
জাতিসংঘ কনফারেন্সে যোগদানের নামে ১২ লাখে যুক্তরাষ্ট্রে পাচার

জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ভুয়া তথ্য দিয়ে বিভিন্ন কনফারেন্সে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণপত্র চাইতো ‘কথক একাডেমি’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে আমন্ত্রণপত্র পাওয়ার পর ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার আবেদন করা হতো।
দূতাবাস যাদের ভিসা দিত তারা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে গাঁ ঢাকা দিত। পরে অবৈধ হয়ে মার্কিন সরকারের কাছে আশ্রয় চাইতো। তার আগেই ‘কথক একাডেমি’ নামের প্রতিষ্ঠানটি ওই ব্যক্তিদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিতো জনপ্রতি ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা।
এভাবে দীর্ঘদিন জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সঙ্গে জালিয়াতি করে আসছিল একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র।
চক্রটি জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধ পন্থায় মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকা। অথচ বাস্তবে নামসর্বস্ব ‘কথক একাডেমি’র কোনো রেজিস্ট্রেশনও নেই। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি জাতিসংঘের ইকোনোমিক ও সোশ্যাল কাউন্সিলের স্পেশাল কনসালটেটিভ স্ট্যাটাস দাবি করে।
ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস এ ধরনের জালিয়াতির বিষয়টি বুঝতে পেরে গত মার্চ মাসে গুলশান থানায় একটি মামলা করে। ওই মামলায় তদন্ত করতে গিয়ে এই প্রতারক চক্রের মূলহোতাসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।
গ্রেফতাররা হলেন- আবুল কাশেম শেখ (৫৫), বখতিয়ার হোসেন (৩৫) ও মো. নজরুল ইসলাম (৪৫)। এদের মধ্যে আবুল কাশেম ভারত থেকে আন্তর্জাতিক কমিউনিকেশনের ওপরে ডিপ্লোমা করেছে। আর বখতিয়ার এস.এস.সি. ও নজরুল ইসলাম বি.এস.এস. পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে।
গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে পাঁচটি মোবাইল ফোন, একটি ল্যাপটপ, একটি পিসি, প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা কথক একাডেমির তিনটি সিল, ১৩টি ইমেইল অ্যাকাউন্ট, একটি ওয়েবসাইট, একটি ভিজিটিং কার্ড ও কথক একাডেমির সিইওর আইডি কার্ড জব্দ করেছে পুলিশ।
এছাড়া আবুল কাশেম শেখের বাসায় অভিযান পরিচালনা করে ৩১টি পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার পাসপোর্টগুলো যুক্তরাষ্ট্র, জার্মান, জাপান, ইতালি, দুবাই ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে মানবপাচার ও প্রতারণায় ব্যবহার করা হয়। পাসপোর্ট উদ্ধার করে ভাটারা থানায় পাসপোর্ট আইনে একটি মামলা করা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চক্রের মূলহোতা আবুল কাশেম কথক একাডেমির সিইও পরিচয়ে প্রতারণা ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। তার কথক প্রতিষ্ঠানের কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই। ২০০৮ সাল থেকেই কাশেম বিভিন্ন রকম প্রতারণার কাজে জড়িত। ২০১২ সাল থেকে ১০-১২ লাখ টাকার বিনিময়ে ভুয়া তথ্য দিয়ে ভিসা পাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মান, জাপান, ইতালি, দুবাই, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন উন্নত দেশগুলোতে প্রায় ৮০ জনকে পাচার করেছে।

ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ জানায়, এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেই পাঠিয়েছে ২০ জনকে আর বাকি ৬০ জনকে অন্যান্য দেশে পাঠিয়েছে। প্রতারণা করে কাশেম এখন পর্যন্ত ৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এসব টাকা দিয়ে বিলাসী জীবন যাপন করতো। তার সহযোগী বখতিয়ার হোসেন বেকার ছিল। আর নজরুল একটি বেসরকারি হাসপাতালের সহকারী মার্কেটিং ম্যানেজার হিসাবে কাজ করত।
আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে শাহবাগ থানা, ২০১৩ সালে পল্লবী থানায় মামলা হয়। গুলশান থানার মামলায় গ্রেফতারের পাশাপাশি পাসপোর্ট আইনেও তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়েছে। আর বখতিয়ার ও নজরুলের নামে এর আগে কোনো মামলা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের মামলায় একইরকম প্রতারণার দায়ে এর আগে গোলাম কিবরিয়া (৪৩), সাজ্জাদ মো. রিফাত (২৮), শাহনেওয়াজ খান রাফাত (২৫) ও শাহীন আকন (২৭) গ্রেফতার হয়েছিল।
ডিবি সাইবারের কর্মকর্তারা বলেন, আবুল কাশেম শেখ আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও প্রতারক চক্রের মূলহোতা। তিনি কথক একাডেমি নামক নাম সর্বস্ব একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মানবপাচার করতেন। তার পরিচালিত কথক একাডেমি জাতিসংঘের ইকোনোমিক ও সোশ্যাল কাউন্সিলের স্পেশাল কনসালটেটিভ স্ট্যাটাস দাবি করেন।
তিনি ইকোনোমিক ও সোশ্যাল কাউন্সিলের বিভিন্ন কনফারেন্সসহ জাতিসংঘের অন্যান্য কনফারেন্সের বিজ্ঞপ্তির খোঁজ-খবর নিয়মিত রাখতেন। কনফারেন্সের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কথক একাডেমির বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিচয়ে কনফারেন্সে যোগদানের জন্য সদর দপ্তরে ইমেইল পাঠাতো। ভারত থেকে আন্তর্জাতিক কমিউনিকেশন বিষয়ে পড়াশোনা করার কারণে তিনি ইংরেজিতে কথাবলা ও লেখায় পারদর্শী ছিলেন।
কথক একাডেমির নামে ভুয়া তথ্য-উপাত্ত যুক্ত করে কনফারেন্সে যোগদানের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে আমন্ত্রণপত্র চাইতো। যাদের নামে আমন্ত্রণপত্র আসতো তাদের পাসপোর্ট ও বিভিন্ন ভুয়া কাগজপত্রসহ ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে জমা দিয়ে ভিসা আবেদন করতো।
ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (উত্তর) অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুনায়েদ আলম সরকার বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যোগদানের কথা বলে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ভুয়া তথ্য দিয়ে ইমেইল পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা সংগ্রহকারীদের বিরুদ্ধে দূতাবাস কর্তৃপক্ষ মার্চ মাসে একটি মামলা করে। ওই মামলায় আগেই চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে মামলার তদন্ত করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের মূলহোতা কাশেম ও তার সহযোগী বখতিয়ার ও নজরুলকে গ্রেফতার করা হয়।
তিনি বলেন, প্রতারকদের এ ধরনের কাজে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতি হচ্ছে। এতে করে যারা সঠিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রাপ্তির আবেদন করেন তারা নানাভাবে বাধার সম্মুখীন হন। পাসপোর্টে জাল ভিসা বা সিল ব্যবহার করা দেশের আইনে অপরাধ। তাই এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, চক্রটির উদ্দেশ্যই ছিল জাতিসংঘরে আমন্ত্রণপত্র কাজে লাগিয়ে কথক একাডেমির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী নামধারী ব্যক্তিদের নামে ভিসা ইস্যু করা। প্রকৃতপক্ষে ওই ব্যক্তিরা ছিল তার ক্লায়েন্ট। যাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পাঠায়। এছাড়া সে প্রতারণা করে তার প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব সুলতান মাহমুদের নাম পরিচয় ও তার স্বাক্ষর জাল করে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে চিঠি পাঠাতো। যাতে করে দূতাবাস থেকে ভিসা পাওয়া সহজ হয়।
ডিবি প্রধান বলেন, চক্রটি সাত ধাপে তাদের প্রতারণার প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করে। প্রথমে তাদের দালালদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানের বাসিন্দা যারা যুক্তরাষ্ট্র বা উন্নত দেশে যেতে আগ্রহী এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে চুক্তিতে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে। যারা পাসপোর্ট দেয় তাদের কথক একাডেমির স্টাফ হিসাবে বিভিন্ন ডকুমেন্ট তৈরি করে। এরপর জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ইকোনমিক ও সোশ্যাল কাউন্সিলের বিভিন্ন কনফারেন্সে যোগদানের জন্য তাদের সদর দপ্তরে রেজিস্ট্রেশন করে। রেজিস্ট্রেশনের পর যাদের জন্য ভিসা ইস্যু করবে তাদের কথক একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিচয়ে যোগদানের অনুমতির জন্য ই-মেইল করে।
হারুন অর রশীদ আরও বলেন, জাতিসংঘের সদরদপ্তর অনুমতি দিলে সব কাগজপত্রসহ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে ভিসার আবেদন করে পাসপোর্ট জমা দেয়। দূতাবাস তাদের সাক্ষাৎকার ও আঙুলের ছাপ নিয়ে তিন মাস মেয়াদি ভিসা দেয়। ভিসা পাওয়ার পর ওই ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে যায়।
তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ



