বাংলাদেশমুক্তমত

গোলাম সারোয়ারঃ একজন বাতিঘর

মুবিন খান 

‘কখনও কখনও একজন ব্যক্তিও প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেন।’ আলোচনা প্রসঙ্গে কথাটি কদিন আগে প্রয়াত প্রবীণ সাংবাদিক ও দৈনিক সমকাল সম্পাদক গোলাম সারোয়ার প্রসঙ্গে বলছিলেন এক বন্ধু।

এইত গেল এপ্রিলে গোলাম সারোয়ারের পঁচাত্তরতম জন্ম বার্ষিকী উদযাপিত হল। সে উদযাপনে গোলাম সারোয়ার সম্পর্কে বাহাত্তরটি লেখা নিয়ে একটি সম্মাননাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। গ্রন্থটি ‘সুবর্ণরেখায় বাতিঘর’। এই বাতিঘরটি আজ নেই। নিভে গেছে। তবে নিভে যাবার আগে পর্যন্ত আলোকিত করে গেছে বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতকে।

গোলাম সারোয়ার আমার তেমন চেনাজানাদের কেউ নন। যদিও বার কয়েক দেখা হয়েছিল। সে দেখাকে চেনাজানা বলবার অবকাশ বা সুযোগ কোনটাই নেই। তবু সংবাদপত্রর মানুষ বলেই তিনি ‘সারোয়ার ভাই’ ছিলেন। নিতান্ত প্রায় অপরিচিত মানুষ হয়েও খুব পরিচিত। হয়ত সেকারণেই তাঁর মৃত্যু সংবাদ আমার ভেতরেও একটা তাৎক্ষণিক শূন্যতা এনেছিল।

গোলাম সারোয়ার যখন ছাত্র তখনই দৈনিক আজাদীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন। সেটা ১৯৬২ সাল। তার পরের বছর দৈনিক সংবাদের সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা হলেন মুক্তিযোদ্ধারা। আমি যখনই জানতে পারি এই মানুষটা বা ওই মানুষটা মুক্তিযোদ্ধা, তাঁর দিকে আমি বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকি। আমি ভাবতে থাকি, এই মানুষটা একদিন নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে দেশকে, দেশের মানুষকে বর্বর পাকিস্তানিদের কবল থেকে মুক্ত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যুদ্ধে।এই যে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি, খুব সহজেই তিনি তিরিশ লক্ষ শহীদদের তালিকাভূক্ত হতে পারতেন। সেটা তিনি নিজেও জানতেন।কিন্তু তিনি সেটা হন নি। তিনি  তাঁর শৌর্যবীর্যে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় মিছিলের অংশ হয়েছিলেন। রক্ত দিয়ে, সাহস দিয়ে, বীরত্ব দিয়ে বিজয় অর্জন করেছিলেন। আমাকে ‘আমার দেশ’ সংলাপটি উচ্চারণের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। আমার তখন মুক্তিযোদ্ধা ওই মানুষটির যুদ্ধর অভিজ্ঞতার গল্পটি শুনতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে।

গোলাম সারোয়ারও তেমনই একজন মানুষ। একজন মুক্তিযোদ্ধা। সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত দৈনিক সংবাদে কাজ করেন। ২৫ মার্চ কালরাতের পর যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধ করেন নিজ এলাকা বানারীপাড়ায়। ব্যাস। এটুকুই। কিন্তু সারোয়ার ভাইয়ের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার গল্পটি আর শোনা হল না। তিনি তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে জীবনের ওপারে পাড়ি জমালেন।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালে গোলাম সারোয়ার যোগ দিলেন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায়। দায়িত্ব পেলেন সিনিয়র সহ-সম্পাদক, শিফট ইনচার্জের। পরে প্রধান সহ-সম্পাদক, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদকও হয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ সাতাশ বছর কাজ করেছেন দৈনিক ইত্তেফাকে। এরপর ১৯৯৯ সালে ইত্তেফাক ছেড়ে যুগান্তরের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকের দায়িত্ব নিলেন। তারও পরে ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন দৈনিক সমকাল। আমৃত্যু দৈনিক সমকাল পত্রিকারটির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে গেছেন গোলাম সারোয়ার। দৈনিক যুগান্তর আর দৈনিক সমকালের আত্মপ্রকাশটা এখনও মনে পড়ে। দুটি পত্রিকাই বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে একটা নতুন মাত্রা নিয়ে এসেছিল।

সাংবাদিকতায় অর্ধ শতক  ধরে সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে করতে গোলাম সারওয়ার সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও চর্চা করে গেছেন। লিখেছেন শিশুতোষ ছড়ার বই ‘রঙিন বেলুন।’ বইটি শিশু একাডেমি প্রকাশ করেছিল। তাঁর ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার লেখা সংকলিত করে প্রকাশিত হয়েছে ‘সম্পাদকের জবানবন্দি’, ‘অমিয় গরল’, ‘আমার যত কথা’, ‘স্বপ্ন বেঁচে থাক’ প্রভৃতি।

তিনি সংস্কৃতিবিষয়ক সাপ্তাহিক পূর্বাণীর নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। এই সময়ে বাংলাদেশে ম্যাগাজিনের ঈদ সংখ্যার যে সংস্কৃতি, এই সংস্কৃতিটিও গোলাম সারোয়ারের হাত ধরে সাপ্তাহিক পূর্বাণী দিয়ে শুরু হয়।  চলচ্চিত্র সাংবাদিকদের সংগঠন ‘বাচসাস’-এর সাধারণ সম্পাদকও নির্বাচিত হন।

সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার অর্ধ শতকে গোলাম সারোয়ার পেশাদারিত্বে মেধা, যুক্তিবোধ, দায়িত্বশীলতা, মুক্ত অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার নিরবচ্ছিন্ন চর্চা করে গেছেন। মুক্তিযু্দ্ধের পক্ষে আপসহীন ও অকুতোভয় একজন মানুষ গোলাম সারোয়ার। এই মানুষটিকে রাষ্ট্র তাঁর কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০১৪ সালে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সন্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করেছে গোলাম সারোয়ারকে। বলেছে, বাংলাদেশের সংবাদপত্রর বিকাশ ও ক্রম পরিণতির ইতিহাসে তাঁর নাম অতি গুরুত্বর সঙ্গে বারবার উচ্চারিত হবে। এছাড়াও পেয়েছেন ‘কালচারাল জার্নালিস্টস ফোরাম অব বাংলাদেশ (সিজেএফবি) আজীবন সম্মাননা, ২০১৬। এবং ‘আতাউস সামাদ স্মারক ট্রাস্ট আজীবন সম্মাননা, ২০১৭।’

কিন্তু এই উচ্চারণই শেষ কথা নয়। গোলাম সারোয়ার তাঁর অভিজ্ঞতা, মেধা, দায়িত্বশীলতা আর অসাম্প্রদায়িকতা দিয়ে যেমন অনুসরণীয় হয়ে আছেন।  তাঁর দীক্ষায় কয়েক শ’ সংবাদকর্মী বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে পদচারণা করে চলেছেন।

কিন্তু হঠাৎ করে এভাবে গোলাম সারোয়ারের চলে যাওয়াটা মেনে নেওয়া কষ্টকর। তাঁর এই চলে যাওয়ায় যে ক্ষতি হল, এ ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। তবু, বাতিঘর হয়ে যে আলো তিনি ছড়িয়ে গেছেন, তার আভা আমাদের চারপাশ উজ্জ্বল করে রেখেছে। সেই আভা থেকেই জ্বলে উঠবে আরও আরও আলো। আমরা আশায় বুক বাঁধি।
সারোয়ার ভাই, আপনাকে শ্রদ্ধা।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension