
টিউলিপের সাজার রায় হল, এরপর কী?
বিডি নিউজ: ঢাকার পূর্বাচলে মা শেখ রেহানাকে প্লট ‘পাইয়ে দিতে প্রভাব বিস্তারের’ অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় দুই বছরের কারাদণ্ড হয়েছে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের।
সোমবার ঢাকার আদালতে এই সাজা ঘোষণার পর রায়কে ‘প্রহসন’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন তিনি। বাংলাদেশের আদালতের বিচারের ‘আইনি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ না দেওয়ার’ কথা তুলে ধরে এই রায়কে ‘স্বীকৃতি’ না দেওয়ার কথা বলেছে টিউলিপের দল লেবার পার্টি।
দুদক টিউলিপকে এ মামলায় এনেছে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে। তার বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা এবং আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার কথাও দুদক বলেছে। মামলার নথিতে তার নাম টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, যিনি আদালতের দৃষ্টিতে পলাতক।
বর্তমানে ৪৩ বছর বয়সী টিউলিপ যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি মা-বাবার ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ব্রিটিশ আইনে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ থাকলেও ২০১৭ সালে তিনি বলেছিলেন, “আমি ব্রিটিশ, আমি বাংলাদেশি নই।”
দ্বৈত নাগরিকরা ব্রিটিশ নাগরিক হিসাবে পার্লামেন্ট, স্থানীয় এবং পুলিশ অ্যান্ড ক্রাইম কমিশনার (পিসিসি) বিভিন্ন পদে ভোট দিতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই যুক্তরাজ্যের। এমন প্রেক্ষাপটে এবার আদালতের রায় আসার পর টিউলিপের সাজা কীভাবে কার্যকর হবে, বা আদৌ কার্যকর করা সম্ভব কি-না, সেই প্রশ্ন থাকছে।
দুদকের আইনজীবী বলেছেন, আদালতের রায়ের কথা সরকারকে জানাবে দুদক। এরপর সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারকে রায়ের বিষয়টি জানাবে।
তবে টিউলিপের রায়ের বিষয়ে সোমবার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
টিউলিপের সাজা কার্যকরের বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারকে অনুরোধ জানানো হবে কি-না, এমন প্রশ্নে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “দেখা যাক, সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগবে।”
ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির এমপি টিউলিপের সাজার ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ হওয়ার আশঙ্কা না দেখলেও ‘প্রচ্ছন্ন অসন্তোষ’ তৈরির সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেছেন, “আমার মনে হয় না দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বড় ধরনের কোনো প্রভাব পড়বে। তবে, তিনি যেহেতু ওখানে সরকারি দলের একজন সদস্য ছিলেন এবং এখনও আছেন, সেক্ষেত্রে একটা প্রচ্ছন্ন অসন্তোষ যে থাকতে পারে না, সেটা আমি মনে করছি না।”
এই রায় টিউলিপ সিদ্দিকের উপর রাজনৈতিকভাবে কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করে এ বিশ্লেষক বলেন, “এখন যেহেতু উনার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, কোর্ট থেকে রায় হয়েছে। সেটা উনার জন্য কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ওখানে একটু চাপ তৈরি করতে পারে।
“কাজেই, চাপ দুইদিক থেকেই আসবে। একটা হলে, তার ক্যারিয়ারের উপর একটা ছায়া পড়তে পারে। দ্বিতীয়, যেহেতু তিনি ব্রিটিশ সরকারি দলের প্রভাবশালী সদস্য, সে ক্ষেত্রে তার ব্যাপারে এই ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সরকারের দিকেও খানিকটা হয়তো মানে মনক্ষুণ্ন হওয়ার মত একটা কারণ তো থাকতেই পারে।”
টিউলিপের সাজা যে কারণে
পূর্বাচলে নিজে প্লট না নিলেও মা শেখ রেহানাকে প্লট পাইয়ে দিতে ‘রাজনৈতিক প্রভাব’ খাটানোর জন্য দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া হয়েছে টিউলিপকে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, “শেখ রেহেনা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্ররোচিত করে পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্পে প্লট নিয়েছেন। টিউলিপ সিদ্দিক তার মা রেহানা সিদ্দিককে প্লট পাইয়ে দেওয়ার জন্য তার খালা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ও শেখ হাসিনার একান্ত সচিব সালাউদ্দিনকে মোবাইল ও ইন্টারনেটের বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে এবং বাংলাদেশে এলে সরাসরি যোগাযোগ করেছেন।
“দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং তাদের জবানবন্দিতে প্রমাণিত হয়েছে। আসামি শেখ হাসিনা সকল আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে তার নিয়ন্ত্রণাধীন অধীনস্থ কর্মকর্তা, কর্মচারী থেকে প্রভাবিত করে দুর্নীতির মাধ্যমে তার প্লট বরাদ্দ প্রদানের ব্যবস্থা করে দিয়ে ফৌজদারী অসদাচরণ করেছে। এই তিনজন বাদে অপর আসামিরা পাবলিক সার্ভেন্ট। তারা বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে প্লট বরাদ্দ পেতে সহায়তা করেছেন।”
‘প্রিভেনশন অব করাপশন অ্যাক্ট ১৯৪৭’–এর ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় টিউলিপকে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত।
হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে টিউলিপি সিদ্দিকের ‘যোগাযোগ’ করার যে কথা আদালত বলেছে, সে প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে দুদকের কৌঁসুলি খান মো. মাইনুল হাসান লিপন বলেন, “টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একজন মেম্বার হিসেবে অধিকতর ক্ষমতার অধিকারী হয়ে তাহার খালা শেখ হাসিনাকে প্রভাবিত করেছেন।
“যেহেতু শেখ হাসিনা ইতোপূর্বে তার নিজের নামে এবং তার দুই সন্তানের নামে তিনটি প্লট নিয়েছিলেন, সেইজন্য টিউলিপি সিদ্দিক তার খালাকে এই কথা বলেই প্রভাবিত করেছিলেন যে, ‘যেহেতু আপনি তিনটি প্লট নিয়েছেন, আমার মা এবং ভাই বোনদেরকেও তিনটি প্লট দিতে হবে’।”
গণভবনের দুজন কর্মকর্তা কর্মচারীর সাক্ষ্যে বিষয়টি উঠে আসার কথা বলেন দুদকের আইনজীবী। তিনি বলেন, “বিভিন্ন অ্যাপ এবং টেলিফোনের মাধ্যমে, দেশে এসে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর যে একান্ত সচিব ছিলেন, সালাউদ্দিন সাহেব, তার মাধ্যমেও প্রভাবিত করেছেন।
“এইভাবে তার প্রভাবিত করার বিষয়টা প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছে।”
সাজা কার্যকর কীভাবে
বাংলাদেশের সঙ্গে ব্রিটেনের প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। এর বাইরেও ব্রিটিশ প্রত্যর্পণ আইনে দেশটির সরকারের কাছে কোনো অপরাধীকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানোর সুযোগ রয়েছে। সেই অনুরোধ সরকার আমলে নিলে আদালতের প্রক্রিয়া শেষে সরকারই সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
এর আগে দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে ফেরত চেয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে কয়েক দফা চিঠি পাঠিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু কোনো ফল হয়নি।
‘হাই প্রোফাইল’ ব্যক্তির প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা সামনে আসার কথা তুলে ধরে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, “এই ধরনের হাই প্রোফাইল লোক যারা, তাদেরতো আর সাধারণ ক্রিমিনাল হিসেবে দেখা হয় না।
“তাদের একটা রাজনৈতিক পরিচয় আছে, সে রাজনৈতিক পরিচয়টাও বিবেচনায় আসে। তারপরে তার একটা কৌশলগত দিক আছে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ভারতের যেমন কৌশলগত বিষয় আছে। এটা শুধু যে এটা আইনি বিষয় তা নয়, রাজনৈতিক আঙ্গিকও আছে, কিছু কৌশলগত আঙ্গিকও থাকতে পারে। সেগুলো সব বিবেচনা নিয়েই বিষয়গুলো নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করি।”
এক্ষেত্রে আইনের পাশাপাশি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক জটিলতা সামনে আসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “সাজাতো আইডিয়ালি, কার্যকর করা সম্ভব হলেতো করা উচিত।
“কিন্তু সেগুলি এই আইনি জটিলতা, কূটনৈতিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক জটিলতা, এগুলি ওভারকাম করে গিয়ে বিচারের রায় কার্যকর করা, এটার কস্ট-বেনিফিটটা কী হবে, সেটাও একটু বিবেচনায় রাখা দরকার আছে।“
বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের এই সভাপতি বলেন, “যেহেতু কোর্ট থেকে এখন অর্ডার হবে। অর্ডারটা তারা তাদের কূটনৈতিক মাধ্যমে অনুরোধটা ব্রিটিশ সরকারের কাছে পাঠাতে পারে। এবং তখন ব্রিটিশ সরকার সেটা সিদ্ধান্ত নেবে, তারা কী করবে, কতদূর যাবে সেটা নিয়ে।
“কারণ, এটা বাংলাদেশের আদালতের সিদ্ধান্ত, রায়। এখন সেটা বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ সরকারের কাছে জানাবে বা অনুরোধ করবে। ব্রিটিশ সরকার সেটা বিবেচনা করে তারা সেদিক থেকে সিদ্ধান্ত দেবে।”
টিউলিপের সাজা কার্যকরের বিষয়ে পরবর্তী প্রক্রিয়ার বিষয়ে দুদকের আইনজীবী মাইনুল হাসান লিপন বলেন, “টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ এমপি হওয়া সত্ত্বেও উনি বাংলাদেশের নাগরিক আছেন, ভোটার আছেন, এই বিষয়টা আমাদের কাছে তথ্য আছে। উনি একদিকে বাংলাদেশের নাগরিক, আরেকদিকে ব্রিটিশ নাগরিক।
“সেই ক্ষেত্রে আমরা আমাদের দুদককে অবহিত করব, দুদক বাংলাদেশ সরকারের সাথে কমিউনিকেট করবে এবং বাংলাদেশ সরকার ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের সাথে কমিউনিকেট করবে যে, এই সাজার বিষয়টা তাকে অবহিত করার জন্য।”
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলো অবশ্য সরাসরিই লিখছে, যেহেতু প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই, টিউলিপকে বাংলাদেশের আদালতের দেওয়া সাজা কার্যকর হওয়ারও সম্ভানা নেই।
যা বলছেন টিউলিপ সিদ্দিক
সোমবার রায়ের প্রতিক্রিয়ায় টিউলিপ সিদ্দিক বলেছেন, প্লট দুর্নীতির অভিযোগে তার অনুপস্থিতিতে যে প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে বিচার সম্পন্ন হয়েছে, তা ‘ত্রুটিপূর্ণ ও প্রহসনমূলক’।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে দেওয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন, এ রায়কে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু তিনি দেখছেন না।
“এই পুরো প্রক্রিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ এবং প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের’ ফলাফল যেমন অনুমানযোগ্য ছিল, তেমনি এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।”
বাংলাদেশে চলা বিচারকাজে ‘আইনি প্রতিনিধিত্ব’ না থাকার কথা তুলে ধরে টিউলিপের দল লেবার পার্টি বলেছে, তারা এই রায়কে ‘স্বীকৃতি’ দিচ্ছেন না।
দলের একজন মুখপাত্র বলেন, “বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে, খ্যাতিমান সিনিয়র আইনজীবীরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে টিউলিপ সিদ্দিক এই মামলায় ন্যায়সঙ্গত আইনি অধিকার পাননি এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিস্তারিত কখনও তাকে জানানো হয়নি।
“তার আইনজীবী দল বারবার অনুরোধ জানালেও বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ তা দেয়নি। কোনো অভিযোগ আনা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনগত প্রতিরক্ষা উপস্থাপনের সুযোগ পাওয়া উচিত, কিন্তু এই ক্ষেত্রে তা হয়নি। সেজন্যই আমরা এই রায়কে স্বীকৃতি দিতে পারি না।”
যুক্তরাজ্যের পাঁচজন শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে লেখা এক চিঠিতে এ বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন।
চিঠিতে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রতিমন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিক এই মামলা লড়ার “ন্যূনতম অধিকারও পাননি”; অভিযোগ সম্পর্কে যথাযথ ধারণা বা আইনজীবীর নিয়োগের সুযোগ–“কিছুই তিনি পাননি।”
বাংলাদেশে টিউলিপ যাকে আইনজীবীকে হিসেবে নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন, তাকে “সরে দাঁড়াতে বাধ্য করার পাশাপাশি গৃহবন্দি করা হয় এবং তার মেয়েকে হুমকিও দেওয়া হয়” বলেও অভিযোগ করা হয় ওই চিঠিতে।
সোমবার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক রবিউল আলম আইনজীবী না দেওয়ার বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা দেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় পৃথিবীর যেখানে অবস্থান করুক না কেন সেই আসামিকে বিচার করতে আইনে কোনো বাধা নেই। কেবলমাত্র মৃত্যুদণ্ডের ধারার মামলার ক্ষেত্রে পলাতক আসামির ক্ষেত্রে স্টেট ডিফেন্স (রাষ্ট্রনিযুক্ত) ল ইয়ার নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
“এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের কোনো ধারার অভিযোগ না থাকায় আসামিদের জন্য ডিফেন্স ল ইয়ার নিয়োগ প্রদানের কোনো সুযোগ নেই।”



