সাহিত্য

গঠিত হই শূন্যে মিলাই

সুবর্ণা মুস্তাফা

সুবর্ণা মুস্তাফা

যখন আমার বয়স ১৪ বছর বয়স, তখন ঢাকা থিয়েটারে যোগ দেই। সেই সময় সেলিম আল দীনের সঙ্গে সঙ্গে তার লেখার সঙ্গেও পরিচয় হয়। স্বাধীনতার পর প্রথম জাতীয় নাট্যোৎসবে অংশ নিচ্ছে ঢাকা থিয়েটার। সেখানে মঞ্চায়ন হবে সেলিম আল দীনের লেখা ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’। নাটকটির নাম শুনে প্রথমে কিছুই বুঝিনি। কিসের জন্ডিস? কিসের বিবিধ বেলুন? কী একটা কথোপকথনের পর ছেলেটি চিঠি চায়, আমি ব্যাগ থেকে একটা নীল রঙের বেলুন বের করে দিয়ে বলি, এখন থেকে এটাই দেব। বলা বাহুল্য, আমার অভিনীত প্রথম মঞ্চ নাটক ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’। এরপর অভিনয় করলাম সেলিম আল দীনের মিউজিক্যাল কমেডি ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’তে। তারপর ‘শকুন্তলা’ নাটকে মেনকাও করলাম, শকুন্তলাও করলাম। আমার জন্য মাইলস্টোন কাজ বলতে হয় ‘শকুন্তলা’। ভাষার দিক থেকে দেখলে ‘শকুন্তলা’ নাটকে আমরা স্বাভাবিকভাবে কথা বলি তেমন নয়, নাটকটির ভাষা ছিল কবিতার মতো। যথেষ্ট কঠিন। সেলিম আল দীনের দর্শন বা তার নাট্যচিন্তা ছিল অন্য দশজন থেকে একেবারেই আলাদা। তিনি যা করতে চেয়েছেন বা আমাদের মধ্যে যে বিষয়টি তিনি ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন, তা হলো, নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হলে শিকড়ে ফিরে যেতে হবে। নিজের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে জানতে হবে, যা সেলিম আল দীন তার লেখা ও কাজের মধ্য দিয়ে অদ্ভুতভাবে তুলে ধরেছেন এবং আমাদের মধ্যে বিষয়টি ঢুকিয়ে দিয়েছেন। সেলিম আল দীন তার লেখার ভেতরে আমাদের দেশের ঐতিহ্যগুলো বারবার তুলে ধরেছেন। যে ঐতিহ্যগুলোর জন্য আমরা ঋদ্ধ, সেগুলোকে যেন ভুলে না যাই। এটা সেলিম আল দীনের নিজস্ব ভাব।

মনে আছে যখন ‘শকুন্তলা’ নাটকের কাজ করছি, তখন সেলিম ভাই যে কতবার শকুন্তলার পাণ্ডুলিপি পরিবর্তন করেছেন। যখনই বলা হয়েছে, এই জায়গাটা একটু কঠিন লাগছে বা সেলিম ভাই এখানটা কিন্তু ভালো হয়নি- শুনে বাচ্চু ভাই ধমক দিতেন মাঝে মধ্যে, আরে বলিস কি তোরা? 

আসলে সেই সময়ে কিন্তু আমরা সবাই বড় হওয়ার একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলাম। তখন আমার বয়স যদি ১৪ বা ১৫ হয়, সেই সময়ে সেলিম ভাইয়ের বয়স ২৫ বা ২৬ বছর। ফলে আমরা কিন্তু একসঙ্গে বড় হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলাম। এতে আরও ছিল শিমূল ইউসুফ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, হুমায়ূন ফরীদি, রাইসুল ইসলাম আসাদ, আফজাল হোসেন প্রমুখ।

যাই হোক, বিটিভির জন্য ‘গ্রন্থিকগণ কহে’ নামের একটি ধারাবাহিক নাটক লিখেছেন সেলিম আল দীন। তখন নাটকটির একটি পর্ব নিয়ে আমি আর শিমূল [শিমূল ইউসুফ] বলেছি, সেলিম ভাই এটা ভালো হয়নি। তখন বাচ্চু ভাই বকা দিয়ে বলেন, ‘তোমাদের বেশি সাহস হয়েছে দেখছি। অনেক বেশি নাটক বুঝে গেছ দুজন।’ 

তখন সেলিম ভাই বাচ্চু ভাইকে বলেছিলেন, ‘বাচ্চু তুমি ওদের কিচ্ছু বলবে না। কারণ ওরা আমার শিল্পসঙ্গী। ওরা যেটা বলছে, ওটা আমাকে গ্রাহ্য করতেই হবে।’ 

সেলিম ভাইয়ের চর্যাপদ থেকে শুরু করে এমন কিছু ছিল না যে তার পড়া ছিল না। রবীন্দ্রনাথ তার পুরো মুখস্থ ছিল। তিনি কোনো কিছু না জেনে কখনও লেখেননি। 

‘চরকাঁকড়ার ডকুমেন্টরি’ নামে একটা পথনাটক করেছিলাম। চরকাঁকড়া বলে একটা চরে প্রবল জলোচ্ছ্বাসের পর বেঁচে যাওয়া এক লোককে নিয়ে লেখা নাটকটি। জলোচ্ছ্বাসের পর সে খবরের কাগজের মধ্য দিয়ে ঢাকায় আসে। নাটকটি সেট করেছিল আফজাল। দুটো ফ্যাপের মধ্যে জলোচ্ছ্বাসের মোটিভ আর খবরের কাজগের নিউজ ক্লিপ দিয়ে বানানো। সেই খবরের কাগজগুলো ছিঁড়ে লোকটির এন্টি হয়। ‘চরকাঁকড়ার ডকুমেন্টারি’র একটা গানের মধ্য দিয়ে সেলিম আল দীন শুঁটকি মাছ কীভাবে করতে হয় তাও বুঝিয়ে দিলেন। 

তিনি লিখেছেন, 

আগুন [অগ্রহায়ণ] মাসে কচকচা মাছ করিছে ফালি ফালি রে

খোয়ার [কুয়াশা] কামুর থাকি বাঁচাইয়া

হোলদে বরণ রোদে শুকাইয়া 

তোল তোল তোল ঘরে তোলরে…

সেলিম আল দীনের লেখা ছিল ম্যাজিক্যাল। ভাবা যায় তিনি তার ২৫ বা ২৬ বছর বয়সে শকুন্তলা লিখেছেন। আমার সবচেয়ে ভালো লাগার নাটক শকুন্তলা, যা আগেও বলেছি। শকুন্তলার গল্পকে যে এভাবেও ভাঙা যায়, তা বুঝিয়ে দিলেন সেলিম আল দীন। পৌরাণিক মহাভারতের শকুন্তলাকে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করলেন তিনি। 

সৌন্দর্যবিলাসী কবি কালিদাস আর গ্যেটে শকুন্তলার মধ্যে কেবল সৌন্দর্য আর মিলনই দেখেছেন, বিরোধকে নয়। কিন্তু সেলিম আল দীন দেখেছেন যার জন্ম বিশ্বামিত্রের তপস্যাভঙ্গে এবং স্বর্গ ও মর্ত্যের বিরোধে, তার জীবন দ্বন্দ্বহীন গল্প হয় কী করে? তিনি লিখেছেন, 

সৌন্দর্যপিয়াসী কবি কালিদাস গ্যেটে 

শকুন্তলার জীবনে প্রত্যক্ষ করেছিলেন মিলন

কিন্তু স্বর্গ ও মর্ত্যের অসীম বিরোধের ফলে 

যার জন্ম তার জীবন নির্বিরোধ হয় কী করে

আমরা তাই শকুন্তলার জীবনে প্রত্যক্ষ করি বিরোধ…

অপ্সরা কন্যা শকুন্তলার বয়ঃসন্ধিক্ষণে দেখা দেয় এক দুরারোগ্য ব্যাধি। তার গায়ে দেখা যায় নীল রঙের ঘামাচি। মাথাব্যথার সময় তার গা থেকে বের হয় স্বর্ণচাঁপার গন্ধ। এই ব্যাধি সূত্রেই শকুন্তলা নিজের জন্ম পরিচয় জানার পর তার মাঝে মূর্ত হয়ে ওঠে সেই বিরোধ। এক নতুন চেতনা তাকে আচ্ছন্ন করে। সে মানুষকে ঘৃণা করতে থাকে। মানবের মায়া-মমতা অস্বীকার করে শকুন্তলা কল্পনার জাল বুনে, তার মা সোনালি রথে চড়ে তাকে উদ্ধার করবে এই নোংরা মর্ত্য থেকে। কিন্তু স্বর্গ থেকে কেউ আসে না তাকে উদ্ধার করতে। তাই স্বর্গমুখী মানবী শকুন্তলার আর্তি শুধুই আর্তনাদ- ‘কেবলি কানামাছি, কেবলি অন্ধকার…’

আমরা যারা সেলিম আল দীনের সঙ্গে কাজ করেছি, তারা প্রত্যেকেই শিখেছি। মানুষের চিন্তা যে, কতভাবে হতে পারে, তা তিনি দেখিয়েছেন অনেক ছোট ছোট বিষয়ের মধ্য দিয়ে। ‘যৈবতী কন্যার মন’ নাটকের একটা জায়গায় পরী পানির দিকে তাকিয়ে নিজের ছায়া দেখে বলে, ‘আমাকে ছুঁলে ওকে ছোঁয়া হয়, কিন্তু ওকে ছুঁলে তো আমাকে ছোঁয়া হয় না।’ আমিও চিন্তা করেছি। তাই তো আমাকে ছোঁয়া হলে ওকে ছোঁয়া হয়। কিন্তু ওকে ছুঁলে আমাকে ছোঁয়া হয় না। 

সেলিম আল দীন অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে বলতেন ‘গঠিত হই শূন্যে মিলাই’। মানে হলো, যখন নাটকের চরিত্রের জন্য অভিনয়শিল্পীরা গঠিত হন আর যখন নাটকটি শেষ হয়, তখন শূন্যে মিলিয়ে যায়। মানুষের জীবন বোধ নিয়ে তিনি বলেছেন, মানুষ যে যাই বলুক না কেন, সে তার নিজের মতো করে জীবনযাপন করে।

মোহ সম্পর্কে সেলিম আল দীন বলেছেন, ‘মোহ হইল নিজেরে নিজের পূজা।’ আর সব জিনিয়াসের মতোই নিজের জীবনে ডিসিপ্লিন ছিলেন না। যদি ডিসিপ্লিন থাকতেন, তাহলে এত অল্প বয়সে চলে যেতেন না। আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল তার। আমার সৌভাগ্য, তার সঙ্গে কাজ করেছি। তার স্ত্রী মেহেরুন্নেছা পারুলের সঙ্গেও আমার বেশ সম্পর্ক ছিল। অসাধারণ মানুষ ছিলেন তিনিও। পারুল ভাবি ছাড়া সেলিম আল দীনের কথা আলাদাভাবে বলা যাবে না। সেলিম আল দীন সেলিম আল দীন হয়েছেন পারুল ভাবির জন্য। একটা ঘটনা বললে তা আরও পরিস্কার হয়ে যাবে। প্রায়ই দেখা যেত, লিখতে লিখতে সেলিম আল দীন কাগজ শেষ করে ফেলেছেন। তখন তিনি সিগারেটের প্যাকেটে লিখতেন। সেলিম ভাই যদি একটা কাগজে দুটো লাইনও লিখতেন, তা পারুল ভাবি অনেক যত্ন করে তুলে রাখতেন। কথায় আছে না, সমস্ত সফল পুরুষের পেছনে একজন নারী থাকেন। সেলিম আল দীনের ক্ষেত্রে এ কথাটি দুইশ’ ভাগ সত্য। পারুল ভাবির মতো মানুষ না হলে সেলিম আল দীন আর সেলিম আল দীন হতে পারতেন না। কারণ পারুল ভাবি তার জীবনের সব মেধা, ধৈর্য, প্রেম-ভালোবাসা দিয়েছিলেন সেলিম ভাইকে। 

পরিশেষে আমি বলব, সেলিম আল দীনের লেখা মনোযোগ দিয়ে যদি কেউ পড়েন, তাহলে জীবনের চিন্তার জায়গায় পরিবর্তন ঘটবে। জীবনের দর্শন তৈরি হবে। আমি বলব, সেলিম আল দীনের লেখা আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষায় পাঠ্য করা উচিত। 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension