
দিল্লিতে বিরোধী জোটের মহাসমাবেশ, পাল্টা তোপ বিজেপির
ভারতে ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী দিল্লিতে ‘চলো দিল্লি’ বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। রামলীলা ময়দানকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই কর্মসূচিকে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশটির রাজনীতি।
এদিকে, একইদিনে বিরোধীদল কংগ্রেসকে চাপে ফেলতে ১৯৮৪ সালের শিখ-বিরোধী দাঙ্গার স্মরণে পৃথক মিছিলের ডাক দিয়েছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
অন্যদিকে, উৎসব মৌসুমের এই সময়ে সরকার ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি এমন কর্মসূচির জেরে ট্রাফিক জ্যাম ও নিরাপত্তা কড়াকড়ির কারণে ব্যবসায় ক্ষতির আশঙ্কায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দিল্লির ব্যবসায়ীরা।
ইন্ডিয়া জোটের অভিযোগ ও বিক্ষোভ মিছিল
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের করছে বিরোধী শিবির। রবিবার (১ সেপ্টেম্বর) বেলা ১২টার দিকে ইন্ডিয়া জোটের ‘চলো দিল্লি’ মিছিল শুরু হয়েছে রামলীলা ময়দানের দিকে।
বিরোধী নেতাদের মধ্যে রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমন্ত সোরেন, রেবন্ত রেড্ডি, তেজস্বী যাদব এবং অখিলেশ যাদবের এই মিছিলে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
রামলীলা ময়দানের বাইরে এই মিছিলের ঘোষণা দিয়ে পোস্টার লাগানো হয়েছে এবং এমনকি স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) মতো গোষ্ঠীগুলোও এতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
এর আগে শনিবার (৩১ অক্টোবর) ইন্ডিয়া জোটের একটি কর্মসূচিতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে সিইসির বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ সম্বলিত একটি প্রতীকী প্রস্তাব পেশ করেন। ওই প্রস্তাবে সিইসির বিরুদ্ধে নির্বাচন প্রভাবিত করার ষড়যন্ত্র করা, ১৩ কোটি ২০ লাখ কোটি ভোটার বাদ দেওয়া, সংসদীয় তত্ত্বাবধান ছাড়াই ফরম-৬ পরিবর্তন করা এবং ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিজেপির পাল্টা কর্মসূচি
অন্যদিকে, বিরোধীদের এই আন্দোলনকে সম্পূর্ণ ‘মেলোড্রামা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে বিজেপি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা বলেন, বিরোধী জোটের এই মিছিল গণতন্ত্রের প্রতি চরম অসম্মান এবং এটি একটি ‘নির্বোধ, সাজানো নাটক’। তিনি আরো বলেন, “এটি নৈরাজ্য তৈরির একটি ষড়যন্ত্র। তাদের রাজনৈতিক মডেল কী? জনসাধারণ এই নাটক সম্পর্কে জানে, জানে যে এই মিছিল একটি রাজনৈতিক থিয়েটার।”
পাশাপাশি, কংগ্রেসকে কোণঠাসা করতে একইদিনে ১৯৮৪ সালের শিখ-বিরোধী দাঙ্গার বার্ষিকীতে পশ্চিম দিল্লিতে একটি পৃথক মিছিলের আয়োজন করেছে বিজেপি। হরি নগর বাস ডিপো থেকে তিলক নগর মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত এই মিছিলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত, রাষ্ট্রমন্ত্রী হর্ষ মালহোত্রা, এইচ এস ফুলকা, মনজিন্দর সিং সিরসা এবং বিজেপি সাংসদ বাঁশুরী স্বরাজের যোগ দেওয়া রয়েছে।
ইন্ডিয়া জোটের মিছিলে অংশ নিচ্ছে না সিজেপি
এদিকে, ইন্ডিয়া জোটের এই মিছিলে অংশ নিচ্ছে না ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে শনিবার দিল্লিতে তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করে যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনগুলোর প্রতি সমর্থন জানানোর জন্য ধন্যবাদ জানান। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, সিজেপি তাদের স্বাধীন সত্তা বজায় রাখবে এবং রবিবার বিরোধী দলগুলোর প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দেবে না। দীপকে জানান, দিল্লি পুলিশে সৌরভ ও আশুতোষের গ্রেপ্তারের সময়ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যেভাবে যন্তর মন্তরের শিক্ষার্থী আন্দোলনের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই কৃতজ্ঞতা জানাতেই তিনি এসেছেন।
ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ
এদিকে দীপাবলির ঠিক আগের এই ব্যস্ত উৎসবের মৌসুমে রাজধানী দিল্লিতে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও ব্যাপক ট্রাফিক জ্যামের জেরে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ক্রেতারা দূরে সরে যাবেন। অটোমোটিভ পার্টস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিনয় নারাং জানান, ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদের অধিকারকে সমর্থন করলেও স্থান ও সময় নিয়ে তাদের তীব্র আপত্তি রয়েছে। প্রতিবাদস্থল থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটারের মধ্যে চাঁদনি চক, সদর বাজার, দরিয়াগঞ্জ, মোরি গেট ও কাশ্মীর গেট অবস্থিত হওয়ায় বাইরের ব্যবসায়ীরা প্রায় তিন দিন আগে ও পরে দিল্লি যাওয়া এড়িয়ে চলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ব্যবসায়ীদের এই আশঙ্কার জবাবে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের প্রতিবাদের পাশাপাশি দিল্লিতে কেনাকাটা করারও আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রতিবাদ করুন, মিছিল করুন, র্যালি করুন এবং তার সঙ্গেই একটু কেনাকাটাও করুন। এতে ব্যবসায়ীদের লাভ হবে… আমি জানি এই র্যালিতে ব্যবসায়ীদের কোনো ক্ষতি হবে না। বিজেপি ভয় পাচ্ছে, তাই গুজব ছড়াচ্ছে।”
নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা দিল্লি
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিল্লিজুড়ে প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে রামলীলা ময়দান, মিন্টো ব্রিজ থেকে র্যালির রুট এবং আশেপাশের এলাকায় চার হাজারেরও বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
কনট প্লেস, যন্তর মন্তর, ভগবান দাস রোড এবং সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের আশেপাশে ভারী নিরাপত্তা ও বহুস্তরীয় ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মধ্য দিল্লির বিভিন্ন অংশে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও ডাইভারশন করা হয়েছে। এছাড়া যন্তর মন্তর ও নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের বাইরে জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি



