কুমুদিনী হাজং: কিংবদন্তি এক নেত্রীর বিদায়
ব্রিটিশ শাসনামলের ঐতিহাসিক টংক আন্দোলন ও হাজং বিদ্রোহের ছিল অনন্য ভূমিকা। রুখে দাঁড়িয়েছিলেন ব্রিটিশ শাসক ও জমিদারদের যুগপৎ শোষণের বিরুদ্ধে। হয়ে উঠেছিলেন বাংলার বঞ্চিত-শোষিত কৃষক সমাজের প্রতিবাদ আর সংগ্রামের অন্যতম প্রতীক। নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের পাদদেশে বেড়ে ওঠা সেই কিংবদন্তি নেত্রী কুমুদিনী হাজং আর নেই।
তাঁর বয়স হয়েছিল ১০০ বছরের কাছাকাছি।
আজ শনিবার দুপুরে নিজ বাড়ি নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেড়াতলীতে কুমুদিনী হাজং শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বার্ধক্যজনিত কারণে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি অসুস্থ ছিলেন।
ব্রিটিশ আমলে বৃহত্তর ময়মনসিংহের সুসং জমিদারি এলাকায় টংক প্রথার প্রচলন ছিল।
এ প্রথায় জমিতে ফসল হোক বা না হোক টংকের ধান জমিদারদের দিতেই হতো। না পারলে কৃষকদের ওপর নেমে আসত জমিদারদের নির্যাতন। ১৯৩৭ সালে কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বে কৃষকরা এই প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। এটিই টংক আন্দোলন নামে পরিচিত।
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমুদিনী হাজংয়ের স্বামী লংকেশ্বর হাজং ছিলেন টংক আন্দোলনের অন্যতম নেতা। তিনি হাজং কৃষক ও কিষানিদের নিয়ে সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলন বেগবান করেন। ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি সকালে ব্রিটিশ সরকারের ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস বাহিনীর (ইএফআর) সদস্যরা লংকেশ্বর হাজংয়ের বাড়িতে হানা দেয়। কুমুদিনী হাজং তখন ১৭-১৮ বছরের নববধূ। লংকেশ্বর কোথায় আছেন জানতে চায় ইএফআর সেনারা।
স্বামীর অবস্থান জানাতে না চাইলে তারা কুমুদিনীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে এবং ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়।
এ খবর ছড়িয়ে পড়লে টংক আন্দোলনের সাহসী নেত্রী রাশিমণি হাজংয়ের নেতৃত্বে শতাধিক হাজং নারী-পুরুষ লাঠি ও দা-বঁটি নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং এক সেনা সদস্যকে কুপিয়ে মেরে ফেলেন। তখন সেনাদের গুলিতে রাশিমণি, সুরেন্দ্র হাজংসহ বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান। পরে কুমুদিনীকে ছেড়ে পালিয়ে যায় সেনারা। সেখান থেকেই আরো জোরদার হয় টংক আন্দোলন। হাজং কৃষকদের বিদ্রোহ ও প্রাণদান বৃথা যায়নি। অব্যাহত আন্দোলনের মুখে ১৯৫০ সালে বিলুপ্ত হয় নিন্দিত টংক প্রথা।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে কুমুদিনীর স্বামী লংকেশ্বর হাজং মারা যান। তাঁদের পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে লমিন হাজং আগেই মারা গেছেন। মেজো ছেলে অর্জুন হাজংয়ের কাছেই নিজ গ্রামে থাকতেন কুমুদিনী। ছোট ছেলে সহদেব হাজং মুক্তিযুদ্ধের পর ভারতে চলে যান। বড় মেয়ে মেনজুলি হাজং মানিকগঞ্জে ও ছোট মেয়ে অঞ্জলি হাজং থাকেন ঢাকায়।
সমাজসেবায় অবদানের জন্য ২০১৯ সালে কুমুদিনী হাজংকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ দেয় বাংলা একাডেমি। এ ছাড়া তাঁকে অনন্যা শীর্ষদশ (২০০৩), আহমদ শরীফ স্মারক (২০০৫), কমরেড মণি সিংহ স্মৃতি পদক (২০০৭), সিধু-কানহু-ফুলমণি পদক (২০১০), জলসিঁড়ি (২০১৪), হাজং জাতীয় পুরস্কার (২০১৮), নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক সম্মাননা (২০২১), পথ পাঠাগার সম্মাননা (২০২২) প্রদান করা হয়।
বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমির পরিচালক সুজন হাজং বলেন, ‘কুমুদিনী হাজংয়ের অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন ছিল। তাঁকে জীবদশায় একুশে পদক বা স্বাধীনতা পদক দেওয়া যেত। তবে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার না পেলেও তিনি অগণিত মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পেয়েছেন। তাঁর ত্যাগ ও সংগ্রামী চেতনার কাছে আমরা হাজং সম্প্রদায় মাথা নত করি।’
[তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন দুর্গাপুর (নেত্রকোনা ) প্রতিনিধি]



