজাকাররা আমাদের বীর সেনাবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভারতীয় হামলার মোকাবিলা করছে।’ তিনি রাজাকারদের হাতে আরও আধুনিক অস্ত্র দেওয়ার দাবি জানান। পরদিন ২৯ নভেম্বর দৈনিক সংগ্রামে এ সংবাদ প্রকাশিত হয়।

যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে সবচেয়ে ধুরন্ধর হলেন মাওলানা আবুল কালাম ইউসুফ। দালাল মন্ত্রীসভার এই সদস্যের আরব দেশগুলোর অসংখ্য যোগাযোগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে থাকতেন। ২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কুখ্যাত এই রাজাকার ও রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা যুদ্ধাপরাধী মাওলানা একেএম ইউসুফ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলাকালীন মস্তিস্কে রক্তক্ষরণে কারাগারে মারা যান। তার মৃত্যুর মাসখানেক পর দৈনিক সংগ্রাম ‘ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব মাওলানা এ কে এম ইউসুফ (রহঃ)’ শিরোনামে এক হৃদয়বিদারক কলাম ছাপে।

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension